কোন ইবলিশের বাচ্চা শয়তানের ছাও সাপের বংশ ছাতিম গাছে ওঠেছিলি?
কেউ কোনো কথা বলে না। নিতু দ্রুত চিন্তা করতে থাকে—ঠিক ঠিক সিদ্ধান্ত যদি না নেয় সে জন্মের মতো শেষ হয়ে যাবে।
খোরাসানী ম্যাডাম হঠাৎ আবার আকাশ ফাটিয়ে হুংকার দিল, কথা বল বিষ ফোড়ার পুঁজ, বাদুরের বমি–
নিতু তখন হঠাৎ হাত তুলে গলায় স্বর খুব স্বাভাবিক রেখে বলল, ম্যাডাম, কাপড়ের টুকরাটা কী একটু দেখতে পারি।
এসেমব্লিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় একশ জন মেয়ে এবং ছয়জন ম্যাডাম আর একজন বুয়া এক সাথে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল। এসেমব্লিতে দাঁড়িয়ে মাথা ঘোরানো ঘোরতর বেআইনী কাজ জেনেও সব কয়টি মেয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিতুকে দেখার চেষ্টা করল।
খোরাসানী ম্যাডামকে দেখে মনে হল তার মাথায় বুঝি বাজ পড়েছে, খানিকক্ষণ মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল তারপর তোতলাতে তোতলাতে বলর, কী? কী বললি?
নিতুর বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ড ঢাকের মতো শব্দ করছে কিন্তু সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে খুব স্বাভাবিক থাকার ভান করে শান্ত গলায় বলল, আমি কাপড়টা একটু কাছে থেকে দেখতে চাইছিলাম।
খোরাসানী ম্যাডাম নিতুর কথা শুনে এত অবাক হয়েছে যে রেগে উঠতেও ভুলে গেছে, আবার তোতলাতে তোতলাতে বলল, কে-কে-কেন?
আমার ঘুমের কাপড়টা অনেকটা এই রকম।
অনেকটা এইরকম?
জি ম্যাডাম?
খোরাসানী ম্যাডাম কাপড়ের টুকরাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে থেমে গেল—এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। মুখটা ভয়ংকর করে বাঘের গর্জনের মতো হুংকার দিয়ে বলল, এইখানে আয়।
নিতু তখন কুলকুল করে ঘামছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, কিন্তু প্রাণপণে নিজেকে শান্ত রেখে হেঁটে হেঁটে খোরাসানী ম্যাডামের কাছে এগিয়ে এল। খোরাসানী ম্যাডাম তার ঘুমের কাপড়ের ভেঁড়া টুকরাটা ওপরে ধরে রাখল যেন নিতুকে মাথা উঁচু করে দেখতে হয়। নিতু কাছে আসতেই কাক করে তার ঘাড় ধরে হ্যাচকা টানে উপরে তুলে নিয়ে কাপড়ের টুকরাটার সামনে তাকে ধরে রাখে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় নিতু ছটফট করতে থাকে, যখন মনে হয় নিশ্বাস আটকে তার বুক ফেটে যাবে তখন খোরাসানী ম্যাডাম তাকে ওপর থেকে ছেড়ে দিল, সে নিচে পড়ে গিয়ে তাল সামলে কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। খোরাসানী ম্যাডাম তখন তার কেঁদো বাঘের মতো মুখটা নিচে নামিয়ে এনে দাঁতে দাঁত ঘষে হিংস্র গলায় জিজ্ঞেস করল, কাপড়টা কি চিনেছিস ঘেসে সাপ? চিনে জোক? মাকড়শীর ডিম?
জি ম্যাডাম। নিতু মুখের চেহারা স্বাভাবিক রেখে সবাই শুনতে পারে সে রকম ভাবে বলল, এইটা আমার জামার কাপড়ের টুকরা।
নিতর গলার স্বর শুনে সবাই এত অবাক হল যে আকাশ থেকে একটা বজ্রপাত হলেও বুঝি কেউ এত অবাক হত না। সবচেয়ে বেশি অবাক হল খোরাসানী ম্যাডাম নিজে, তার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ এইভাবে একটা কথা বলতে পারে খোরাসানী ম্যাডাম চিন্তাও করতে পারে না। খানিকক্ষণ মুখ হাঁ করে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, তোর জামার কাপড়ের টুকরা মাঝ রাতে ছাতিম গাছে কেমন করে গেল?
জানি না ম্যাডাম।
জানিস না?
না, ম্যাডাম।
খোরাসানী ম্যাডাম চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষণ নিতুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুই মাঝরাতে কেন ছাতিম গাছে উঠেছিলি জানিস না?
না ম্যাডাম। তবে—
খোরাসানী ম্যাডাম চোখ ছোট ছোট করে বলল, তবে?
তবে আমার শরীরে ব্যথা এবং পায়ে খামচির দাগ দেখে মনে হয়—
দেখে মনে হয়?
দেখে মনে হয় আমি নিশ্চয়ই উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিয়েছি। আর–
আর?
কুকুর বিড়াল কিছুএকটা আমাকে আঁচড়ে দিয়েছে।
খোরাসানী ম্যাডাম মুখ হাঁ করে নিতুর দিকে তাকিয়ে রইল এবং তার সামনে প্রায় একশ মেয়ে বিস্ফোরিত চোখে এই নাটক দেখতে লাগল। খোরাসানী ম্যাডামের কেঁদো বাঘের মতো মুখটাকে কেমন জানি বিচিত্র দেখাতে থাকে। হঠাৎ করে তার ভয়ংকর কুকুর সিংঘির কথা মনে পড়েছে, যদি দশ বার বছরের একটা মেয়ে সেই ভয়ংকর কুকুরের আক্রমণকে কুকুর বিড়াল আঁচড়ে দিয়েছে বলে ব্যাখ্যা করে তবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে।
নিতু মুখ শক্ত করে বলল, আমি শুনেছি আমি নাকি ঘুমের মাঝে স্লিপ ওয়াকিং করি। নিশ্চয়ই গত রাতে আমি স্লিপ ওয়াকিং করেছি।
খোরাসানী ম্যাডাম খানিকক্ষণ নিতুর মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল, স্লিপ ওয়াকিং করার জন্যে এখনই এই মেয়েটার মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেলবে নাকি ব্যাপারটা আরেকটু খতিয়ে দেখবে চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত আরেকটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। নাক দিয়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, যা। লাইনে গিয়ে দাঁড়া। দেখি তুই কত বড় ধড়িবাজ। খালি মুণ্ডুটা ছিড়ব না কি পুরো শরীরটাকে কিমা বানিয়ে সিংঘিকে খেতে দিব একটু ভেবে দেখি।
নিতু বুক থেকে একটা নিশ্বাস বের করে দিয়ে লাইনে নিজের জায়গায় দাঁড়াল। এ যাত্রা সে বেঁচে গিয়েছে, কিন্তু কতক্ষণের জন্যে বেঁচেছে কে জানে।
টিফিনের ছুটিতে লম্বা মতন একটা মেয়ে এসে নিতুর চুল টেনে ধরল, একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, এই ছেমড়ি।
নিতু মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল, জোড়া ভুরু, কেঁকড়া চুল দুই গালে ফুস্কুরির মতো ব্রণ। নিতুর চুল টেনে মাথা নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, এই
ছেমড়ি, তুই গুল গপ্পা মারার জায়গা পাস না?
নিতু ঝটকা মেরে নিজের মাথা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, আমাকে ছেমড়ি বলবে না।
