রুনু ঝুনু চিৎকার করে বলল, না! না নিতু না।
রেবেকা নিতুর হাত ধরে বলল, খবরদার নিতু, পাগলামো করিস না। এটা করতে যাস নে।
মিতুল ফ্যাকাসে হয়ে মাথা নাড়তে থাকে, বলে, না, না, কী সর্বনাশ!
নিতু শুধু মুখ শক্ত করে বলল, না। এটাই সবচেয়ে ভালো। তাহলে কেউ আর অবিশ্বাস করবে না।
গভীর রাত। সবাই ঘুমুচ্ছে, তার মাঝে নিতু এবং অন্য সবকয়টি মেয়ে বিছানা থেকে নেমে এল। নিতু তার টেবিলের উপর থেকে একটা পুরানো খবরের কাগজ নিয়ে সেটা পাকিয়ে একটা লাঠির মতো করে নিল, তারপর গলা নামিয়ে ফিস ফিস করে বলল, গেলাম।
সাবধানে থাকিস।
এর মাঝে আবার সাবধানে থাকব কী করে?
তাও ঠিক।
খুব সাবধানে দরজা খুলে নিতু বের হয়ে গেল। ওরা চুপ করে বসে থেকে খানিকক্ষণ সময় দেয়। নিতু গতকালকের মতো আজকেও কার্নিশ ধরে হেঁটে গিয়ে পাইপ বেয়ে নেমে যাবে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেল নিতু খোয়া বাঁধানো রাস্তাটার কাছে চলে এসেছে। খোরাসানী ম্যাডামের ভয়ংকর কুকুরটাও ছুটে এসে নিতুকে ঘিরে নাচানাচি করছে। এরকম ভয়ংকর কুকুরকে যে এভাবে বশ করে ফেলা সম্ভব নিজের চোখে না দেখলে ওরা কেউ বিশ্বাস করত না।
তানিয়া সবার দিকে তাকিয়ে বলল, রেডি?
অন্যেরা মাথা নাড়ল।
চল তাহলে।
পাঁচজন দড়াম করে যত জোরে সম্ভব দরজাটা খুলে ঘর থেকে ছুটে বের হল। তারপর সবাই দুদ্দাড় করে বারান্দা ধরে দৌড়াতে থাকে, মধ্যরাতে তাদের পায়ের শব্দ আর আধা আতংকিত কথাবার্তায় হঠাৎ হোস্টেলের অনেকে জেগে ওঠে জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। রুনু ঝুনু তানিয়া মিতুল আর রেবেকা এই পাঁচজন হোস্টেল সুপারের দরজা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, প্রায় সাথে সাথেই হোস্টেল সুপার দরজা খুলে বের হয়ে এল। মহিলা এমনিতেই শুকনো চিমশে এই মধ্যরাতে ঘুম থেকে ওঠার পর তাকে আরো শুকনো দেখাচ্ছে, ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে, কী? কী হয়েছে?
মিতু বলল, সর্বনাশ।
হোস্টেল সুপার আরো ভয় পেয়ে বলল, কী সর্বনাশ?
আমাদের রুমে যে নতুন মেয়েটা এসেছে—
হ্যাঁ। কী হয়েছে তার? মরে গেছে?
না, মরে নাই।
তাহলে?
সে নাই।
না। রেবেকা চোখে মুখে আতংকের একটা ভাব ফুটিয়ে বলল, হঠাৎ করে বিছানা থেকে উঠে চোখ বন্ধ করে হেঁটে হেঁটে বের হয়ে গেল।
হোস্টেল সুপার ভুরু কুচকে বলল, বের হয়ে গেল? কোথায় বের হয়ে গেল?
জানি না।
রুনু কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, দেখলাম রেলিং ধরে কার্নিশে নেমে গেছে।
কার্নিশ? হোস্টেল সুপার চিৎকার করে বলল, কার্নিশে?
হ্যাঁ।
সর্বনাশ! বলে প্রায় দৌড়ে হোস্টেল সুপার বারান্দায় রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে দাঁড়িয়ে এবারে সবাই দেখতে পায়, অনেক দূরে ছায়ামূর্তির মতো নিতুকে দেখা যাচ্ছে, অন্ধকারে হাঁটছে, তাকে ঘিরে নাচানাচি করছে। ভয়ংকর দর্শন একটা কুকুর।
হোস্টেল সুপারের চোয়াল স্কুলে পড়ল। খানিকক্ষণ সেই দৃশ্যের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তার শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে। কোনোভাবে একটা টোক গিলে বলল, নিশ্চয়ই জীনের আছর হয়েছে।
তানিয়া মাথা নাড়ল, না ম্যাডাম। স্লিপ ওয়াকিং।
স্লিপ ওয়াকিং?
