বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই আমি একটা উত্তেজনা টের পেলাম। বাড়ির সবাই এই বৃষ্টির মাঝে ছাতা মাথায় দিয়ে ছোটাছুটি করছে। আমাদের দেখে ডোরার বড় বোন নোরা বুবু ছুটে এল, খোকন। সেজে থাকা ডোরাকে দেখেও দেখল না, আমাকে জিজ্ঞেস করল, রঞ্জু, তুমি কি জানো ডোরা কোথায় গেছে? দুপুর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
আমি কিছু বলার আগেই নোরা বুবু ডোরার দিকে তাকাল এবং সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল, এই তো ডোরা! তোর এ কী অবস্থা?
নোরা বুবুর চিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে আসে, ডোরা চুল কেটে শার্ট প্যান্ট পরে ছেলে সেজেছে, তারপর বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে, কারো মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। ডোরার আম্মু অনেকক্ষণ ডোরার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তোর কী হয়েছে ডোরা? তুই আমারে আর কত কষ্ট দিবি?
নোরা বলল, তুই এত সুন্দর চুলগুলো কেমন করে কাটলি ডোরা? শার্ট-প্যান্ট পরে ছেলে সেজেছিস কেন?
ডোরা বলল, আমি এখন থেকে আর ডোরা না। আমি হচ্ছি খোকন। আমি আর মেয়ে না, আমি ছেলে।
সবাই হাঁ করে ডোরার দিকে তাকিয়ে রইল।
ডোরাকে দেখে বাড়িতে যে রকম হইচই চিৎকার হবে বলে ভেবেছিলাম তার কিছুই হলো না। তাকে সবাই যেভাবে বকাবকি করবে ভেবেছিলাম, তাও করল না তার কারণ বাড়িতে খুঁজে না পেয়ে সবাই এত চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল যে এখন তাকে পেয়ে সবাই খুশি। ডোরা হিসেবে পেলেও খুশি, খোকন হিসেবে পেলেও খুশি। এই গ্রামে মিলিটারির ক্যাম্প, রাজাকাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে তার মাঝে যদি একটা মেয়েকে খুঁজে পাওয়া না যায় তাহলে চিন্তা তো করতেই পারে। সেই মেয়েটা ছেলে হয়ে ফিরে এসেছে, না মেয়ে হয়ে ফিরে এসেছে, সেটা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামাচ্ছে না। একটা খুবই জটিল সমস্যার এ রকম একটা সহজ সমাধান হবে, সেটা কে ভেবেছিল?
আমি ডোরাকে বাড়ির মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে এলাম। বৃষ্টিটা একটু কমে এসেছে, আকাশে এখনো কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে আবার হয়তো বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে।
আমি লতিফা বুবুর বাসার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভাবলাম তার একটু খোঁজ নিয়ে যাই। কিন্তু খোঁজ নেয়ার জন্য ভেতরে যেতে হলো না, লতিফা বুবু নিজেই বের হয়ে এল। লতিফা বুবুর মুখটা কেমন জানি থমথম করছে। আমাকে বলল, এই রঞ্জু, শোন। আমি তোকে কয়দিন থেকে খুঁজছি। ভালোই হলো, তোকে পেয়ে গেলাম।
আমি বললাম, কী হয়েছে, লতিফা বুবু।
তুই আমাকে একটা কাজ করে দিতে পারবি?
কী কাজ?
আগে বল করে দিবি। লতিফা বুবুর চোখ কেমন যেন ছলছল করতে থাকে।
আমি বললাম, একশ বার করে দিব লতিফা বুবু। কী কাজ বলো।
বল খোদার কসম।
খোদার কসম।
আমার গা ছুঁয়ে বল খোদার কসম।
লতিফা বুবু তার হাতটা বাড়িয়ে দিল, আমি হাতটা ছুঁয়ে বললাম, খোদার কসম।
লতিফা বুবু তখন তার হাতে মুঠি করে রাখা দলামোচা এক টাকার একটা নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, তুই আমাকে এটা দিয়ে ইঁদুর মারার বিষ কিনে দিবি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ইঁদুর মারার বিষ?
হ্যাঁ।
কেন?
তোর সেটা জানার দরকার নাই। তোকে বলেছি কিনে দিতে, তুই কিনে দিবি।
আমি লতিফা বুবুর দিকে তাকিয়ে বললাম, লতিফাবু—
কী হয়েছে?
তুমি কেন ইঁদুর মারার বিষ কিনতে চাচ্ছ?
লতিফা বুবু আমার দিকে কেমন করে জানি তাকাল, তারপর বলল, আমি খাব।
এ আমি চমকে উঠলাম। আমাদের গ্রাম দেশে মানুষ তিনভাবে আত্মহত্যা করে, হয় গলায় দড়ি দেয়, না হলে ধানক্ষেতে পোকা মারার বিষ খায়, তা না হলে ইঁদুর মারার বিষ খায়। লতিফা বুবু কেন বিষ খেতে চাচ্ছে?
আমি বললাম, কী হয়েছে তোমার লতিফা বুবু?
তোর জানার দরকার নাই। তোকে বলেছি বিষ কিনে দিতে তুই বিষ কিনে দিবি। তুই কসম কেটেছিস।
বড় মানুষও মাঝে মাঝে বোকা হয়ে যায়, লতিফা বুবুও মনে হলো সে রকম। লতিফা বুবু কেমন করে ভাবল আমি কসম খেয়েছি বলে তাকে আত্মহত্যা করার জন্য বিষ কিনে দেব? কিন্তু এখন সেটা নিয়ে আলোচনা করার সময় না তাই আমি সেটা নিয়ে কোনো কথা বললাম না। আমি লতিফা বুবুর হাত ধরে বললাম, তোমার কী হয়েছে লতিফা বুবু? বলবে?
লতিফা বুবুর চোখ দুইটা কেমন যেন জ্বলে উঠল, দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, হারামজাদা মইত্যা রাজাকার আমারে বিয়া করবার চায়।
মামুন এই কথাটা আমাকে অনেক দিন আগেই বলেছে, আমি সেটা জানি কিন্তু এমন ভান করলাম যে আমি এই প্রথম শুনলাম। চোখ কপালে তুলে বললাম, কী বলছ তুমি লতিফা বুবু।
হ্যাঁ। এই হারামজাদার কত বড় সাহস সে আমারে বলে তাকে বিয়া করতে। বলে বিয়া না করলে–
বিয়া না করলে কী?
থাক তোর শোনার দরকার নাই।
বলো।
লতিফা বুবু নাক দিয়ে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মইত্যা রাজাকার আমারে বলে আমি যদি তারে বিয়া না করি তাহলে সে নাকি আমারে ধইরা মিলিটারি ক্যাম্পে দিয়া আসব। কত বড় সাহস হারামজাদার।
আমি কিছু বললাম না, বড়রা এ রকম একটা বিষয় নিয়ে আজকাল কথা বলে আমাদের মতো ছোটদের দেখলেই থেমে যায়। চারপাশের কমবয়সী মেয়েরা আরো দূরের গ্রামে চলে যাচ্ছে, যাদের বিয়ে হয় নাই তারা বিয়ে করে ফেলছে।
লতিফা বুবু বলল, মইত্যা রাজাকার খালি আমারে কয় নাই, বাবারেও কইছে। বাবা অনেক ভয় পাইছে, মনে হয় সত্যি সত্যি আমারে মইত্যা রাজাকারের সাথে বিয়া দিয়া দেব। যদি আসলেই বিয়া দেয়ার চেষ্টা করে তাহলে আমি বিষ খামু। খোদার কসম।
