সেদিন রাত্রে ঘুমানোর আগে মশারি টানাতে টানাতে কাসেমকে নিয়েই কথা বার্তা হচ্ছিল। রুনু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, এই দ্যাখ, কাসেম কী করেছে।
মিতুল এগিয়ে বলল, কী করেছে?
রুনু তার গালটা দেখালো, সেখানে খামচির দাগ। মিতুল জিজ্ঞেস করল, খামচি দিয়েছে
হ্যাঁ। বলে কী তোদের মাঝে কে রুনু কে ঝুনু বুঝতে পারি না। তাই তোর গালে খামচি দিয়ে দিলাম, যার গালে খামচির দাগ সে হচ্ছে রুন।
মিতুল মাথা নেড়ে বলল, ইশ!
নিতু বলল, এভাবে আর চলতে পারে না।
কী করবি?
কিছু একটা করতে হবে— নিতুর কথা শেষ হবার আগেই দরজায় শব্দ হল, এই হোস্টেলে দরজায় শব্দ হওয়া মানেই দুঃসংবাদ, নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে আর হোস্টেল সুপার এসেছে তার শাস্তি দিতে। রেবেকা ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দিতেই কাসেম এসে ঢুকল, রেবেকাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভিতরে ঢুকে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা আছিস তাহলে?
কেউ কোনো কথা বলল না। কাসেম তার ধারালো উঁত বের করে হাসার ভান করে বলল, আমার চাঁদার টাকা যোগাড় হয়েছে তো?
এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না। কাসেম কয়েক পা এগিয়ে এসে নিতুর বুকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় ফেলে দিয়ে বলল, চাঁদা আদায় করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মেয়েদের সন্ত্রাসী হওয়ার খুব ঝামেলা। বুঝলি? এতদিন চেষ্টা করেও একটা অস্ত্র জোগাড় করতে পারলাম না।
অস্ত্র? নিতু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, কী অস্ত্র?
কাঁটা রাইফেল, চাইনিজ কুড়াল যেটাই পাওয়া যায়।
কী করবি অস্ত্র দিয়ে?
অস্ত্র দিয়ে আবার কী করে? গাধা কোথাকার?
রেবেকা নিচু গলায় বলল, কাসেম। এখন তো ঘুমানোর সময়। হোস্টেল সুপার যদি জানতে পারেন তুই এখানে–
কাসেম রেবেকার মাথায় চাটি মেরে বলল, আমাকে কী বেকুব পেয়েছিস নাকি? হোস্টেল সুপার বাইরে গিয়েছে, আমি একজনকে গেটে পাহারা রেখে এসেছি। যখনি দেখবে আমাকে খবর দিয়ে যাবে।
রেবেকা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল ও।
তোদের মতো বুদ্ধি নিয়ে তো আমি থাকি না।
রেবেকা শোনা যায় না এরকম গলায় বলল, তা ঠিক।
কাসেম তার মাথার কোঁকড়া চুলে হাত বুলিয়ে নিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, চাঁদা আদায় করতে ঝামেলা হচ্ছে। তাই ঠিক করেছি—
নিতু ভুরু কুচকে বলল, কী ঠিক করেছিস?
ঠিক করেছি তোকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিব।
কী দিবি?
সাব-কন্ট্রাক্ট। কাসেম ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে, অর্থাৎ তুই আমার জন্যে চাঁদা তুলে দিবি। আমি দেখেছি তোকেও মেয়েরা একটু একটু ভয় পায়। তুই পারবি।
নিতু মাথা নাড়ল, আমি পারব না।
পারবি। তোকে পঞ্চাশ টাকা চাঁদা ধরেছিলাম, সেটা কমিয়ে তিরিশ করে ফেলেছি। কাসেম দাঁত বের করে হাসল যেন সে নিতুর জন্যে বিরাট একটা মহান কাজ করে ফেলেছে।
নিতু জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, তোর চাঁদাবাজী তোকেই করতে হবে। আর কেউ তোর হয়ে চাঁদাবাজী করে দেবে না।
কাসেম খানিকক্ষণ নিতুর দিকে তাকিয়ে মুখ শক্ত করে বলল, আর কেউ করুক আর নাই করুক, তুই করবি।
তুই কেন করবি জানিস? নিতু অবাক হয়ে বলল, কেন?
