সুলেমান কোনো কথা বলল না। মাসুদ ভাই বলল, তোমারে কেউ কিছু বলে নাই, কোনো জোর করে নাই আর তুমি ইয়াহিয়া খানের মতো একটা মানুষের ছবি বলাই কাকুর চায়ের স্টলে ঝুলিয়ে দিলে। কাজটা ঠিক হলো?
সুলেমান মাথা নেড়ে জানাল, কাজটা ঠিক হয় নাই। মাসুদ ভাই বলল, ছবিটা নামাও।
সুলেমান কাঁপতে কাঁপতে ছবিটা নামাল। মাসুদ ভাই বলল, আমার সামনে রাখো।
সুলেমান তার সামনে রাখল। মাসুদ ভাই তখন পা দিয়ে মাড়িয়ে ফ্রেমের কাঁচটা ভেঙে ফেলল। তারপর লাথি দিয়ে ফ্রেমটা সুলেমানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ভেতর থেকে ছবিটা বের কর।
সুলেমান ছবিটা বের করল। মাসুদ ভাই বলল, এখন এটা ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাও।
সুলেমান কথাটা বুঝতে পারল না, হাঁ করে মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মাসুদ ভাই এবার ধমক দিয়ে বলল, কথা কানে যায় না? বললাম না ছবিটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাও। খেয়ে আমাকে বল এর টেস্ট কেমন।
সুলেমান ধমক শুনে কেঁপে উঠল, তারপর সত্যি সত্যি ছবিটার একটু খানিক ছিঁড়ে মুখে দিয়ে চিবুতে লাগল। দৃশ্যটা দেখে আমাদের এত হাসি পেল যে বলার নয়, সত্যি সত্যি আমরা হেসে ফেললাম আর আমাদের হাসি শুনে অন্যেরাও হাসতে শুরু করল।
মাসুদ ভাই সত্যি সত্যি সুলেমানকে দিয়ে পুরো ছবিটা খাওয়াত কি না আমরা সেটা দেখতে পেলাম না। কারণ ঠিক তখন দুইজন মুক্তিযোদ্ধা মতি রাজাকারকে ধরে মাসুদ ভাইয়ের কাছে নিয়ে এল। একজন মুক্তিযোদ্ধা বলল, এই রাজাকার লুকিয়ে মিলিটারির ক্যাম্পে যাচ্ছিল খবর দিতে!
মাসুদ ভাই বলল, তুমি যেতে দিলে না কেন? তুমি কি মনে করো খবর পেলেও মিলিটারি এখন বের হতো? কখনো না। এরা অন্ধকারে বের হয় না। এদের সব বীরত্ব দিনের বেলা পাবলিকের সাথে! মাসুদ ভাই মতি রাজাকারের দিকে তাকিয়ে বলল, কী রাজাকার সাহেব? আপনার কি মনে হয় আপনার মিলিটারি বাবারা যদি খবর পায় আমরা এখানে বসে আছি তাহলে তারা বের হবে? এই সাহস আছে?
মতি রাজাকার কোনো কথা বলল না, কী রকম জানি ফ্যাকাসে মুখে মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মাসুদ ভাই কিছুক্ষণ মতি রাজাকারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল, তুমি মইত্যা রাজাকার না?
মতি রাজাকার কেমন যেন ভয় পেয়ে মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো কথা বলল না। মাসুদ ভাই এবারে স্টেনগানটা কোলের ওপর থেকে হাতে নিল, সাথে সাথে মতি রাজাকার মাথা নাড়তে থাকল।
মাসুদ ভাই বলল, আজকে কী কী লুট করেছ দেখাবে?
মতি রাজাকার তার পোঁটলাটা ধরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা টান দিয়ে পোটলাটা হাতে নিয়ে সবকিছু মাটিতে ঢেলে দিল, কয়েকটা ঘড়ি, একটা ট্রানজিস্টর রেডিও, বিছানার চাদর, কয়েকটা শাড়ি, কাঁসার থালাবাসন কিছু খুচরা টাকা বের হলো। মাসুদ ভাই সেগুলো দেখে হতাশভাবে মাথা নাড়ল, জিজ্ঞেস করল, এই? কোনো সোনাদানা পাও নাই?
মতি রাজাকার কোনো কথা বলল না। মাসুদ ভাই তখন হঠাৎ করে গম্ভীর হয়ে গেল, হাত দিয়ে তাঁর গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, আমি আসলে তোমাকে খুঁজছিলাম। খবর পেয়েছি তুমি নাকি গ্রামে গ্রামে খুব উৎপাত করো। কমবয়সী মেয়ে-ছেলেদের দিকে নজর? সত্যি নাকি?
মতি রাজাকার মাথা নেড়ে জানাল যে এটা সত্যি না। মাসুদ ভাই বলল, ঠিক আছে তাহলে এখানেই বিচার হয়ে যাক। এই যে সব গ্রামের মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তাদেরকে জিজ্ঞেস করি। তারা যদি বলে তুমি নির্দোষ আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। তুমি তোমার লুটের মাল নিয়ে বাড়ি যাবা। রাজি?
মতি রাজাকার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, কোনো কথা বলল না। মাসুদ ভাই তখন একটা ধমক দিল, কী হলো? কথা বলো না কেন?
মতি রাজাকার ধমক খেয়ে চমকে উঠে বলল, আপনার পা ধরি আমারে মাফ করে দেন। এই কান ধরে বলছি আর জীবনে কাউরে কিছু করব না। আল্লাহর কসম। কথা বলতে বলতে সে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল, কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভুল করে ফেলেছি, আর করব। আজ থেকে আমি জয় বাংলা হয়ে যামু, খোদার কসম বলছি। আর মিলিটারির লগে থাকমু না গ্রামের মানুষরে কোনো উৎপাত করমুনা, সবার সামনে কথা দিতেছি।
মাসুদ ভাই হাত তুলে বলল, থামো। খামোখা কান্নাকাটি করো না। তোমাকে ছেড়ে দিলে তুমি আবার রাজাকার হয়ে যাবে, আমি জানি। বলাই কাকুরে তোমরা যেভাবে মেরেছ, তোমাকে সেই ভাবে মারলে তোমার আর রাজাকার হওয়ার উপায় থাকবে না। বুঝেছ?
মতি রাজাকার হঠাৎ ছুটে এসে মাসুদ ভাইয়ের পা ধরে সেখানে মাথা ঘষতে ঘষতে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, আল্লাহর কসম লাগে আমারে মাফ করে দেন। আর জীবনে বেইমানি করমু না, আজ থেকে আমি জয় বাংলা, পাকিস্তানের মুখে জুতা মারি…
মাসুদ ভাই পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে মতি রাজাকারকে সরিয়ে দিয়ে বলল, থামো। কান্নাকাটি করো না, তোমাকে মারতে হলে আমার একটা গুলি খরচ হবে, আমি তোমার জন্য একটা গুলি নষ্ট করতে রাজি না। আমাদের অস্ত্রপাতি অনেক সাবধানে খরচ করতে হয়।
মতি রাজাকার মাথা তুলে বলল, তাহলে আমারে মাফ করে দিলেন?
না, মাফ করি নাই। কিন্তু তোমারে একটা সুযোগ দিলাম। তুমি যদি আর মানুষের উৎপাত করো, মেয়েদের দিকে নজর দাও তাহলে তোমারে আমি শেষ করে দেব। গুলি যদি একটা নষ্ট করতে হয়, তাও নষ্ট করব। মনে থাকবে?
