কাজেই আমি ডোরাকে নিয়ে বের হলাম। গ্রামে মিলিটারি আসার পর ঘর থেকে মানুষজন একটু কম বের হয়, তার পরও কয়েকজনের সাথে দেখা হলো। বেশির ভাগ মানুষই ডোরাকে লক্ষ্য করল না। শুধু একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, এটা কে? আগে গেরামে দেখি নাই।
আমি বললাম, এর নাম খোকন। যে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব মারা গেছেন তার বোনের ছেলে।
ও। বলে মানুষটা ডোরাকে জিজ্ঞেস করল, এই গ্রামে থাকবা কয় দিন?
ডোরা মাথা নাড়ল, বলল, জি। আমাদের স্কুল বন্ধ ক্লাস হয় না, তাই আবু-আম্মু এইখানে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ডোরার গলার স্বরটা শুনেও মানুষটা কিছু সন্দেহ করল না। হেঁটে চলে গেল।
ডোরাকে যে কেউ চিনবে না সেটা একটু পরেই আমরা আরো ভালো করে বুঝতে পারলাম। সড়কে মতি রাজাকারের সাথে দেখা হয়ে গেল। সে তার দুইজন শাগরেদকে দিয়ে জোরে জোরে হেঁটে যাচ্ছিল। প্রথম প্রথম একটা পায়জামার ওপরে খাকি শার্ট পরে থাকত, এখন কোথা থেকে কালো রঙের প্যান্ট জোগাড় করেছে, পায়ে কাপড়ের জুতা। আমাদের দেখে তীক্ষ্ণ চোখে একবার আমাকে আরেকবার ডোরাকে দেখল, তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করল, এইটা কেডা?
আমি বললাম, খোকন।
খোকন কেডা?
ডোরাকে চিনতে পারে নাই, আমি তখন বললাম, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরে মিলিটারি মেরে ফেলেছে মনে আছে?
মতি রাজাকার অস্বস্তির সাথে মাথা নাড়ল, তার প্রিয় পাকিস্তানের মিলিটারি কাউকে মেরে ফেলেছে এ রকম কথা শুনতে তার ভালো লাগে না।
আমি বললাম, ইঞ্জিনিয়ার চাচার ছোট বোনের ছেলে। খোকন।
ও। মতি রাজাকার এইবারে মাথা নাড়ল।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মেয়ে ডোরাকে দেখেছিলেন না?
হ্যাঁ। মতি রাজাকার আবার মাথা নাড়ল।
তার ফুপাতো ভাই।
ও। মতি রাজাকার তখন শার্টের হাতা সরিয়ে ঘড়ি দেখল, আগে তার হাতে ঘড়ি ছিল না, রাজাকার হওয়ার পর কোনো জায়গা থেকে এই ঘড়ি লুট করেছে। মতি রাজাকারের এখনো ঘড়ি দেখা অভ্যাস হয় নাই, কয়টা বাজে বুঝতে একটু সময় লাগল। বলল, সর্বনাশ দেরি হয়ে গেছে।
কই যান?
