আমরা কয়েকজন মতির পেছনে পেছনে হাঁটলাম, মতি গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে সড়ক ধরে হাঁটছিল। ফজলু চাচাকে বলল, চাচাজি, দোয়া করবেন আমার জন্য।
ফজলু চাচা জিজ্ঞেস করলেন, কিসের জন্য দোয়া চাও?
বুঝতেই পারছেন চাচাজি, দেশকে রক্ষা করার জন্য অস্ত্র হাতে নিছি, যুদ্ধ যদি করতে হয় আপনাদের দোয়া লাগবে।
তুমি বন্দুক দিয়া গুল্লি করতে পারো?
মতি বলল, এইটারে বন্দুক বলে না। এইটা হচ্ছে রাইফেল।
গুল্লি করবার পারো?
কী যে বলেন চাচাজি। পুরা এক সপ্তাহ ট্রেনিং দিচ্ছে একেবারে খাঁটি পাঞ্জাবি মিলিটারি ট্রেনিং। গুলি করা তো সোজা দরকার হলে এই রাইফেল পুরাটা খুলে আবার জোড়া দিতে পারমু।
মতি যখন কথা বলছিল তখন তার সাথে অন্য যে তিনজন ছিল তারা জোরে জোরে মাথা নাড়ল। ফজলু চাচা বললেন, একটা গুল্লি কর দেখি।
মতি বলল, গুল্লি করমু?
হ্যাঁ। আকাশের দিকে গুল্লি কর, দেখি কেমন লাগে শুনতে?
মতি বলল, আমাদের গুল্লি হিসাব কইরা দিছে চাচাজি। কারণ ছাড়া গুল্লি করা নিষেধ। সব গুল্লির হিসাব দিতে হয়। বুঝতেই পারেন মিলিটারি নিয়ম। তয় যদি দুষ্কৃতিকারী দেখি, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। তখন গুল্লি করার নিয়ম আছে?
দুষ্কৃতিকারীটা কারা?
ওই তো মুক্তিবাহিনী। ইন্ডিয়ার দালাল।
ফজলু চাচা মাথা নাড়ল, বলল, ও।
ওদের সাথে যুদ্ধ করার সময় গুল্লি করা ঠিক আছে।
তোমরা যুদ্ধ করবা?
মতি তার সিনা টান করে বলল, জি চাচাজি।
ও।
আমরা প্রায় মিলিটারি চাচাজি। আমাগো নাম রাজাকার বাহিনী।
ও। ফজলু চাচা আর কথা বাড়াল না।
.
কয়েক দিনের ভেতরেই ফালতু মতির নাম হয়ে গেল প্রথমে মতি রাজাকার, সেখান থেকে ধীরে ধীরে হলো মইত্যা রাজাকার। আমরা যারা তাকে আগে মতি ভাই ডাকতাম, এখন সামনাসামনি তাকে মতি রাজাকার আর আড়ালে মইত্যা রাজাকার ডাকি। মতি রাজাকার কিংবা মইত্যা রাজাকারের কাজ একটাই মিলিটারির পেছনে পেছনে থাকা। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি মিলিটারি এই দেশের কিছু চেনে না, রাজাকার বাহিনী তাদেরকে সবকিছু চিনিয়ে দেয়। আশপাশে যত গ্রামে যত হিন্দুবাড়ি আছে তার সবগুলোতে নিয়ে গেল, সেগুলো লুট করিয়ে দিল। কয়েকটাতে আগুন দিল। শুধু হিন্দু বাড়ি না, যারা আওয়ামী লীগ করে তাদের বাড়িতেও আগুন দিয়ে দিল। প্রত্যেক দিনই আমরা দেখতাম দূরে কোনো গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমাদের গ্রামে মাহতাব মিয়ার বাড়িতে যেদিন আগুন দিল, সেটা ছিল ভয়ংকর একটা দিন।
মাহতাব মিয়া খুবই সাদাসিধা মানুষ, বঙ্গবন্ধুর খুব ভক্ত তাই বঙ্গবন্ধুর বড় একটা ছবি নিজের বাংলাঘরে বাধিয়ে রেখেছিল। সেটাই হয়েছে তার অপরাধ। মতি রাজাকার মিলিটারিদের বোঝাল মাহতাব মিয়া আওয়ামী লীগ, তাই একদিন মিলিটারি নিয়ে তার বাড়ি ঘেরাও করল। মাহতাব মিয়া আগেই খবর পেয়েছিল তাই বউ-বাচ্চা সবাইকে নিয়ে সরে গিয়েছিল। প্রথমে তার ঘর লুট করল, বঙ্গবন্ধুর ছবিটা উঠানে রেখে মতি রাজাকার পা দিয়ে মাড়িয়ে সেটা নষ্ট করল। মিলিটারিদের মনে হয় বঙ্গবন্ধুর ওপর খুবই রাগ। একজন মিলিটারি তার রাইফেল দিয়ে তার ছবির ওপরেই কয়েকটা গুলি করে দিল।
