সর্বনাশ! মিতুল আর্ত চিৎকার করে নিতুকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল, নিতু হাত দিয়ে ঝটকা দিতেই মিতুল ছিটকে গিয়ে পড়ল, হঠাৎ করে নিতুর শরীরে মনে হয় মত্ত হাতির জোর চলে এসেছে। মিতুল মেঝেতে পড়ে থেকে কো কো করে কেঁাকাতে থাকল তখন রুনু আর কুনু গিয়ে নিতুকে দুই পাশ থেকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল, নিতু আবার একটা ঝটকা দিতেই দুজন ছিটকে দুই পাশে আছাড় খেয়ে পড়ল। নিতু তার ধারালো দা টি আরো উপরে তুলে নেয়, এখন একটা কোপ বসালে নির্ঘাত কাসেমের মাথায় পড়বে। কাসেম ভয়ে চিল্কার করে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যায়, মেঝেতে ঘষে ঘষে নিজেকে পিছনে টেনে নেয়, নিতু ও তখন আরো দুই পা এগিয়ে যায়, আর এক মুহূর্ত তারপরেই একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যাবে। ভয়ে আতংকে সবাই চুপ করে গেছে কোখাও কোনো শব্দ নেই। সবাই চোখ বন্ধ করে আছে, এভাবে কয়েকমুহুর্ত কেটে যায়, কাসেম সাবধানে চোখ খুলে তাকায় তখন, নিতু তখনো দা উপরে তুলে রেখেছে, সেইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে খুব সহজ গলায় বলল, কাসেম।
কাসেমের কথা বলায় কোনো ক্ষমতা নেই, অস্পষ্ট একটা শব্দ করল মাত্র।
নিতু সাবধানে দাটা নিচে নামিয়ে বলল, কাসেম, আমি তোর জন্যে চাঁদা তুলতে পারব না।
ঘরে কোনো শব্দ নেই। হোস্টেল সুপার বিড় বিড় করে কী একটা সূরা পড়ছিল এবারে সেটা থামিয়ে এগিয়ে এল, বলল, কীঃ কী বলছেঃ
কেউ কোনো কথা বলল না। নিতু হাত দিয়ে চোখ কচলে ঘুম থেকে ওঠার ভঙ্গি করে বলল, কাসেম! তুই তোর চাঁদা নিজে তুলে নে–
হঠাৎ করে নিতু চারিদিকে ঘুরে তাকাল, মনে হল ঘুম থেকে পুরোপুরি জেগে উঠেছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?
নিতু তাকিয়ে দেখে কাসেম তার পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে আছে, সে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, আমি কী একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। তুই যেন আমাকে বলছিস আমি চাঁদা না তুললে আমাকে মেরে ফেলবি, আমিও যেন–।
নিতু কথা বলতে বলতে চারিদিকে তাকায় তারপর কেমন জানি অপ্রস্তুত হয়ে যায়। হাতের দাটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, কী হচ্ছে এখানে।
মিতুল এগিয়ে এসে তার হাত থেকে দাটা নিয়ে বলল, তুই স্নিপ ওয়াকিং করছিলি।
স্লিপ ওয়াকিং?
হ্যাঁ।
নিতু মুখ কাচু মাচু করে বলল, আসলে ঐ চাঁদার ব্যাপারটা নিয়ে এত দুশ্চিন্তার মাঝে ছিলাম, সারাক্ষণ মাথায় মাঝে ঘুরছে। ঘুমালেও স্বপ্ন দেখি।
তানিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, হ্যাঁ, অবচেতন মনে থেকে যায় তো। সেই জন্যে।
হোস্টেল সুপার পুরো ব্যাপারটির মাঝে একটা রহস্যের গন্ধ পেল, এগিয়ে এসে তার চিমশে মুখটিকে আরো চিমশে করে ধমক দিয়ে বলল, এখানে কী হচ্ছে আমাকে কেউ বুঝিয়ে বলবে?
