মতি রাজাকার মাথা নাড়ল, বলল, মনে থাকবে।
আর তোমাকে আরো একটা কাজ করে দিতে হবে।
কী কাজ?
তোমার বাবা যে মিলিটারিরা আছে তাদেরকে বলবা আমরা আসতেছি। যদি তারা বাপের বেটা হয় তাহলে যেন আমাদের সাথে যুদ্ধ করে। গ্রামের নিরীহ মানুষজনকে ধরে লাইন করে গুলি করার মাঝে কোনো বীরত্ব নাই। বুঝেছ?
মতি রাজাকার মাথা নাড়ল। মাসুদ ভাই বলল, তোমাদের একজন নূতন মেজর আসছে না? কী যেন নাম ইয়াকুব না বিয়াকুব?
মেজর ইয়াকুব।
তারে আমার নাম বলবা। আমার নাম জানো?
মতি রাজাকার মাথা নাড়ল, জানি।
না জানলে চ্যাংড়া মাস্টারও বলতে পারো, কোনো সমস্যা নাই। তোমার মেজরকে বলবা আমি আমার বিচ্ছুদেরকে নিয়া আসতেছি। সে যেন প্রস্তুত থাকে। বলবা তো?
মতি রাজাকার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মাসুদ ভাই দাঁড়াল, দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল, বাইরে আবছা অন্ধকার, তার মাঝে এখনো মুক্তিযোদ্ধার দল হেঁটে যাচ্ছে। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম, তখন হঠাৎ একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল, আমার মনে হলো এই মুক্তিযোদ্ধাটাকে একটু আগে আমি হেঁটে যেতে দেখেছি। এখন আবার যাচ্ছে, কী আশ্চর্য! একজন মানুষ দুইবার যায় কেমন করে?
মাসুদ ভাই মতি রাজাকারকে বলল, তুমি যাও। বিদায় হও। যাওয়ার আগে তোমার লুটের মাল নিয়ে দাও। মতি রাজাকার তার পোঁটলাটার ভেতরে লুট করা জিনিসগুলো ভরে মাথা নিচু করে বের হয়ে গেল। প্রথমে আস্তে আস্তে হাঁটল, তারপর দৌড়াতে লাগল।
আমরা যারা মাসুদ ভাইকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলাম তাদের দিকে তাকিয়ে মাসুদ ভাই বলল, আপনারা এখন বাড়ি যান। কেউ আমার সাথে কথা বলবেন না। কথা বললেই সেটা মিলিটারির কানে পৌঁছাবে, আপনাদের বিপদ হবে। আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না। আগে ভাবতাম দেশ স্বাধীন করতে নয়-দশ বছর যুদ্ধ করতে হবে, এখন আমি জানি ছয় মাসের মাঝে দেশ স্বাধীন হবে। ইনশা আল্লাহ।
তারপর মাসুদ ভাই তার দুইজন বডিগার্ড নিয়ে অন্যদের সাথে হাঁটতে শুরু করল, আমিও তার পিছু নিলাম। কালী গাংয়ের তীর ঘেঁষে বেশ খানিকটা যাবার পর আমি বললাম, মাসুদ ভাই।
কী ব্যাপার রঞ্জু?
আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
এখন আশপাশে কেউ নাই, জিজ্ঞেস করতে পারো।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দুইবার হেঁটে যেতে দেখলাম-
মাসুদ ভাই হা হা করে হেসে উঠল, সাথে সাথে অন্যরাও হাসতে শুরু করল। হাঁটা থামিয়ে তারা দাঁড়িয়ে গেল এবং দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাসেন কেন মাসুদ ভাই?
মাসুদ ভাই আমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, রঞ্জু, তোমার বুদ্ধি আছে! আর কেউ বুঝতে পারে নাই, খালি তুমি বুঝতে পেরেছ।
কী বুঝতে পেরেছি?
আজকে আমরা এসেছি সবাইকে ধোকা দিতে।
ধোঁকা দিতে?
হ্যাঁ। আমরা দেখলাম মিলিটারি রাজাকার মিলে খুব বেশি উৎপাত শুরু করেছে তাই আজকে তাদের একটু ভয় দেখালাম।
ভয় দেখালেন?
হ্যাঁ। আমরা জঙ্গলের ভিতরে ক্যাম্প করেছি। সেখানে আমাদের প্রায় চল্লিশজনের মতো মুক্তিযোদ্ধা আছে, তারাই এখানে পাক খাচ্ছে। জঙ্গল থেকে বের হয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে হেঁটে অন্য মাথায় ঢুকে যায়। তারপর জঙ্গল দিয়ে আগের জায়গায় এসে আবার রওনা দেয়! এই ভাবে চল্লিশজন এক ঘন্টা থেকে পাক খাচ্ছে–সবাই ভাবছে শত শত মুক্তিযোদ্ধা! খালি তুমি ধরতে পেরেছ। অন্ধকারের মাঝে তুমি দেখলে কেমন করে?
তাহলে আসলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা নাই?
আছে আছে। সবাই ট্রেনিং নিচ্ছে, বর্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল। বর্ষা শুরু হয়েছে। এখন এক লাখের বেশি মুক্তিযোদ্ধা নামবে। তারা আসছে। অস্ত্র নিয়ে আসছে।
অস্ত্র তো আছে আপনাদের! কত অস্ত্র!
মাসুদ ভাই আবার হা হা করে হাসল, হেসে বলল, আর এক মাসের মাঝে আরো অস্ত্র এসে যাবে। কিন্তু এক মাস অপেক্ষা করলে এই এলাকার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। মিলিটারি যেন ক্যাম্প থেকে বের না হয় সে জন্য এখনই একটা মহড়া দিলাম। এইগুলো আসল অস্ত্র না। বাঁশ দিয়ে কাঠ দিয়ে বানিয়ে আলকাতরা দিয়ে রং করে দিয়েছি।
একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে একটা ভারী অস্ত্র হাতে নিতে দিল, হাতে নিয়ে টের পেলাম অস্ত্রটা একেবারেই ভারী না, বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি, ওপরে আলকাতরা। আবছা অন্ধকারে সত্যি না মিথ্যা বোঝার উপায় নাই।
আমার একটু মন খারাপ হলো, আমি ভেবেছিলাম শত শত মুক্তিযোদ্ধা অনেক রকম অস্ত্র। আসলে মাত্র চল্লিশজন মুক্তিযোদ্ধা, অল্প কয়টা অস্ত্র। কিন্তু আমি মন খারাপটা প্রকাশ করলাম না। মাসুদ ভাই বলল, যাও, বাড়ি যাও। আর তোমাকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না যে, তুমি কাউকে বলবে না আজকে কেমন একটা ধোকা দিলাম।
না, বলব না। কিন্তু
কিন্তু কী?
আমাকে আপনাদের সাথে নেবেন?
তুমি তো আমাদের সাথেই আছ। তুমি আমাদের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা তা না হলে আমাদের এত বড় একটা গোপন কথা তোমাকে কেমন করে বললাম।
আমি আসল মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই। বিশ্বাস করেন, আমি পারব।
আমি জানি, তুমি পারবে।
আগে বলেছিলেন নয়-দশ বছর লাগবে, আমি ভেবেছিলাম তত দিনে বড় হয়ে যাব। এখন বলছেন মাত্র ছয় মাস
রঞ্জু, যদি সত্যি সত্যি ছয় মাসে দেশ স্বাধীন হয়ে যায় তাহলেও তুমি সুযোগ পাবে। তুমি তোমার চোখের সামনে দেখবে। তুমি ইতিহাসের অংশ হবে।
