আমি দাঁড়িয়ে বললাম, কাকিমা, মিলিটারি গ্রামের মানুষদের দিয়ে আপনাদের বাড়ি লুট করিয়ে নিয়েছে।
মহিলাটি বলল, নিক বাবা। যার যেটা ইচ্ছা নিয়া যাক। আমরা মানুষ কয়টা বাঁইচা থাকলেই হবে। আর কিছু চাই না।
মহিলাটি চলে গেল, ছোট একটা বাচ্চা তাকে ধরে কাঁদছে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শেষ পর্যন্ত কি এই মানুষগুলো বেঁচে থাকতে পারবে?
আমি কি বেঁচে থাকব?
.
১৫.
সেই ইলেকশনের সময় আমাদের গ্রামে এক-দুইটা মিটিং হয়েছিল, তারপর আর কোনো মিটিং হয় নাই। কয়েক দিন থেকে শুনতে পাচ্ছি আমাদের গ্রামে একটা মিটিং হবে। মিটিংয়ের কথাটা বলে বেড়াচ্ছে ফালতু মতি। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম তখন শুনেছি মতি যাকেই পাচ্ছে, তাকেই মিটিংয়ের কথা বলছে। হয়তো লোকমান গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছে তাকে বলল, এই যে লোকমান ভাই, পরশু দিন বিকালে কিন্তু মিটিং। মনে আছে তো?
লোকমান কিছুই জানে না চোখ কপালে তুলে বলে, মিটিং? কিসের মিটিং।
খবর রাখেন না কিছু? হিন্দুস্তান দেশটারে দখল করে নিতে চাচ্ছে আমাদের একটা দায়িত্ব আছে না? শহর থেকে বড় নেতা আসবে। আসবেন কিন্তু।
লোকমান মাথা নাড়ে। একটু পরে মতি ফজলু চাচাকে বলে, চাচা, শরীরটা ভালো?
ফজলু চাচা সন্দেহের চোখে মতির দিকে তাকায়। মতি বলে, পরশু বিকাল বেলা জুমা ঘরের সামনে আসবেন।
কী হবে? শিন্নি?
মতি মাথা নাড়ে, না না, শিন্নি না। মিটিং।
কিসের মিটিং?
শহর থেকে বড় নেতা আসবে। তার মিটিং।
ফজলু চাচা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। আজকাল কেউ মতির সাথে বেশি সময় কথা বলে না!
দুই দিন পর বিকেলবেলা আমি মিটিংটা দেখতে গেলাম। মানুষ খুব বেশি নাই, আমার মতো পোলাপানই বেশি। কী নিয়ে মিটিং, সেটা দেখতে এসেছে। জুমা ঘরের কাছে একটা টেবিল আর তার পেছনে দুইটা চেয়ার। একটা চেয়ারে শার্ট-প্যান্ট পরা একজন কমবয়সী মানুষ। আরেকটা চেয়ার খালি সেখানে কে বসবে বুঝতে পারলাম না। মতি ব্যস্তভাবে এদিক-সেদিক হাঁটছে, লোকজনকে ডেকে আনছে, সড়ক ধরে যারা বাড়িঘরে যাচ্ছিল তাদেরকেও জোর করে ধরে আনল। চেয়ারে যে কমবয়সী মানুষটা বসেছিল এক সময়ে সে অধৈর্য হয়ে বলল, মতি, মিটিং শুরু করে দেও।
আমি খুবই অবাক হলাম মতির মতো একজন ফালতু মানুষ একটা মিটিং শুরু করবে? কিন্তু দেখা গেল আসলেই ঘটনা সে রকম, মতি টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল। ভাইসব- তারপর থেমে গেল, গলা পরিষ্কার করে আবার বলল, ভাইসব–তারপর আবার থেমে গেল। মনে হচ্ছে কী বলবে, ভুলে গেছে। আবার গলা পরিষ্কার করে বলল, এ্যাঁ এ্যাঁ আপনারা জানেন এ্যাঁ এ্যাঁ আমাদের প্রিয় দেশ এ্যাঁ এ্যাঁ পাকিস্তান আজ এ্যাঁ এ্যাঁ– মতি এবারে পুরোপুরি থেমে গেল। তার মুখের রং লাল-নীল হতে লাগল, বোঝাই যাচ্ছে তার মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বের হবে না।
