লতিফা বুবুর চোখ দুটি জ্বলজ্বল করতে লাগল। দেখে বুঝতে পারলাম সত্যি সত্যি দরকার হলে লতিফা বুবু বিষ খেয়ে ফেলবে।
লতিফা বুবু আমার হাতে টাকাটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, যা, এক্ষুনি যা। ইন্দুর মারার বিষ কিনে দে।
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। লতিফা বুবুর টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। আমার এত মন খারাপ হলো যে সেটা বলার মতো না। যতই দিন যাচ্ছে গ্রামের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। আমাদের গ্রামে এখন কোনো হিন্দু নাই। আওয়ামী লীগ করে সেই রকমও কেউ নাই। মতি রাজাকার মিলিটারির দল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। মিলিটারি মানুষ মেরে কালী গাংয়ে ফেলে দেয়, বাড়িতে আগুন দেয়। কমবয়সী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। কয়েক দিন পরে তাদের লাশও কালী গাংয়ে ভেসে ওঠে। কী হবে চিন্তা করে কূল-কিনারা পাই না। শুধু মাঝে মাঝে বহুদূর থেকে গোলাগুলির শব্দ আসে, তখন বুঝতে পারি মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করছে। কখন মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে এসে এই ক্যাম্পটা দখল করবে? কখন আমরা শান্তিতে ঘুমাব?
এখন তার সাথে যোগ হয়েছে লতিফা বুবুর ব্যাপারটা, পকেটে তার দলামোচা টাকার নোটটা কেমন যেন গরম কয়লার মতো জ্বলছে। আমি কী করব এখন? আসলেই লতিফা বুবুকে ইঁদুর মারার বিষ কিনে দেব?
আমি তখনও জানতাম না এই সমস্যাটা খুব তাড়াতাড়ি এমনভাবে মিটে যাবে, যেটা স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই।
.
১৭.
মিলিটারিরা মানুষ মারার জন্য কিংবা গ্রাম জ্বালানোর জন্য যেখানেই যাক না কেন তারা অন্ধকার হবার আগে ফিরে আসে। আমি আর মামুন কালী গাংয়ের পাড়ে বসে দেখছিলাম মিলিটারিগুলো কোনো একটা গ্রামে সর্বনাশ করে ফিরে এসে সারি বেঁধে আমাদের স্কুলে ঢুকে গেল। মতি রাজাকার আর তার দলও তাদের লুট করা মালপত্রের বোঁচকাকুঁচকি নিয়ে নিজেদের বাড়িতে রওনা দিল।
তখন একটা খুবই বিচিত্র ব্যাপার ঘটল। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম ধানক্ষেতের কাদার ওপর দিয়ে ছপাত ছপাত করে হেঁটে লুঙ্গি গেঞ্জি পরা কিছু মানুষ আসছে। তাদের কাঁধে রাইফেল, বুকের মাঝে গুলির বেল্ট। মাথার মাঝে গামছা বাঁধা। দেখেই বুঝতে পারলাম এরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম–এরা কি মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করতে আসছে? এখন? এভাবে?
মুক্তিযোদ্ধার দলটা কোনো দিকে তাকাল না, ধান ক্ষেত থেকে সড়কে উঠে আমাদের সড়ক ধরে হাঁটতে লাগল। তারা হেঁটে হেঁটে একেবারে কালী গাংয়ের তীরে এল। তারপর ডান দিকে ঘুরে বলাই কাকুর চায়ের স্টলের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে কালী গাংয়ের তীর ঘেঁষে জংলা জায়গাটার দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম আজকে এখানে তাদের যুদ্ধ করার পরিকল্পনা নেই, এরা কোথাও যাচ্ছে। আমরা হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম কারণ দেখতে পেলাম মুক্তিযোদ্ধারা আসছে তো আসছেই, মনে হচ্ছে তাদের কোনো শেষ নেই। প্রথম প্রথম তাদের কাছে ছিল রাইফেল পরের দিকে যারা আসতে লাগল তাদের কাছে আরো ভারী ভারী অস্ত্র, নানা রকম মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড লঞ্চার আমরা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
তখন সবচেয়ে সাংঘাতিক ঘটনাটা ঘটল, আমরা মাসুদ ভাইকে দেখলাম। প্রথমে চিনতে পারিনি কারণ চুল লম্বা হয়ে গেছে, মুখে দাড়ি গজিয়ে গেছে। মাসুদ ভাই আলগোছে একটা স্টেনগান ধরে হেঁটে হেঁটে আসছে। তার ঠিক পেছনে দুইজন, মনে হলো মাসুদ ভাইয়ের বডিগার্ড।
এতক্ষণ কেউ থামে নাই সবাই হেঁটে হেঁটে চলে গেছে কিন্তু মাসুদ ভাই বলাই কাকুর চায়ের স্টলে থামল। একটা চেয়ার বাইরে নিয়ে এসে সেখানে আরাম করে বসল। তার দুইজন বডিগার্ড স্টলের দুই পাশে মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মাসুদ ভাই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল। আমরা সবাই তখন মাসুদ ভাইকে ঘিরে দাঁড়িয়েছি, মাসুদ ভাই আমাদের সবার দিকে তাকাল কিন্তু কারো সাথে একটা কথাও বলল না। এমন কি আমাদের চিনতে পেরেছে সে রকমও কোনো ভাব দেখাল না। সিগারেট টানতে টানতে প্রথম কথা বলল, সুলেমান নামের যে মানুষটা বলাই কাকুর চায়ের স্টল দখল করেছে তার সাথে। তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম সুলেমান?
সুলেমানের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কোনো মতে সে মাথা নাড়ল।
তুমি নাকি মতি রাজাকারের মামু? সত্যি নাকি?
সুলেমানের হাত তখন কাঁপতে শুরু করেছে, কোনোমতে আবার মাথা নাড়ল।
এই স্টলটা দখল করার জন্য বলাই কাকুরে মিলিটারি দিয়ে মার্ডার করিয়েছ, নাকি বলাই কাকু মার্ডার হয়েছে বলে এটা দখল করেছ?
সুলেমান এইবার প্রথম কথা বলল, আমি দখল করতে চাই নাই, আল্লাহর কসম। দুলাভাই কইল-
দুলাভাইটা কে? লতিফ চেয়ারম্যান?
জে। দুলাভাই কইল, বলাইয়ের এত সুন্দর স্টলটা মানুষ লুটেপুটে নেবে, তার থেকে চায়ের স্টলটা তুমি চালাও।
ও। মাসুদ ভাই সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলল, চায়ের স্টল চলে? নাকি মিলিটারিদের ফ্রি চা খাওয়াও?
সুলেমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মাসুদ ভাই স্টলের ভেতরে তাকাল, তখন ফ্রেম করে রাখা ইয়াহিয়া খানের ছবিটা তাঁর চোখে পড়ল। মাসুদ ভাই বলল, ইয়াহিয়া খানের ছবিটা কে লাগিয়েছে? তুমি?
সুলেমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মাসুদ ভাই বলল, এই মানুষটা দেশের কত মানুষকে মেরেছে তুমি জানো?।
