নিতু খুব আশা নিয়ে বলল, জি ম্যাডাম।
মেয়েটা কে?
আমাদের রুমে থাকে। নাম মিতুল।
মিতুল?
জি ম্যাডাম।
নিতু আশা নিয়ে হোস্টেল সুপারের দিকে তাকিয়ে রইল। হোস্টেল সুপার ঠাণ্ডা চোখে বলল, খা ঘরে যা।
গানের মাস্টার–
হোস্টেল সুপার চিলের মতো চিৎকার করে বলল, ঘরে যা বলছি।
নিতু নিশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে ফিরে আসতে শুরু করতেই হঠাৎ মেঝেতে চোখ পড়ল, দেওয়াল ঘেষে একটা ছোট্ট ইঁদুরের বাচ্চা পড়ে আছে। বাচ্চাটা মরে নি, আঁকুপাঁকু করছে। নিতু নিচু হয়ে ইঁদুরের বাচ্চাটা তুলে নিল, এত ছোট বাচ্চা যে এখনো চোখ ফোটে নি। হাতের তালুতে রেখে সে বাচ্চাটার পিঠে সাবধানে হাত বুলিয়ে দিতেই শুনতে পেল হোস্টেল সুপার ঘরের ভিতরে আবার খেপে উঁদুরকে আঁটা পেটা করতে করতে চিৎকার করছে, স্মার! মার! মেরে শেষ করে দে ইঁদুরে চৌদ্দগুষ্ঠি। খবিস গিদ্ধর ময়লার ঝাড়। মার! মার হারামির বাচ্চা হারামিকে!
ঝাঁটা দিয়ে মারতে মারতে হোস্টেল সুপার চিৎকার করতে করতে লাফাতে থাকে। ইঁদুরের উপরে এত খ্যাপা কোনো মানুষ নিতু এর আগে কখনো দেখে নি। নিতুর হাতের তালুতে এই ছোট ইঁদুরের বাচ্চাটা দেখতে পেলে হোস্টেল সুপার কী করবে কে জানে! নিতু হাত মুঠি করে ইঁদুরের বাচ্চাটাকে লুকিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে এল। অন্য সবাই খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে নিতুর জন্যে অপেক্ষা করছিল, তাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই রেবেকা বলল, কোথায় ছিলি তুই?
হোস্টেল সুপারের কাছে গিয়েছিলাম একটা কাজে।
কী কাজে।
আছে একটা কাজ।
নিতু তার হাত তুলে নেংটি ইঁদুরের বাচ্চাটা টেবিলের উপর রাখতেই সেটি আঁকুপাঁকু করে হাটতে থাকে, মনে হয় তার মাকে খুঁজছে। বেচারা জানে পর্যন্ত না যে হোস্টেল সুপার মেরে তার মাকে থ্যাতলা করে ফেলেছে। নিতু বাচ্চাটার পিঠে হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিল, বাচ্চাটী তখন গুটিশুটি মেরের কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে গেল।
রেবেকা অবাক হয়ে বলল,ওমা! ওটা কী?
ইঁদুরের বাচ্চা!
ইশ! কী সুইট! দেখেছিস?
তানিয়া তার বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে চাপা গলায় বলল, তোরা কী করছিস? তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়। ম্যাডামরা আসছে শুনতে পাচ্ছিস না?
নিতু তাড়াতাড়ি তার ইঁদুরের বাচ্চাটা হাতে নিয়ে কোথায় লুকাবে বুঝতে না পেরে তার জুতোর ভেতরে রেখে দিল। তারপর তার বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণের মাঝেই এক জোড়া পায়ের শব্দ শুনতে পায়, একটা গুম গুম করে, যেটা নিশ্চিতভাবে খোরাসানী ম্যাডামের অন্যটা খ্যাস খ্যাস করে যেটা হচ্ছে হোস্টেল সুপারের। দুজনের পায়ের শব্দ তাদের ঘরের সামনে এসে থেমে যায়, নিতু শুনতে পেল হোস্টেল সুপার বলছে, এই রুম।
দড়াম করে তাদের ঘরের দরজা খুলে গেল এবং নিতু চোখ বন্ধ করেই টের পেল দুইজন হেঁটে হেঁটে তাদের ঘরের মাঝামাঝি এসে হাজির হয়েছে। নিতু শুনতে পেল খোরাসানী ম্যাডাম মেঘের মতো গর্জন করে বলল, কোন বদমাইসটা?