বাড়িতে কেমন করে আগুন দেয় সেটা আমি তখন প্রথমবার দেখলাম। প্রথমে কেরোসিন দিয়ে ঘরের চারদিকে ভিজিয়ে দেয়। তারপর খড়ের স্তূপ ঘরের ভেতরে ফেলে সেটাতেও কেরোসিন ঢেলে দেয়। তারপর বাইরে থেকে একটা খড়ের গোছায় আগুন ধরিয়ে ভেতরে ছুড়ে দেয়। দেখতে দেখতে পুরো ঘরে আগুন ধরে যায়।
আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখলাম কীভাবে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। এত বড় আগুন আমি জন্মেও দেখি নাই। ঠাস ঠাস করে শব্দ হতে থাকে, শো শো করে ঝড়ের মতো বাতাস বইতে থাকে। আগুনের এত তাপ হলো যে আমাদের অনেক দূরে সরে যেতে হলো।
মাহতাব মিয়ার বাড়িতে যখন আগুন দেয়া হয় তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে কিন্তু আগুনের জন্য পুরো এলাকাটা দিনের মতো আলো হয়ে গেল। মিলিটারিগুলো রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আর মতি রাজাকার তার দলবল নিয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ‘হিন্দুস্থান মুর্দাবাদ’ বলে চিৎকার করে লাফাতে লাগল। আগুনের লাল আভার সামনে রাজাকারগুলোর কালো ছায়া দেখে আমার মনে হলো, জাহান্নাম নিশ্চয়ই এ রকম হয়। জাহান্নামের আগুনের সামনে শয়তান নিশ্চয়ই এভাবে লাফাতে থাকে।
মিলিটারিগুলো আস্তে আস্তে আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষজনদের ধরে নিয়ে যেতে শুরু করল। কালী গাংয়ের তীরে দাঁড় করিয়ে তাদের গুলি করে পানিতে ফেলে দিত। আমরা যদি কালী গাংয়ের তীরে বসে থাকি তাহলে মাঝে মাঝেই দেখি একটা-দুইটা লাশ ভেসে যাচ্ছে। অনেক কমবয়সী মেয়েমানুষের লাশও ভেসে যায়। রঙিন শাড়ি পরা একজন মেয়ের লাশ যখন ভেসে যায়, তখন সেটা দেখতে এত অদ্ভুত লাগে যে কাউকে বোঝাতে পারব না।
একদিন আমি আর মামুন কালী গাংয়ের পাড়ে বসে আছি তখন দেখলাম একটা মেয়ের লাশ ভাসতে ভাসতে আমাদের তীরে এসে লাগল। মামুন বলল, মাটি চাচ্ছে। এই লাশটা মাটি চাচ্ছে।
লাশ মাটি চাইলে কী করতে হয় আমরা জানি না। আমরা তো আর লাশটাকে টেনে তুলে কবর দিতে পারব না। ঠিক তখন কোথা থেকে জানি কয়েকটা কুকর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এল, কুকুরগুলো একটা আরেকটার সাথে ঝগড়া করতে করতে লাশটাকে কামড়ে ওপরে তুলে আনতে লাগল। এটা নূতন শুরু হয়েছে, কুকুরগুলো মানুষের লাশ খাওয়া শিখেছে। নদীর পাড়ে এরা ঘোরাঘুরি করে, মানুষের লাশ দেখলে টেনে তীরে এনে খেতে থাকে কী ভয়ংকর একটা দৃশ্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কেউ যদি আমাকে বলত যে কুকুর মানুষের লাশ খেতে থাকবে আর আমরা সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব, আমি সেটা কখনোই বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন সেটা প্রত্যেক দিন চোখের সামনে হচ্ছে।
