তাহলে কী বলব?
আমার নাম নিতু।
মেয়েটা তার ছোট ছোট ধারালো দাঁত বের করে হেসে বলল, নিতু বড় কঠিন নাম, বলতে গিয়ে দাও ভেঙ্গে যায়। ছেমড়ি কলা খুব সোজা। এই দ্যাখ ছে-ম-ড়ি! কতসোজা! যেন খুব মজার ব্যাপার হয়েছে সে রকম ভান করে মেয়েটা দুলে দুলে হি-হি করে হাসতে শুরু করল।
নিতু কী করবে বুঝতে পারল না। সব ক্লাশে এ রকম একটা করে মেয়ে থাকে যার যন্ত্রণায় জীবন অতিষ্ট হয়ে যায়। আগে স্কুল থেকে বাসায় গেলে এদের যন্ত্রণা থেকে বাঁচা যেতো কিন্তু এখানে কী হবে? স্কুল থেকে যাবে হোস্টেলে সেখানে তো এই যন্ত্রণা আরো দশগুণ বেড়ে যাবে।
মেয়েটা নিতুর আরো কাছে এসে বলল, ভেবেছি তোর গুল পট্টি আমি বিশ্বাস করেছি?
কর নাই?
না। তোর মতো মিথুকদেরকে দেখলেই চেনা যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তুই নিশ্চয়ই মহা বদমাইস সেই জন্যে তোকে টাইট করার জন্যে এখানে পাঠিয়েছে।
নিতু মাথা নাড়ল। বলল, ঠিকই বলেছিস। মেয়েটা একটু হকচকিয়ে গেল, বলল, কী বললি?
বলেছি যে তুই ঠিকই বলেছিস। আমি এত বড় বদমাইস যে আমার বাসায় কেউ আমাকে টাইট করতে পারে নাই।
মেয়েটা ছোট ছোট চোখে তাকাল, তুই কী করেছিলি?
তুই পত্রিকা পড়িস? ভোরের কাগজে বের হয়েছিল। জুলাই মাসের আঠার তারিখে। তৃতীয় পৃষ্ঠা।
কি বের হয়েছিল?
নিতু উদাস উদাস মুখ করে বলর, তোর যদি সখ থাকে তাহলে তুই নিজেই পড়ে নে। খরবটার হেড লাইন ছিল অমানুষিক!
অ-অমানুষিক?
হ্যাঁ। আমি সে রাতেও স্লিপ ওয়াকিং করতে বের হয়েছিলাম। তবে সেদিন খালি হাতে ছিলাম না। হাতে ছিল একটা কুড়াল।
কুড়াল?
হ্যাঁ। চাইনিজ কুড়াল। এইরকম ছোট। নিতু হাত দিয়ে দেখাল, তবে খুব খার।
মেয়েটার চোখে প্রথমে অবিশ্বাস তারপর বিস্ময় এবং শেষে আত ওঠল। শুকনো গলায় বলল, কী করেছিলি চাইনিজ কুড়াল দিয়ে?
নিতু ঠোঁট উল্টে তার একটা বই টেনে নিয়ে বলল, তোর জানার ইচ্ছা থাকলে তুই বের করে নে।
মেয়েটা কিছুক্ষণ নিতুর দিকে তাকিয়ে থেকে পায়ে পায়ে হেঁটে সরে গেল। নিতু চোখের কোনা দিয়ে দেখল পিছনে বসে আরো কয়েকজন মেয়ের সাথে। বসে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কথা বলছে সবার চোখে এক ধরনের ভয়। নিতু তার পাশে বসে থাকা মিতুলকে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই মেয়েটা কে?
কাসেম।
কাসেম? কাসেম তো ছেলেদের নাম।
হ্যাঁ। ওর ভাবভঙ্গি ছেলেদের মতো নামও ছেলেদের।
নিতু অবিশ্বাসের ভঙ্গি করে মিতুলের দিকে তাকাল, মিতুল মাথা নেড়ে বলল, সত্যি! কাসেমের বাবা নেই। যখন জন্ম হয়েছে মায়ের খুব ঝামেলা ছিল তাই খেয়াল করে দেখে নাই ছেলে না মেয়ে। ভেবেছে ছেলে হয়েছে তাই নাম রেখেছে কাসেম। পরে দেখেছে মেয়ে তখন আলসেমী করে নাম আর পাল্টায় নাই।
আশ্চর্য!
