চল।
মেয়েদের দল যখন নিতুর পিছু পিছু হোস্টেলে ফিরে যেতে শুরু করল তখন খোরাসানী ম্যাডাম চিঁ চিঁ করে বলল, এই কুত্তাটাকে কেউ সরাও না কেন?
হোস্টেল সুপার তোতলাতে তোতলাতে বললেন, আ-আ-আপনার কুকুর। আপনি বললেই সরে যাবে নিশ্চয়ই।
খোরাসানী ম্যাডাম মিন মিন করে বলল, এই সিংঘি, সর বলছি।
কুকুরটা সরে যাবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না বরং ধারালো দাঁত বের করে খোরাসানী ম্যাডামের দিকে গর্জন করে এগিয়ে গেল, যতক্ষণ পর্যন্ত নিতু হোস্টেলে নিরাপদে ফিরে না যাচ্ছে সে তাকে নড়তে দেবে না!
নিতু ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে তার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল, পিছু পিছু অন্য সবাই। কিছুক্ষণের মাঝেই সরা হোস্টেল নীরব হয়ে পড়ে। তবে, কেউ যদি অত্যন্ত কৌতুহলী হয়ে শোনার চেষ্টা করত তাহলে আবিষ্কার করত দোতালার মাঝামাঝি দুইশ বারো নম্বর ঘর থেকে ছয়টি মেয়ে প্রাণপণে তাদের হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করেও সুবিধে করতে পারছে না। একটু পরে পরে তাদের হাসির শব্দ বালিশ চাপা দেয়া সত্ত্বেও বের হয়ে আসছে।
০৫. কাসেম
মাস খানেক পরের কথা। নিতু শেষ পর্যন্ত নতুন স্কুলে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। স্লিপ ওয়াকিংয়ের বিপদটা মনে হয় কেটে গেছে। যদিও খোরাসানী ম্যাডাম ব্যাপারটা গ্রহণ করতে পারে নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করেছে যে নিতুর কাজকর্ম পুরোটুকুই এক ধরনের স্লিপ ওয়াকিং। সে জন্যে তাকে এখনো বড় ধরনের শাস্তি দেয়া হয় নি, এই স্কুলে যখন এসেছে এখানে দীর্ঘদিন থাকবে, নিতুর মতো পুচকে মেয়েকে সিধে করে ছেড়ে দেওয়ার অনেক সুযোগ পাবে। সকলের সামনে খবরের কাগজ পাকিয়ে গালের মাঝে দুই ঘা বসিয়ে দেওয়ার অপমানটুকু সহ্য করতে হয়েছে এবং সেটা নিয়ে কিছু করতে পারছে না সেটাই খোরাসানী ম্যাডাম সহ্য করতে পারছে না। তবে কুকুরটাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়েছে, সেটি আর স্কুলে নেই। তাকে কী করা হয়েছে কেউ জানে না, স্কুলে জোর গুজব যে খোরাসানী ম্যাডাম নিজের হাতে কুকুরটা গলায় পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে মেরেছে–খোরাসানী ম্যাডামের জন্যে সেটা মোটেও অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়।
নিতুর সাথে তার পাঁচ রুমমেটের বন্ধুত্ব আরো বেড়েছে, অন্যেরা মনে হয় তাকে একটু ভয়ই পায়। যে খোরাসানী ম্যাডামের গালে খবরের কাগজ পাকিয়ে সেটা দিয়ে মেরে বসতে পারে, হোক না সেটা ঘুমের মাঝে-তাকে একটু ভয় পাওয়া বিচিত্র কিছু নয়।
হোস্টেলে দুটি জিনিসের অবশ্যি খুব অবনতি হয়েছে, একটি হচ্ছে হোস্টেল সুপারের অত্যাচার অন্যটি কাসেমের চালবাজী। হোস্টেলের সব নিয়ম কানুন তৈরি করে রাখা আছে, কোন কাজ কতক্ষণ করা যাবে আগে থেকে ঠিক করা তার একটু উনিশ-বিশ হলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা। শুধু যে শাস্তি তাই নয়—নাম পাঠিয়ে দেয়া হয় খোরাসানী ম্যাডামের কাছে, তখন যা একটা অবস্থা হয় সেটা বলার মতো নয়। দিনে দিনে কাসেমের চালবাজীও অসহ্য হয়ে উঠেছে। কোনো একটা বিশেষ কারণে কাসেম নিতুকে একেবারে দুই চোখে দেখতে পারে না, সেটা নিতুকে জানাতেও কাসেম কখনো ভুলে না। ক্লাশে কিংবা হোস্টেলে তাকে জ্বালানোর খুব বেশি সুযোগ পায় না, কিন্তু বিকাল বেলা খেলার মাঠে খেলাধূলার নামে কাসেম একেবারে নিতুর বারটা বাজিয়ে ছেড়ে দেয়।
সেদিন ক্লাশ ছুটির পর সবাই হোস্টেলে ফিরে আসছে সিঁড়ির গোড়ায় কাসেম নিতুকে দেয়ালে চেপে ধরল, বলল, এই ছেমড়ি।
নিতু রাগ চেপে রেখে বলল, খবরদার আমাকে ছেমড়ি বলবে না।
তাই নাকি? কী বলব তাহলে? ছেমড়া? নাকি দামড়া?