মিলিটারি ক্যাম্পে।
আমি বললাম, ও।
ক্যাম্পে নূতন একজন মেজর সাহেব আসছেন, নাম হচ্ছে মেজর ইয়াকুব।
আমি কোনো কথা বললাম না। মতি রাজাকার বলল, চেহারাটা একেবারে ফিল্ম স্টারের মতো। দেখলে ট্যারা হয়ে যাবি।
আমি কিছু বললাম না। মতি রাজাকার বলল, অন্য মিলিটারির মতো না, কলিজা যে রকম বড়, দিলটাও সেই রকম বড়। পূর্ব পাকিস্তান বলতে পাগল, চারদিক তাকায় আর বলে, কেয়াবাত কেয়াবাত হাউ বিউটিফুল।
অন্য দুইজন রাজাকার জোরে জোরে মাথা নাড়ল। একজন বলল, একেবারে আসল খান্দানি।
মেজর সাহেবের সাথে আমাগো মিটিং। মেজর সাহেব আমাগো খুবই মায়া করেন।
আমি এবারেও কোনো কথা বললাম না। মতি রাজাকার তখন তার ঘড়ি আরো একবার দেখল তারপর হেঁটে হেঁটে চলে গেল।
আমি তখন বললাম, ডোরা, তুই–।
ডোরা বলল, ডোরা না। খোকন।
ঠিক আছে, খোকন, তুই পরীক্ষায় পাস। তোরে যখন মইত্যা রাজাকার চিনতে পারে নাই, আর কেউ চিনতে পারবে না।
আমি জানি।
আমি তখন ডোরাকে মাহতাব মিয়ার বাড়িতে নিয়ে গেলাম, পুরো বাড়িটা পুড়ে কালো ছাই হয়ে আছে। টিনের একটা চাল একদিকে কাত হয়ে পড়ে আছে। বাড়ির আশপাশে বেশ কয়েকটা বড় বড় গাছ ছিল, আগুনের তাপে গাছগুলো ঝলসে গেছে। গাছগুলোর পাতা ঝরেও গেছে, দেখেই বোঝা যায় গাছগুলো মরে গেছে। মানুষের মতো গাছও মরে যায়।
আমরা যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন কাত হয়ে থাকা টিনের চালের নিচ থেকে একটা শেয়াল বের হয়ে পেছনে জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল। কয়দিন আগেও যেখানে মানুষ থাকত এখন সেখানে শেয়াল থাকে।
ডোরা জিজ্ঞেস করল, মাহতাব মিয়া এখন কোথায়?
জানি না। মনে হয় অন্য কোনো গ্রামে চলে গেছে।
সবাই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে, তাই না?
আমি মাথা নাড়লাম আর ঠিক তখন গুড়গুড় করে মেঘের ডাক শুনলাম। আজকাল দূর থেকে যখন গোলাগুলির শব্দ হয় সেটাকে অনেক সময় মেঘের ডাকের মতো শোনায় কিন্তু এই মেঘের ডাকটি একেবারে আসল মেঘের ডাক। আমি আকাশের দিকে তাকালাম, সত্যি সত্যি আকাশ মেঘে ঢেকে আছে তার মাঝে বিজলি চমকাচ্ছে।
আমি বললাম, বৃষ্টি আসছে। চল বাড়ি যাই তাড়াতাড়ি।
কেন, তাড়াতাড়ি কেন?
বৃষ্টি হলে ভিজে যাবি না?
ডোরা বলল, আমি তো ভিজতেই চাই। বাড়ি গেলেই তো সবাই আমাকে বকাবকি করবে। একটু দেরি করেই যাই। বকাবকি যখন করবেই তখন ভালোমতোই করুক।
খুবই আজব যুক্তি, কিন্তু একটা যুক্তি, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আমি কিছু বললাম না। তাই আমরা গ্রামের সড়ক দিয়ে হেঁটে হেঁটে একেবারে হিন্দুপাড়া গেলাম। এর মাঝে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, প্রথমে টিপ টিপ করে তারপর ঝিরঝির করে সর্বশেষে ঝমঝম করে। আমি আর ডোরা বৃষ্টির পানিতে ভিজে একেবারে চুপচুপে হয়ে গেলাম। শুকনো মাটি বৃষ্টির পানিতে ভিজে নরম হয়ে গেল, গাছের পাতাগুলো ধুয়ে সবুজ হয়ে গেল। চারদিকে কেমন যেন একটা তাজা তাজা ভাব।
আমি লক্ষ করলাম ডোরা একসময় বৃষ্টির পানিতে ভিজে ঠাণ্ডায় তিরতির করে কাঁপছে। আমি বললাম, আয় বাড়ি যাই। তুই শীতে কাঁপছিস।
ডোরা বলল, কিছু হবে না।
তোর অভ্যাস নাই, পরে জ্বর উঠে যাবে।
উঠবে না।
আমি তবু রাজি হলাম না, ডোরাকে নিয়ে তাদের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