এরকম সময়ে হেঁটে হেঁটে রুনু আর ঝুনু হাজির হল। এদিক সেদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে ঝুনু বলল, নিতু! তোর কী সাংঘাতিক সাহস?
রুনু মাথা নেড়ে বলল, হা! কেমন করে তুই পারলি?
নিতু গলা নামিয়ে বলল, কী করব? ধরা পড়লে তো এমনিতেই খুন হয়ে যাব।
তা ঠিক।
এখন কী হবে?
নিতু আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় ঘণ্টা পড়ে গেল বলে বলতে পারল না, সবাই ক্লাশে ফিরে এল।
বুরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েরা নিজেদের মাঝে কথা বলার বিশেষ সুযোগ পায় না—তার মাঝেও খুব কষ্ট করে তারা খানিকটা সময় করে নিল, বিকালে ঘুমের পরে, রাত্রে খাবার টেবিলে, খাবার পরে এবং ঘুমানোর ঠিক আগে। নিতু যে মহাবিপদে পড়েছে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা যায় কী না সেটা নিয়ে আলোচনা। তানিয়া খুব কম কথা বলে, সে মাথা নেড়ে বলল, একটা মাত্র উপায়।
রেবেকা চোখে চশমাটা চেপে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, কী উপায়?
যদি কোনোভাবে বিশ্বাস করানো যায় যে সত্যি সত্যি নিতু স্লিপ ওয়াকিং করে, সত্যি সত্যি ঘুমের মাঝে হাঁটে, তাহলে বিপদ কাটতে পারে।
সেটা কীভাবে করবি?
আবার নিতুকে ঘুমের মাঝে হাঁটতে হবে। সবাইকে দেখিয়ে।
নিতু বলল, এটা আর কঠিন কী? আমি তো হাঁটতেই পারি।
তানিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, কিন্তু সেটা সবার বিশ্বাস হতে হবে। বিশেষ করে হোস্টেল সুপার। আর খোরাসানী ম্যাডাম।
মিল বলল, সেটা কীভাবে করা যায়।
তানিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, এমন ভাবে স্লিপ ওয়াকিং করতে হবে যেটা খুব ভয়ংকর। যেটা কেউ করে না। যেটা দেখলেই সবাই বিশ্বাস করবে যে এইটা সত্যি।
নিতু বলল, ঠিক বলেছিস। কী করা যায়?
একটা ভয়ংকর ব্যাপার হতে পারে তুই যদি কার্নিশ ধরে হাঁটতে থাকিস আর আমরা হোস্টেল সুপারকে ডেকে আনি, তার সামনে তুই হাঁটবি।
রুনু একটু শিউরে উঠে বলল, সর্বনাশ! যদি পড়ে যায়?
পড়ে গেলে তো শেষ।
আরো ভয়ংকর করা যায়। যদি চোখ বন্ধ করে ছাদের রেলিংয়ের উপর দিয়ে হাঁটতে পারিস।
রেবেকা শিউরে উঠে বলল, সর্বনাশ! দৃশ্যটি চিন্তা করেই তার হাত যা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
পারবি তুই? পারব না কেন। একবার পারব।
তানিয়া হঠাৎ বলল, দাঁড়া, আমার মাথায়, আরেকটা বুদ্ধি এসেছে। যদি শিপ ওয়াকিং করে ভয়ংকর কিছু একটা করতেই চাস তাহলে সবচেয়ে ভয়ংকর কাজটা করলে কী হয়?
সবাই তানিয়ার দিকে ঘুরে তাকাল, সবচেয়ে ভয়ংকর?
হ্যাঁ।
কী সেটা?
তানিয়া এদিক সেদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে কাজটা কী বলতেই সবাই মুখে হাত দিয়ে আর্ত চিৎকার করে ওঠে। তানিয়া সরু চোখে নিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, পারবি?
নিতু বুক ভরে একটা নিশ্বাস নিয়ে মুখ শক্ত করে বলল, পারব।
