আমি মামুনকে বললাম, আয় কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে দিই।
মামুন সাথে সাথে দাঁড়িয়ে বলল, চল।
আমরা চিৎকার করে ঢিল ছুড়ে কুকুরগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করলাম। কুকুরগুলো নড়ল না বরং দাঁত বের করে আমাদের দিকে তাকিয়ে গর্জন করতে লাগল। জীবনেও আমি কোনো কুকুরকে এ রকম করতে দেখি নাই। নিশ্চয়ই মানুষের লাশ খেয়ে খেয়ে এগুলো এখন আর মানুষকে ভয় পায় না। বরং জীবন্ত মানুষকে দেখলে মনে করে এটা কেন লাশ হয়ে যায় না, তাহলে তো এটাকেও খেতে পারি।
আমি তখন খুঁজে খুঁজে একটা লাঠি নিয়ে এসে কুকুরগুলোকে ধাওয়া করলাম। কুকুরগুলো তখন একটু সরে গেল কিন্তু একেবারে চলে গেল না, কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে দাঁত বের করে গরগর শব্দ করতে লাগল। আমরা লাঠি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে লাশটাকে নদীর দিকে ঠেলে দিলাম। একটু চেষ্টা করতেই লাশটা নদীর স্রোতে গিয়ে পড়ল, তারপর পানিতে ভেসে যেতে শুরু করল। কুকুরগুলো তীরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ঘেউ ঘেউ করে শেষ পর্যন্ত চলে গেল। আমি মামুনের দিকে তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা মামুন, আমি তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।
কী কথা?
তুই কি কোনো দিন ভেবেছিলি আমাদের সামনে কুকুর মানুষের লাশ খাবে আর আমরা সেটা দেখব?
না।
তুই কি ভেবেছিলি আমরা একটা মেয়ের লাশ লাঠি দিয়ে পানিতে ঠেলে দেব?
না।
তুই কি ভেবেছিলি আমাদের কাছে মনে হবে এটা খুবই সাধারণ একটা ঘটনা?
না।
.
রাত্রিবেলা যখন আমি ভাত খেতে বসেছি একবার রঙিন শাড়ি পরা মেয়েটির কথা মনে পড়ল। কে জানে সে কি নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে নাকি আবার কোথাও আটকা পড়েছে আর হিংস্র কুকুর তার লাশ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে?
নানি আমার থালায় ভাত তুলে দিতে দিতে বলল, কী ভাবিস?
আমি বললাম, কিছু না নানি। আমি নানিকে সব কথা বলি কিন্তু আজকে এই মেয়েটার কথা বলতে ইচ্ছে করল না।
.
১৬.
ডোরা আমার হাতে একটা কাঁচি দিয়ে বলল, নে।
আগে সে আমাকে তুমি তুমি করে বলত, আজকাল তুই করে বলতে শুরু করেছে। একজন তুই বললে আরেকজনকেও তুই বলতে হয়, তাই আমিও ডোরাকে তুই করে বলি। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও আজকাল অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি কাঁচিটা নিয়ে বললাম, কেন?
তুই আমার চুল কেটে দিবি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী কেটে দেব?
চুল। চ-উকারে চু আর ল, চুল।
আমি কোনো দিন কারো চুল কাটি নাই। আর মেয়েদের চুল তো কাটতে হয় না, মেয়েদের চুল বড় রাখতে হয়।
আমি মেয়েদের মতো চুল কাটতে বলি নাই। ছেলেদের মতো চুল কাটতে বলছি।
আমি হাঁ হয়ে বললাম, কার মতো?
ছেলেদের মতো। ছ একারে ছে আর ল একারে লে, ছেলে।
তুই তোর চুল ছেলেদের মতো করে কাটবি?
হ্যাঁ।
কেন?
সেটা তুই একটু পরেই দেখবি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম তোর আম্মু আর নোরা বুবু জানে?
ডোরা বলল, সবকিছু সবার জানার দরকার নাই।
তার মানে জানে না। তুই তাদেরকে না বলে ছেলেদের মতো করে চুল কাটছিস?
ডোরা বলল, তুই কি মনে করিস আম্মু আর আপুকে বললে তারা আমাকে ছেলেদের মতো করে চুল কাটতে দেবে?
তাহলে?
ডোরা বলল, তাহলে কী?
তোর চুল কেটে দিলে তোর আম্মু আর নোরা বুবু আমার ওপর রাগ হবে না?
তার মানে তোর এতটুকু সাহস নাই। এ রকম মুরগির বাচ্চার মতো সাহস নিয়ে তুই মুক্তিযোদ্ধা হবি? বলে আমার হাত থেকে কেড়ে কাঁচিটা নিয়ে ডোরা ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে নিজের মাথার চুল কাটতে থাকে।
আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম, করছিস কী? করছিস কী?
ঠিকই করছি বলে সে আবার ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে চুল কাটতে থাকে। দেখতে দেখতে ডোরার মাথার চুলগুলো খোঁচা খোঁচা হয়ে কাটা পড়তে থাকে।
আমি তখন ডোরার হাত থেকে কাঁচিটা কেড়ে নিয়ে বললাম, ঠিক আছে, ঠিক আছে, দে আমাকে দে। আমি কেটে দিই।
আমি কেটে না দিলে সে নিজেই কেটে ফেলবে, তখন তার ভয়ংকর একটা চেহারা হবে, তাই আমার কাটাই ভালো। আমি তখন ডোরার চুল কাটতে লাগলাম। আমি যে ডোরার থেকে খুব ভালো করে কাটলাম, তা নয় কিন্তু তার পরও মোটামুটিভাবে ছেলেদের মতো চুল কাটা হলো।
ডোরা নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে খুশি খুশি গলায় বলল, ঠিক আছে। এখন তুই বাইরে যা।
কোথায় যাব?
বাইরে। ঘরের বাইরে।
আমরা বাংলাঘরে বসে চুল কাটাকাটি করছিলাম। আমাকে ঘর থেকে বাইরে যেতে বলছে কেন জানি না। কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো কথা না বলে আমি ঘর থেকে বের হলাম। ডোরা দরজাটা বন্ধ করে দিল তারপর কয়েক মিনিট পর দরজা খুলে বের হয়ে এল। একটু আগে যে ফ্রকটা পরছিল সেটা খুলে শার্ট আর হাফ প্যান্ট পরেছে, দেখে সত্যি সত্যি তাকে একটা ছেলের মতো লাগছে। আমি অবাক হয়ে ডোরার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ডোরা বলল, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি হচ্ছি খোকন। ডোরা হচ্ছে আমার মামাতো বোন। আমি হচ্ছি ডোরার ফুপাতো ভাই। ডোরার দাদা-দাদি হচ্ছে আমার নানা-নানি। বুঝেছিস?
আমি আসলে কিছু বুঝি নাই। কিন্তু মাথা নাড়লাম, বললাম, ঝুঝেছি।
তাহলে চল।
কোথায়?
গ্রাম থেকে ঘুরে আসি দেখি গ্রামের লোকজন খোনকে চিনতে পারে নাকি। বলে সে খালি পায়ে ঘর থেকে বের হলো। আমিও তার পিছু পিছু বের হলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই শার্ট-প্যান্ট কোথায় পেয়েছিস?
জোগাড় করেছি।
তোর আম্মু আর আপু দেখলে কী বলবে? তোর দাদা-দাদি?
সেটা নিয়ে তোর দুশ্চিন্তা করতে হবে না। আয়।