কাজেই পুরো ব্যাপারটা হোস্টেল সুপারকে বুঝিয়ে বলতে হল। নিতু ভান করল একেবারেই বলতে চাইছে না কিন্তু বাধ্য হয়ে বলছে। কাসেমের কীর্তিকলাপ অত্যাচার, চালবাজী কিছুই আর বাকি থাকল না। তার চাঁদা তোলার কথা, সে জন্যে নিতুকে সাব কন্ট্রাক্ট দেওয়া, ভয় দেখানো রুনুর গালে খামচি, সব কিছুই খুলে বলতে হল।
মধ্যরাতে সবাই যখন নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছে তখন নিতু কাসেমের কাছে গিয়ে গলা নিচু করে বলল, তোর কপাল খুব ভালো, ঠিক সময়ে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। নাহলে যে কী হতো! নিতু ঘটনাটা চিন্তা করে শিউরে উঠে বলল, একেবারে ইত্তেফাকে খবর উঠে যেতো হেড লাইন হয়ে যেতো নৃসংস।
ইত্তেফাকে খবর ওঠার ভয়েই হোক আর হোস্টেল সুপার এবং খোরাসানী ম্যাডামের দলাই মলাইয়ের ভয়েই হোক কাসেম টুঁ শব্দটি করল না।
০৬. কিন্নর কণ্ঠ
মাসখানেক পরের কথা। রাত দশটা বেজে গিয়েছে বলে সবাই বিছানায় শুয়ে পড়েছে এবং শোওয়ার পর হঠাৎ করে মনে পড়েছে ঘরের আলো নেবানো হয় নি। রেবেকা বলল, কী হল, লাইট না নিবিয়ে শুয়ে পড়লি যে বড়।
রুনু বলল, যে সবার শেষে শুকে তার নেবানোর কথা।
ঝুনু বলল, আমি সবার আগে শুয়েছি।
রেবেকা বলল, আমিও সবার আগে শুয়েছি।
তাহলে সবার শেষে কে শুয়েছে?
নিতু তার ভোটকা মিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি।
রেবেকা বলল, তাহলে বাতি না নিৰিয়ে শুয়ে পড়লি যে?
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। তোরা সবাই দেখি খোরাসানী ম্যাডাম হয়ে গেলি?
নিতু বিছানায় উঠে বসে তখন মিতুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আগে আমি বিছানায় শুয়েই লাইট নেবাতে পারতাম।
কী ভাবে? বেড় সুইচ?
উঁহু। গান গেয়ে।
গান গেয়ে?
হ্যাঁ। মিতুল কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, আমার গলার স্বর খুব তেজী ছিল। ঠিকভাবে সুরে টান দিয়ে গ্লাস, বোতল, লাইট বাল্ব ভেঙ্গে ফেলতে পারতাম!
নিতু অবাক হয়ে মিতুলের দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, গুল মারছিস, তাই না?
না। গুল মারব কেন? একসিডেন্টে মারা যাবার আগে আমার বাবা মা দুজনেই বড় গায়ক গায়িকা ছিলেন। আমি এক বছর বয়স থেকে রেওয়াজ করতাম। বাবা বলতেন আমার গলা নাকি খুব ভালো ছিল— কথা শেষ করতে গিয়ে হঠাৎ মিতুলের গলা ধরে এল।
নিতু বিছানা থেকে নেমে বলল, এখন পারবি?
এখন?
হ্যাঁ, পারবি?
অনেকদিন তো চেষ্টা করি নি জানি না পারব কিনা?
দ্যাখ না চেষ্টা করে।
মিতুল মাথা নেড়ে বলল, চেষ্টা করি আর হোস্টেল সুপার এসে কান ধরে ঘর থেকে বের করে দিক।
নিতু বলল, দরজা জানালা তো সব বন্ধ, আর হোস্টেল সুপারের ঘর তো একেবারে অন্য মাথায়, এত দুরে শব্দ যাবে না। দেখ চেষ্টা করে।
