ঠিক আছে। মিতুল বিছানায় উঠে বসে মুখটা উপর দিকে তুলে ধীরে ধীরে গলায় গানের সুরের মতো মধুর একটা ধ্বনি বের করে আনে। ধীরে ধীরে শব্দের ধ্বনি তীক্ষ্ণতর হতে শুরু করে এবং শব্দের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। নিতু অবাক হয়ে একবার মিতুলের দিকে আরেকবার লাইট বাল্বের দিকে তাকায়। সত্যি সত্যি লাইট বাল্বটি থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছে। মিতুল ঠিক কম্পনটি ধরে নেয়ার পর শব্দের তীক্ষ্ণতাকে সমান রেখে হঠাৎ তার তীব্রতা বাড়িয়ে দিল মনে হল, কেউ বুঝি মিতুলকে আঘাত করেছে আর সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠেছে—সাথে সাথে ফটাশ শব্দ করে লাইট বাল্বটা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে সারা ঘরে ভাঙ্গা কাচের গুড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল সাথে সাথে।
নিতু বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠেছিল কিন্তু ঠিক তখন শুনতে পেল হোস্টেলের অন্য মাথায় হোস্টেল সুপার তার দরজা খুলে লম্বা পা ফেলে হেঁটে আসছে। মিতুলের গলার আওয়াজটা শুনতে পেয়েছে মনে হল।
মেঝেতে খাস খ্যাস শব্দ করে পা ঘষে ঘষে হোস্টেল সুপার তাদের ঘরের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে বলল, কে চিৎকার করেছে?
ব্যাপারটা চেপে যাওয়া সম্ভব কি না মিতুল কিন্তু ভেবে দেখল, কিন্তু মনে হল। তাতে বিপদের ঝুঁঝি আরো বেশি। সে নিচু গলায় বলল, আমি ম্যাডাম।
কেন চিৎকার করেছিস?
মিতুল দ্রুত চিন্তা করতে থাকে, বিশ্বাসযোগ্য কোনো কিছু বলা যায় কি না। সেরকম কিছু ভেবে পেল না তখন নিতু তাকে উদ্ধার করল, বলল, ইঁদুর ম্যাডাম।
ইঁদুর! হোস্টেল সুপার বিকট আর্তনাদ করে বললে সর্বনাশ! কোথায়?
এই ঘরের ভিতরে ছিল, ফুটো দিয়ে বের হয়ে গেছে।
সর্বনাশ! হোস্টেল সুপার প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের ঘরের দিকে ছুটে যেতে থাকে। সব মানুষেরই মনে হয় যেরকম ভালবাসার একটা জিনিস থাকে সেরকম ভয়ের একটা জিনিস থাকে। হোস্টেল সুপারের ভালবাসার জিনিস কী কেউ জানে না। কিন্তু ভয়ের জিনিস হচ্ছে ইঁদুর সেটা তারা কিছুদিন হল আবিষ্কার করেছে।
হোস্টেল সুপারের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাবার পর নিতু গলা নামিয়ে মিতুলকে বলল, তুই কেমন করে পারিস রে মিতুল?
তানিয়া বলল, আমি ম্যাগাজিনে পড়েছি যারা অপরায় গান গায় তারা পারে। আমাদের মিতুল অপেরা গায়িকাদের থেকেও ভালো।
হ্যাঁ। নিতু উৎসাহে বিছানা থেকে নেমে বলল, তোর গলাটা সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতে হবে।
মিতুল লজ্জা পেয়ে বলল, থাক, এখন খালি পায়ে বিছানা থেকে নামিস। পা কেটে যাবে।
তা ঠিক। নিতু আবার বিছানায় উঠে বসে বলল, তোর এত সুন্দর গলা তোকে তো গান গাইতে শিখতে হবে।
মিতুল কোনো কথা বলল না, হঠাৎ করে তার চোখে পানি এসে গেল। তার যে কী গান গাইতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এখানে সে কি কখনো গান শিখতে পারবে?