হ্যাঁ। ঘুমের মাঝে হাঁটা।
ঐ ঐ মেয়েটা ঘুমের মাঝে হাঁটছে? এখন ঘুমাচ্ছে?
জি ম্যাডাম। তানিয়া গম্ভীর গলায় বলল, যখন বারান্দায় হাঁটছিল তখন আমরা দেখেছি চোখ বন্ধ ছিল।
হোস্টেল সুপার খানিকটা জড় বুদ্ধি মানুষের মতো কাজেই সে নিজে থেকে কিছুই করতে পারছিল না, তানিয়া তাই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে, ম্যাডাম।
কী?
আমাদের কি খোরাসানী ম্যাডামকে খবর দেওয়া উচিত না?
হোস্টেল সুপারের শুকনো চিমশে থাকা মুখ ভয়ে আরো চিমশে হয়ে উঠল, মেয়েদের মতো অন্য সবাই খোরাসানী ম্যাডামকে ভয় পায়। শুকনো গলায় বলল, খোরাসানী ম্যাডামকে কেন?
নিতুকে তার ঘরে এনে ঘুম পাড়াতে হবে না?
তাহলে?
কুকুরটা যে সাথে আছে। অন্য কেউ কাছে গেলে যদি কামড়ে দেয়?
ও।
যদি কুকুরটা নিতুকে কামড়ে দেয়?
ও। হোস্টেল সুপারকে খুব বিভ্রান্ত দেখাল বেশ খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, তাহলে খোরাসানী ম্যাডামকে ডাকা উচিত?
রেবেকা মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, ম্যাডাম। ভালোমন্দ যদি কিছু হয়—
কিন্তু কিন্তু–
কিন্তু কী?
আমার মনে হয় জীনের আছর। হোস্টেল সুপার ফ্যাকাশে মুখে বিড় বিড় করে সূরা পড়তে থাকে। তারপর শুকনো মুখে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, একা একা যাওয়া কী ঠিক হবে?
জমিলার মাকে ডেকে আনি?
সেইটা তো আর ভীতু।
তাহলে।
তো-তোরা গিয়ে ডাকতে পারবি না?
সর্বনাশ! ওরা ভয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। না ম্যাডাম। খোরাসানী ম্যাডামকে আমরা খুব ভয় পাই।
আ-আ-আমরাও কিছু একটা বলতে গিয়ে হোস্টেল সুপার থেমে গেল।
আপনারাও ভয় পান?
হোস্টেল সুপার কোনো কথা না বলে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মাঝ রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা হোস্টেল সুপার এবং আরো কয়েকজনের কথাবার্তা শুনে ভয়ে ভয়ে আরো দু-একজন মেয়ে দরজা খুলে উঁকি দিল, তার মাঝে যাদের সাহস বেশি তারা কী হচ্ছে দেখার জন্যে বের হয়ে এল। সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখে স্কুলের মাঠে গভীর রাতে একটি মেয়ে হাঁটছে, তাড়াতাড়ি হাঁটা নয়, খুব ধীরে ধীরে হাঁটা, অনেকটা যেন স্বপ্নের একটা দৃশ্য। তাকে ঘিরে একটা কুকুর নেচে কুদে বেড়াচ্ছে কিন্তু সেই মেয়েটার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
হোস্টেল সুপার শেষ পর্যন্ত জমিলার মাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। জমিলার মা এবং ঘুম থেকে জেগে ওঠা মেয়েগুলোকে নিয়ে একটা ছোট মিছিলের মতো সবাই খোরাসানী ম্যাডামের বাসার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সবার হাতেই কোনো না কোনো ধরনের লাঠি সোটা হঠাৎ করে কুকুরটা যদি তাদের দিকে তেড়ে আসে সে জন্যে। সবার সামনে জমিলার মা, তার হাতে একটা ছয় ব্যাটারির টর্চ লাইট। কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে ছোট মিছিলটা খোরাসানী ম্যাডামের বাসার দিকে এগুতে থাকে। স্কুলের সীমানার একেবারে শেষ মাথায় তার ছোট একতালা বাসা। খোরাসানী ম্যাডাম একা সেই বাসায় থাকে, তার সাথে আর কেউ থাকতে পারে সেটা অবিশ্যি বিশ্বাস করার কথাও নয়।