তখন চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা দাঁড়িয়ে মতিকে বসে যেতে বলল আর মতি সাথে সাথে ঝপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। মানুষটা তখন দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে থাকে, তার অবস্থা মোটেও মতির মতো না, সে খুবই ভালো বক্তৃতা দিতে পারে। সে শুরু করল এইভাবে, আপনারা জানেন, আমাদের প্রিয় ওয়াতান পাকিস্তান, পৃথিবীর অন্যতম মুসলিম রাষ্ট্রকে হিন্দুস্থান ভেঙে ফেলতে চাচ্ছে, তারা দুষ্কৃতিকারী পাঠাচ্ছে কিন্তু আমরা তাদের বিষদাঁত ভেঙে দেব। আমাদের নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম টিক্কা খানের সাথে দেখা করে তাকে বলেছেন আমরা তাদের পাশে আছি। আমি ইসলামী ছাত্রসংঘের একজন নগণ্য কর্মী আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য সারা দেশে আপনাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। আপনারা জেহাদের জন্য প্রস্তুত হন।
মানুষটা অনেকক্ষণ কথা বলল, শেষের দিকে বলল, আমরা পাকিস্তান মিলিটারিকে বলেছি, আমরা শুধু মুখের কথা বলতে চাই না, আমরা আপনাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে চাই। আমাদের অস্ত্র দিন। আপনারা শুনে খুশি হবেন পাকিস্তান আর্মি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে নিয়ে একটা সামরিক বাহিনী তৈরি করতে যাচ্ছে। তার নাম হচ্ছে রাজাকার বাহিনী।
মানুষটা রাজাকার বাহিনী কথাটা অনেক জোরে উচ্চারণ করল, সে আশা করছিল সবাই সেটা শুনে আনন্দে হাততালি দেবে কিন্তু কেউ হাততালি দিল, শুধু মতি জোরে জোরে হাততালি দিল এবং তার দেখাদেখি আর দুই-একজন একটু হাততালি দেয়ার চেষ্টা করল।
মানুষটা অবশ্যি নিরুৎসাহিত হলো না, বলল, আপনাদের গ্রামে আমরা রাজাকার বাহিনী তৈরি করব। জওয়ান মানুষেরা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। আপনাদের অস্ত্র দেবে, ট্রেনিং দেবে, পোশাক দেবে মাসে মাসে বেতন দেবে। আপনারা দেশের খেদমত করবেন সাথে সাথে বেতন পাবেন। এই দেশে হিন্দুস্থানের কোনো দুষ্কৃতিকারীর জায়গা নাই। আপনারা পাকিস্তান রক্ষার জেহাদে, ইসলাম রক্ষার জেহাদে শরিক হন!
মতি চেয়ারে বসে বসে জোরে জোরে হাততালি দিতে লাগল।
.
এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে আমরা দেখলাম ফালতু মতি একটা পায়জামার ওপর একটা ঢলঢলে খাকি শার্ট পরে ঘাড়ে একটা রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার পেছনে পেছনে আমাদের গ্রামের আরেক ফালতু মানুষ জালাল তাকে অবশ্য কেউই জালাল বলে ডাকে না, সবাই জালাইল্যা বলে ডাকে। সাথে আরো দুইজন আছে কিন্তু আমরা তাদের চিনি না, তারা পাশের গ্রামের মানুষ। এই তিনজনের মাঝে মতি হচ্ছে কমান্ডার।