পরদিন বিকেল বেলা স্কুল থেকে ফিরে এসে নিতু খুব একটা সাহসের কাজ করে ফেলল। যখন তার বিছানায় লম্বা হয়ে ঘুমানোর ভান করার কথা তখন সে হোস্টেল সুপারের সাথে দেখা করতে গেল। হোস্টেল সুপার একটা বঁটা নিয়ে তার ঘরে কী যেন করছিল নিতুকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল, বলল, তুই? তুই কী করছিস এখানে? নিতু—৪
ম্যাডাম— নিতু যতটুকু সম্ভব মুখ কাচু মাচু করে বলল, আপনাকে একটা জিনিস বলতে এসেছিলাম।
হোস্টেল সুপার ঝাঁটা দিয়ে ঘরের ভিতর কী একটা জিনিসকে পিটাতে পিটাতে খ্যাকিয়ে উঠে বলল কী জিনিস?
নিতু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, আমাদের মাঝে একজন আছে যে খুব সুন্দর গান গাইতে পারে।
হোস্টেল সুপার যে জিনিসটাকে ঝাঁটা পেটা করছিল সেটাকে লাথি দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে বলল, কী বললি?
নিতু দেখল জিনিসটা একটা ছোট নেংটি ইঁদুরের বাচ্চা একেবারে আধ আঙুল লম্বা ঝাঁটা পেটা খেয়ে মরে থেঁতলে গেছে। হোস্টেল সুপার ঝাঁটা হাতে আরো কি যেন খুঁজতে খুঁজতে আবার বলল, কী বললি তুই?
বললাম, যে আমাদের মাঝে একজন আছে সে খুব সুন্দর গান গাইতে পারে।
হোস্টেল সুপার ঝাঁটা হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটু অবাক হয়ে বলল, গান? গান গাইতে পারে?
জি ম্যাডাম। খুব সুন্দর গান গাইতে পারে।
তাহলে?
আমি বলছিলাম কী—
কী বলছিলি?
সে যদি গান গাওয়া শিখতে পারে তাহলে খুব বড় গায়িকা হবে।
হোস্টেল সুপার মুখ বাঁকা করে বলল, তাই নাকি?
জি ম্যাডাম। গলাটা খুব সুন্দর আর তেজী।
তেজী? বলেই হঠাৎ হোস্টেল সুপার কেমন যেন ক্ষেপে গেল, ঝাঁটা দিয়ে দমাদম করে কী একটা মারার চেষ্টা করতে লাগল, তার মুখ বিকৃত হয়ে যায় চোখগুলি ঠেলে বের হয়ে আসতে চায়, ঘরের মাঝে সে ছোটছুটি করে লাফাতে থাকে, দেখে মনে হয় হঠাৎ করে যেন পাগল হয়ে গেছে। নিতু মাথা উঁচু করে দেখার চেষ্টা করল, মনে হল একটা নেংটি ইঁদুরকে মারছে। ইঁদুরটা নিশ্চয়ই মরে ভূত হয়ে গেছে কিন্তু তবু হোস্টেল সুপারের রাগ যায় না। ঝাঁটা দিয়ে মারতে মারতে ঘরের বাইরে এনে দমাদম পিটাতে থাকে, ছোট নেংটি ইঁদুরের নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে থেঁতলে একটা বিচ্ছিরি অবস্থা হয়ে গেল।
নিতু হোস্টেল সুপারের খেপে যাওয়া ভাবটুকু কমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল, তারপর বলল, তাই ম্যাডাম, আমি বলছিলাম কী–
হোস্টেল সুপার ঝাঁটা হাতে নিয়ে চোখ লাল করে বলল, কী বলছিলি?
বলছিলাম, তাকে কী গানের মাস্টার দিয়ে গান শেখানো যাবে?
হোস্টেল সুপার এমনভাবে নিতুর দিকে তাকাল যেন নিতুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, গানের মাস্টার দিয়ে?