হোস্টেল সুপার ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এইটা।
নিতু চোখের ফাঁক দিয়ে দেখার আগেই হঠাৎ করে মনে হল একটা দানব তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টানে তাকে একেবারে বিছানা থেকে তুলে এনে প্রায় শূন্যে ঝুলিয়ে মেঝেতে দাঁড়া করিয়ে দিয়েছে। খোরাসানী ম্যাডাম নিতুর চুল ধরে এত জোরে হ্যাচকা টান দিয়ে মাথাটা সোজা করল যে সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। নিতু দেখতে পেল খোরাসানী ম্যাডামের বাঘের মতো মাথাটা নিচে নেমে এসেছে, লাল ভাটার মতো চোখ দুটি তার দিকে তাকিয়ে আছে, কোনটা গায়িকা?
গা-গা-গায়িকা?
হ্যাঁ খোরাসানী ম্যাডাম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, যার গলার সুর শুনে তোর দিল ফানা ফানা হয়ে গেছে?
নিতু কী বলবে বুঝতে পারল না। হোস্টেল সুপার তার চিমশে মুখে বিদঘুটে এক ধরনের হাসি ফুটিয়ে বলল, ঐটার নাম হচ্ছে মিতুল।
মিতুল? খোরাসানী ম্যাডাম হুংকার দিল, কোন বদমাইসটা মিতুল?
মিতুল ফ্যাকাসে মুখে তার বিছানায় উঠে বসল, বলল, আমি।
তার কথা শেষ হবার আগেই খোরাসানী ম্যাডাম মিতুলের চুল ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বিছানা থেকে মেঝেতে নামিয়ে আনে। তারপর মাথা নামিয়ে এনে মিতুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই তাহলে সেই গায়িকা যার গলার স্বর সাইরেনের মতো?
মিতুল কোনো কথা বলল না, নিতু দেখল তার চোখে পানি এসে গেছে, যন্ত্রণায় না অপমানে ঠিক বলতে পারল না।
খোরাসানী ম্যাডাম নিতুর গলা চেপে এক টান দিয়ে শূন্যে তুলে নিয়ে বলল, মামদোবাজীর আর জায়গা পাস না? স্কুলের মাঝে গান বাজনা? গলার মাঝে সুর? ছারপোকার ডিম, ইঁদুরের বাচ্চা, টিকটিকির লেজ কোথাকার? তোর গলা দিয়ে গান গাওয়া আমি বের করছি। টেনে আমি জিরাফের গলার মতো লম্বা করে ফেলব। গিটটু দিয়ে ছেড়ে দেব দেখি গলা দিয়ে আওয়াজ কীভাবে বের হয়। আমার সাথে মামদোবাজী? তোর গলা আমি ছিঁড়ে ফেলব আজকে।
মিতুলের গলা চেপে শন্যে ঝুলিয়ে রাখার জন্যে সে নিশ্বাস নিতে পারছিল, প্রাণপণে হাত পা ছুড়ে কোনোভাবে নিজেকে ছাড়াতে না পেরে যখন হাল ছেড়েদিল তখন খোরাসানী ম্যাডাম তাকে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়। মিতুল দেওয়াল ধরে বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে অতিংকিত চোখে খোরাসানী ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে থাকে।
খোরাসানী ম্যাডাম এবারে নিতুর দিকে তাকাল, নাক দিয়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, আর আমাদের সংগীত বিশেষজ্ঞ কী বলে? গায়িকার জন্যে ভালবাসায় যার বুক ফেটে যাচ্ছে, দিল ফানা ফানা হয়ে যাচ্ছে? খোরাসানী ম্যাডাম এসে খপ করে দুই হাত দিয়ে নিতুর দুইটা কান ধরে ফেলে। বলল, এত সুন্দর গান তুই কী দিয়ে শুনেছিস? এই কান দিয়ে? কান দুইটা কী যথেষ্ট বড়? ঠিকমতো শুনতে পেয়েছিস চামচিকার বাচ্চা? মনে হয় শুনতে পাস নি। কান দুইটা টেনে আরেকটু বড় করে দিতে হবে তাহলে শুনতে পাবি। আরো ভালো করে শুনতে পাবি। এই বলে খোরাসানী ম্যাডুমি হ্যাচকা টান দিয়ে নিতুর দুই কান ধরে তাকে শূন্যে ঝুলিয়ে ফেলল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় নিতু চিৎকার করে উঠে কিন্তু খোরাসানী ম্যাডাম তাতে ক্ষেপ করে না, নিতুকে দুই কানে ধরে ঝুলিয়ে রাখে। যখন নিতুর মনে হল তার দুই কান ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যাবে তখন খোরাসানী ম্যাডাম তাকে ময়লা জঞ্জালের মতো নিচে ফেলে দিল। মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়তে পড়তে নিতু দেখল তাদের হোস্টেল সুপার পেট চেপে ধরে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, এত মজার দৃশ্য মনে হয় সে আগে কখনো দেখে নি।।
