প্রথমে নিতু ঘর থেকে বের হয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল, নাটকের ঠিক সময় সে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে উপর উঠে আসবে। এর কয়েক মিনিট পর তানিয়া আর রেবেকা গেল হোস্টেল সুপারিনটেন্ডেন্টের ঘরে, রুনু-ঝুনু আর মিতুল দাঁড়াল কাসেমের ঘরের সামনে। ঠিক যখন হোস্টেল সুপারিনটেন্ডেন্টের দরজায় শব্দ করা শুরু হল তখন রুনু ঝুনু আর মিতুলও উচ্চ স্বরে চেঁচামেচি করতে শুরু করল। প্রথমে মিতুল একটা আর্ত চিৎকার দিল–যে কারণেই হোক মিতুল খুব ভালো চিৎকার করতে পারে। তার চিৎকার শেষে। হতেই রুনু উত্তেজিত গলায় বলল, কোথায় গেছে? কোথায় গেছে?
ঝুনু বলল, এ দিকে ঐ দিকে–
মিতুল বলল, সর্বনাশ, এখন কী হবে?
রুনু ঝুনু একসাথে, ভয় করছে, আমার ভয় করছে—
মিতুল বলল, হোস্টেল সুপারের কাছে চল—
চেঁচামেচিতে কাজ হল, ঘরের ভেতর মেয়েগুলো জেগে উঠল, কাসেম গলা উঁচিয়ে বলল, কী হয়েছে রে?
মিতুল ভয় পাওয়া গলায় বলল, নিতুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? বলতে বলতে কাসেম দরজা খুলে বের হয়ে এল। রুনু ঝুনু আর মিতুল এক সাথে বুক থেকে একটা নিশ্বাস বের করে দেয়, তাদের নাটকের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে কাসেমের ঘরে দরজা খোলা থাকতে হবে। রুনু ঝুনু আর মিতুল খুব উত্তেজিত অবস্থায় চেঁচামেচি এবং চিৎকার করার ভঙ্গি করে ছোটাছুটি করার ভান করতে থাকে এবং দেখতে পায় তানিয়া আর রেবেকাও নাটকে তাদের অংশটা ঠিক ঠিক অভিনয় করে এসেছে, তারা উদ্বিগ্ন মুখে এই দিকে আসছে এবং তাদের পিছু পিছু রোগী কাঠির মতো চিমশে যাওয়া হোস্টেল সুপার লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে। কোনো একটি বিচিত্র কারণে গভীর রাতে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হলে সবসময়েই তাকে আরো অনেক বেশি চিমশে দেখায়।
কিছুক্ষণের মাঝেই মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠা পুরো দলটি কাসেমের দরজার সামনে একত্র হল এবং উত্তেজিত গলায় কথা বার্তা হতে লাগল। নাটকটি যেভাবে রিহার্সাল দেওয়া আছে, এখন পর্যন্ত ঠিক সেইবাবে অগ্রসর হচ্ছে। ঠিক এখন সিঁড়ি বেয়ে নিতুর ধীরে পায়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ওঠে আসার কথা এবং ঠিক ঠিক সিঁড়ি বেয়ে সে উপরে উঠে এল, দুই হাত দিয়ে সে কিছু একটা ধরে রেখেছে, জিনিসটা শরীরের পিছনে তাই সামনে থেকে দেখা যাচ্ছে না। যেভাবে রিহার্সাল করা হয়েছিল তার সাথে মিল রেখে মিতুল হাত দিয়ে নিতুকে দেখিয়ে একটা চিৎকার দেয়, সবাই সেদিকে তাকাতেই সে হঠাৎ করে মুখে হাত দিয়ে চিৎকার থামিয়ে দেয়। তানিয়া চাপা স্বরে বলল, খবরদার, কেউ শব্দ করবি না। দেখছিস না স্লিপ ওয়াকিং করছে? ঘুম ভেঙ্গে গেলে বিপদ হবে।
রুনু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ঘুম ভেঙ্গে গেলে কী হয়?