আমার নাম নিতু।
তোর বাবা-মা তোর নাম রেখেছে নিতু। এই বুতুরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে তোর বাবা-মা আছে?
নিতু কোনো কথা বলল না, কাসেম তার ধারালো দাঁত বের করে হেসে বলল, নেই। এই খানে তোর বাবা মা হচ্ছি আমি। তাই আমি তোর নাম দিলাম দামড়া। আজ থেকে সবাই তোকে ডাকবে মিস দামড়া বেগম!
এই বলে সে হি হি করে হাসতে শুরু করল, যেন ভারি একটা মজার ব্যাপার হয়েছে। আশে পাশে যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল তাদের সবার দিকে তাকিয়ে বলল, আজ থেকে তোরা সবাই একে ডাকবি দামড়া—না হয় তোদের ঠ্যাঙ ভেঙে ফেলব।
নিতুকে কেউ অবিশ্যি দামড়া ডাকে না, কাসেম যে কী জিনিস সেটা সবাই এতদিনে জেনে গেছে।
এর কয়দিন পর রাতে ঘুমানোর আগে বাথরুমে নিতু দাঁত ব্রাশ করছে তখন হঠাৎ করে কাসেম এসে হাজির হল। পিছন থেকে নিতুর চুল টেনে ধরে বলল, এই ছেমড়ি।
নিতু ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, কী হয়েছে?
সামনে ঈদ আসছে জানিস তো?
তাতে কী হয়েছে?
তুই তো নতুন এসেছিস তাই জানিস না। ঈদের আগে আমি সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলি।
চাঁদা?
হ্যাঁ।
একেকজনের এক এক রেট। তোর রেট হল পঞ্চাশ টাকা।
পঞ্চাশ টাকা?
হ্যাঁ। এক সপ্তাহের মাঝে তুই যদি পঞ্চাশ টাকা না দিস তাহলে তোর কপালে দুঃখ আছে।
আমি এত টাকা কোথায় পাব?
তোর বাবার কাছে চিঠি লিখে দে! তোদের ক্লাশে পাঠ্য আছে না, বাবার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লিখ—সেইটা এখন পরীক্ষা হয়ে যাবে, দেখা যাবে কত ভালো করে চিঠি লিখা শিখেছিস। কাসেম তার ধারালো দাঁত বের করে হি হি করে হাসতে শুরু করল।
ধীরে ধীরে নিতুর জীবন মোটামুটি অতিষ্ঠ হয়ে গেল। শুধু যে নিতুর জীবন সেটা সত্যি নয়, মোটামুটি সবার জীবনই, কাসেমের মতো একটা মেয়ে থাকলে মনে হয় জীবনের খুব বেশি কিছু বাকি থাকে না। শেষে এরকম অবস্থা হল যে মনে হতে থাকে কিছু একটা করা না হলে আর এই হোস্টেলে টিকে থাকা যাবে না।
