ঘরের দরজায় কয়েকবার শব্দ করার পর ভেতর থেকে একটা হুংকার শোমা গেল, কে?
হোস্টেল সুপার চি চি করে বলল, আমি।
ভেতর থেকে খোরাসানী ম্যাডাম ধমক দিয়ে বলল, আমি কে?
হোস্টেল সুপার ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, আমি হোস্টেল সুপারিনটেন্ডেন্ট।
এত রাত্রে কী ব্যাপার? বলে খুট করে দরজা খুলে গেল এবং তাকে দেখে সবগুলো মেয়ে একটা আর্ত চিৎকার করে পিছনে সারে এল। খোরাসানী ম্যাডাম একটা হাফপ্যান্ট এবং তার উপরে একটা টী-সার্ট পরে আছে, চুলগুলো উশখু খুশকু চোখ লাল দেখে মনে হয় পাগলা গারদ থেকে কোনো একটা জন্তু ছুটে এসেছে।
খোরাসানী ম্যাডাম হোস্টেল সুপারিনটেন্ডেন্টের সাথে এতগুলো মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেল, তাদের সামনে এরকম পোশাকে চলে এসেছে বলে একটু অপ্রস্তুতও হল। কিন্তু খোরাসানী ম্যাডাম মেয়েদের মানুষ বলেই গণ্য করে না, কাজেই অপ্রস্তুত ভাবটা ঝেড়ে ফেলে গলা ফাটিয়ে ধমক দিয়ে বলল, কী হয়েছে?
হোস্টেল সুপার থতমত খেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, নতুন মেয়েটা কীভাবে কীভাবে জানি বের হয়ে গেছে।
বের হয়ে গেছে? হ্যাঁ, স্লিপ ওয়াকিং।
স্লিপ ওয়াকিং? খোরাসানী ম্যাডাম একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সকাল বেলা এসেমব্লিতে স্লিপ ওয়াকিংয়ের কথা শোনার পর সে একটু খোঁজ খবর নিয়েছে। শহরের একজন ডাক্তার বলেছে এই বয়সের ছেলে মেয়েদের মাঝে এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ঘুমের মাঝে ওরা খুব বিচিত্র কাজ করে ফেলতে পারে। খোরাসানী ম্যাডাম অবিশ্যি ডাক্তারের সাথে পুরোপুরি একমত নয়—-তার ধারণা শক্ত পিটুনি দিয়ে এই ধরনের রোগ বালাই সারিয়ে তোলা সম্ভব। খোরাসানী ম্যাডাম একবার হোস্টেল সুপারের পিছনে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, এই চামচিকাগুলো এখানে কী করছে?।
হোস্টেল সুপার মিন মিন করে বলল, না মানে এত রাত তাই মানে ইয়ে–
খোরাসানী ম্যাডাম ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, কোথায় আছে ঐ ধড়িবাজ আরশোলা? নেউলের বাচ্চা?
মাডামের কথা শেষ হবার আগেই দেখা গেল টুক টুক করে পা ফেলে। ঘুমের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে নিতু এই দিকেই এগিয়ে আসছে। সবাই হঠাৎ করে একেবারে চুপ করে এক পাশে সরে গেল, শুধু খোরাসানী ম্যাডাম দুই হাত কোমরে রেখে যুদ্ধের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, তার মাঝে নিতু এগিয়ে আসছে। হাত দুটি সামনে তুলে ধরা, সেই হাতে লাঠির মতো কিছু একটা ধরে রেখেছে, আরো একটু কাছে এলে বোঝা গেল সেটা একটা খবরের কাগজ পাকিয়ে একটা লাঠির মলে করা হয়েছে। সবচেয়ে বিচিত্র হচ্ছে খোরাসীন ম্যাডামের কুকুরটা, সেটা লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসছে যেন খুব একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে।
খোরাসানী ম্যাডাম আরো একটু এগিয়ে গেল। কোমরে হাত দিয়ে মাথাটা আরো একটু নিচু করে নিয়ে আসে যেন নিতুর মুখটা ভালো করে দেখতে পারে। নিতু ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে আরো একটু এগিয়ে এল, সবাই দেখতে পেল তার দুই চোখ বন্ধ। সে ঘুমের মাঝে হাঁটছে। নিতু হেঁটে হেঁটে খোরাসানী ম্যাডামের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল, তারপর যে ব্যাপারটি ঘটল তার জন্যে কেউ প্রস্তুত ছিল না। নিতু খবরের কাগজ পাকিয়ে তৈরি করা খাটো লাঠিটা দিয়ে চটাশ করে গায়ের জোরে খোরাসানী ম্যাডামের গালে মেরে বসল। ঘটনাটা ঘটল এত হঠাৎ করে যে কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সবাই একটা চিৎকার করতে গিয়ে মুখে হাত দিয়ে থেমে যায়। নিতু তখন খবরের কাগজের পাকানো লাঠিটা হাতে নিয়ে খোরাসানী মাল্লামের অপর গালে মেরে বসল, এবারে আগের থেকেও জোরে। খোরাসানী ম্যাডাম কাক করে একটা শব্দ করে তাল হারিয়ে নিচে পড়ে যায়, তার চোখ বিস্ফোরিত সেখানে বিস্ময়, অবিশ্বাস এবং আতংক!
নিতু হঠাৎ করে ঘুরে গেল, তারপর যেভাবে এসেছিল ঠিক সেইভাবে চোখ বন্ধ করে দুই হাত সামনে তুলে হেঁটে যেতে শুরু করে যেন কিছুই হয় নি। খোরাসানী ম্যাডামের কয়েক মুহূর্ত লাগল ব্যাপারটা বুঝতে, যখন বুঝতে পারল কী ঘটেছে তখন হঠাৎ আঁ আঁ করে শব্দ করে ওঠে দাঁত কিড় মিড় করে নিতুর দিকে ছুটে যেতে থাকে। ভয়ে আতংকে সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলল, এক্ষুনি শুনবে নিতুর আর্তনাদ এবং যখন চোখ খুলে তাকাবে দেখবে খোরাসানী ম্যাডাম টেনে নিতুর মাথা ছিঁড়ে আলাদা করে ফেলেছে, ফিনকি দিয়ে নিতুর কাঁটা মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে সেই রক্তে খোরাসানী ম্যাড্রিম ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে!
কিন্তু তার বদলে হঠাৎ সবাই শুনতে পেল কুকুরের গর্জন এবং তার পর হঠাৎ করে বিশাল কিছু যেন প্রচণ্ড শব্দ করে আছড়ে পড়ল। ভয়ে ভয়ে সবাই চোখ খুলে তাকাল এবং দেখল খোরাসানী ম্যাডাম মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, তার বুকের ওপর দুই পা তুলে কুকুরটা দাঁড়িয়ে আছে। সবগুলি দাঁত বের করে সেটা হিংস্র চোখে খোরাসানী ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে আছে, তার ভাবভঙ্গিতে কোনো লুকাছাপা নেই। একটু নড়লেই সে খোরাসানী ম্যাডামের টুটি ছিঁড়ে ফেলবে। নিতু তার নতুন মনিব তাকে সে যেভাবে পারবে সেভাবেই রক্ষা করবে।
খোরাসানী ম্যাডাম হতভম্ব হয়ে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে শুয়ে রইল। সবাই দেখতে পেল এত হৈ চৈ গোলমালের মাঝেও নিতু এতটুকু বিচলিত না হয়ে সোজা হোস্টেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তানিয়া নিচু গলায় অন্যদেরকে বলল, চল, আমরা যাই।