কারণ তুই যদি না করিস তাহলে আমি খোরাসানী ম্যাডামকে বলে দেব তুই হোস্টেলের ডাইনিং রুমের জানালা ভাংচুর করেছিস।
নিতু চোখ কপালে তুলে বলল, আমি মোটেও হোস্টেলের ডাইনিং রুমের জানালা ভাংচুর করি নাই।
সেটা নিয়ে তার মাথা ঘামাতে হবে না। আমিই ভাংচুর করে দিয়ে খোরাসানী ম্যাডামকে নালিশ দেব। ম্যাডাম কার কথা বিশ্বাস করবে বল দেখি —তোর না আমার?
নিতু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই দরজা খুলে ছোটখাট একটা মেয়ে ঢুকে বলল, কাসেম আপা-হোস্টেল সুপার এসে যাচ্ছে।
ঠিক আছে যাচ্ছি। কাসেম খোলা দরজা দিয়ে বের হতে হতে বলল, মনে থাকবে তো? এক সপ্তাহ সময়। ক্লাশ সেভেনের ওপরে দশ টাকা, নিচে পাঁচ টাকা। বুতুরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে হাত পা না ভেঙ্গে আস্ত থাকার ফি!
কাসেম হি হি করে হাসতে হাসতে বের হয়ে গেল। নিতু ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলি? দেখলি ব্যাপারটা? কত বড় বদমাইস দেখলি?
তানিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, মেয়ে জাতির অপমান। আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানিস?
ছেলের নাম থাকার কারণে কাসেম এরকম বদমাইস হয়ে যাচ্ছে।
রুনু তার গালে হাত বুলিয়ে বলল, কারণ কী জানি না কিন্তু বদমাইস যে বের হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
নিতু আবার বলল, কিছু একটা করতেই হবে।
কী করবি?
আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তোরা ভেবে দ্যাখ কাজ করবে কি না।
সবাই এগিয়ে আসে, কী বুদ্ধি? শুনি।
বুদ্ধিটা কাজে লাগানোর আগে অবিশ্যি কোনো একটা অস্ত্র লাগবে। একটা দা, কুড়াল বা কাঁটা রাইফেল।
রেবেকা শুকনো মুখে বলল, অস্ত্র পাব কোথায়?
তানিয়া বলল, আহ! বুদ্ধিটা কি শুনি না আগে।
দাঁড়া, আগে লাইট নিবিয়ে দিয়ে আসি, হোস্টেল সুপার টের পেলে বিপদ আছে।
তিনদিন পরের কথা। হোস্টেলটি দেখে মনে হবে সবাই বুঝি শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। সব ঘরের আলো নেবানো, শুধু বারান্দায় কয়টি আলো জ্বলছে। প্রকৃত ব্যাপারটি একেবারে অন্যরকম, দোতালার মাঝামাঝি ঘরটিতে ছয়টি মেয়ে এখনো জেগে আছে। কাসেমকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে যে নাটকটি করা হবে সেটি কয়েকবার রিহার্সাল দেওয়া হয়েছে, এখন সেটি অভিনয় করা হবে। নিচে ডাইনিং হলের রান্নাঘর থেকে একটা দা গোপনে সরিয়ে আনা হয়েছে কাজটি খুব সহজ হয় নি। সত্যি কথা বলতে কি দা যোগাড় করতে একটু সময় লেগে গেছে, না হয় আরো আগেই এই নাটক অভিনয় করা হতো। এই নাটকে অবিশ্যি কোনো দর্শক নেই, জেনে হোক না জেনে হোক সবাই অভিনেতা!