তানিয়া গলা নামিয়ে ফিস ফিস করে বলল, ব্রেনে খুব প্রেসার পড়ে। পাগল টাগল হয়ে যায়।
ঝুনু বলল, ও।
ছোট দলটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল এবং তাদের সবার সামনে দিয়ে নিতু খুব ধীর পায়ে হেঁটে যায়, আজকে তার চোখ খোলা কিন্তু সেই চোখ দিয়ে সে কিছু দেখছে না, দৃষ্টি বহুদূরে কোনো এক অজানা লক্ষ্যে স্থির হয়ে আছে। নিতু তাদেরকে অতিক্রম করা মাত্রই সবাই অবিশ্যি চাপা স্বরে আর্তনাদ করে উঠে কারণ দুই হাত দিয়ে সে কী ধরে রেখেছে সবাই সেটা দেখতে পায়—সেটি হচ্ছে একটি দা, বারান্দার আলো প্রতিফলিত হয়ে সেটি চকচক করে ওঠে।
হোস্টেল সুপার কাঁপা গলায় বলল, দা নিয়ে কোথায় যাচ্ছে?
জানি না রেবেকা কাঁপা গলায় বলল, আমার ভয় করছে। ভয় চিকেন পক্স থেকেও বেশি সংক্রামক, রেবেকার কথা শোনা মাত্র সমস্তু দলটির মাঝে ভয়ের একটা শিহরণ বয়ে গেল। সবাই ফ্যাকাসে মুখে নিতুর দিকে তাকিয়ে থাকে, মেঝেতে পা ঘষে ঘষে সে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল তখন সবাই আবার চাপা আর্তনাদ করে উঠল। নিতু খুব ধীরে ধীরে ঘুরে গিয়ে এবারে তাদের দিকে হেঁটে ফিরে আসতে থাকে। শরীরে সাদা একটা ঘুমের পোশাক, চুল উশখুশকো হয়ে ওড়ছে, চোখে ভয়ংকর একটা প্রাণহীন দৃষ্টি, দুই হাতে শক্ত করে রাখা ধারালো দা, ঘটনাটা সাজানো জেনেও তানিয়ার সারা শরীর শিউরে উঠল।
রেবেকা ফিস ফিস করে বলল, সর্বনাশ! আমাদের দিকে আসছে।
রুনু চাপা গলায় বলল, আমরা কী করব?
তানিয়া বলল, কেউ নড়বি না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। হঠাৎ করে নড়লে চমকে উঠে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।
নিতু পা ঘষে ঘষে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কাছাকাছি এসে হঠাৎ করে একটু ঘুরে সোজাসুজি কাসেমের দিকে তাকায়। হঠাৎ করে তার নাক ফুলে উঠে, মুখ অল্প হা হয়ে দাঁত বের হয়ে যায়, সে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকে, শরীর অল্প অল্প করে কাঁপতে থাকে, দেখে মনে হয় এই মুহূর্তে কিছু একটা ঘটে যাবে। মিতুল আর্ত চিৎকার করে বলল, সর্বনাশ! কাসেম – তোর দিকে যাচ্ছে নাকি?
কাসেম রক্তশূন্য মুখে নিতুর দিকে তাকিয়ে দুই পা পিছনে সরে এল, সাথে সাথে নিতুও কাসেমের দিকে আবার ঘুরে দাঁড়াল এবার কারো মনে এতটুকু সন্দেহ নেই যে নিতু কাসেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঝুনু ভাঙ্গা গলায় বলল, এখন কী হবে?
দেখা গেল নিতু ধীরে ধীরে ধারালো দাটা উপরে তুলছে, আজকের নাটকের একটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একটু ভুল হলে রক্তারক্তি ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। কাসেম রক্তশূন্য মুখে দুই পা পিছিয়ে যায় নিতুও তার দিকে দুই পা এগিয়ে যায়।
