কথাটা শুনে মনু চাচা একেবারে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। আমরা সবাই জানি মনু চাচা এই ষাঁড়টাকে একেবারে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসেন। এই ষাঁড়টাকে বেছে বেছে খাওয়ান, কালী গাংয়ে নিয়ে নিজের হাতে গোসল করান, ষাঁড়ের লড়াইয়ের সময় তার ধারালো। শিংয়ে ফুলের মালা লাগিয়ে নিয়ে যান। সেই ষাঁড়টাকে মিলিটারিরা জবাই করে কেটেকুটে খেয়ে ফেলবে–এটা শুনে তো হাউমাউ করে কাঁদতেই পারেন। মনু চাচার কান্না শুনে মিলিটারিগুলো খুবই বিরক্ত হলো, একজন তার রাইফেলের বাঁট দিয়ে মনু চাচাকে মারতে গেল তখন ভয়ে মনু চাচার কান্না থেমে গেল। বিজাতীয় ভাষায় গালাগাল করতে করতে মিলিটারিগুলো লতিফ চেয়ারম্যানকে কী যেন বলল, লতিফ চেয়ারম্যান মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিয়ে গেল।
একটু পরেই দেখলাম কয়েকজন মানুষ মিলে মনু চাচার বিশাল তেজি ষাঁড়টাকে আমাদের স্কুলে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে, আর মনু চাচা বুক চাপড়াতে চাপড়াতে গরুটার পেছনে পেছনে যাচ্ছেন। দেখে আমার এত কষ্ট লাগল যে সেটা বলার মতো না।
মনু চাচার বাড়ি থেকে বের হয়ে মিলিটারিগুলো লতিফ চেয়ারম্যানকে কিছু একটা জিনিস জিজ্ঞেস করল, আমি শুধু ইন্দু শব্দটা বুঝতে পারলাম। তার মানে এখানে হিন্দু কোথায় আছে, সেটা জানতে চাচ্ছে। লতিফ চেয়ারম্যান হাত নেড়ে হিন্দুপাড়ার দিকে দেখাল, মিলিটারিগুলো তখন তাদের সেখানে নিয়ে যেতে ইঙ্গিত করল।
কী সর্বনাশ! নীলিমারা চলে গেছে কিন্তু এখনো বেশ কয়েকটা হিন্দু পরিবার রয়ে গেছে। মিলিটারিগুলো দেখলে নিশ্চয়ই সবাইকে মেরে ফেলবে। আমি তখন দেরি করলাম না, একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে সামনে চলে গেলাম। যখন সড়কটা একটু বাঁক নিয়েছে আমাকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। একটু সামনে গিয়ে সড়ক থেকে নেমে কারো সবজি ক্ষেতের ভেতর দিয়ে, কারো উঠানের ওপর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি হিন্দুপাড়ার মাঝে হাজির হলাম। একজন থুরথুরে বুড়ি আমাকে দেখে বলল, বাবাধন! দৌড়াও কেন? কী হইছে তোমার?
আমি চিৎকার করে বললাম, মিলিটারি আসতেছে! আপনারা বাড়ি থেকে পালান! তাড়াতাড়ি!
আমার চিৎকার শুনে বাড়ি থেকে আরো অনেকে বের হয়ে এল, আমি আবার চিৎকার করে বললাম, মিলিটারি আসতেছে আপনাদের মারার জন্য। আপনারা এক্ষুনি পালান?
মানুষগুলো সাথে সাথে বুঝে গেল। তারা চিৎকার করে নিজেদের ছেলেমেয়ে, বউ-বাচ্চাদের ডাকতে থাকে। দেখতে দেখতে সবাই ঘর থেকে বের হয়ে আসে। নিশ্চয়ই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে কোথায় পালাবে, সবাই সেই দিকে ছুটতে থাকে। থুরথুরে বুড়িটাকেও একজন পাঁজাকোলা করে নিয়ে বাড়ির পেছনে জঙ্গলের দিকে ছুটতে লাগল।
আমিও তখন সরে গেলাম, মিলিটারি এসে যদি আমাকে দেখে, সমস্যা হতে পারে। মাথামোটা মিলিটারি মনে হয় বুঝবে না কিন্তু লতিফ চেয়ারম্যান সাথে সাথে বুঝে যাবে ঘটনা কী।
মিলিটারিগুলো নিশ্চয়ই গ্রামের বাড়িঘর দেখতে দেখতে ধীরে-সুস্থে এসেছে, তাই তারা যখন এসেছে তখন পুরো হিন্দুপাড়া ধূ ধূ ফাঁকা। মিলিটারিগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে হিন্দুদের খুঁজল, কাউকে না পেয়ে খুবই বিরক্ত হলো। ঘরের ভেতর ঢুকে লাথি দিয়ে জিনিসপত্র ফেলতে লাগল। তারপর বাইরে এসে লতিফ চেয়ারম্যানকে কিছু একটা বলল। লতিফ চেয়ারম্যান তখন এদিক-সেদিক তাকাল। কী হচ্ছে দেখার জন্য কিছু মানুষ আশেপাশে জড়ো হয়েছে, লতিফ চেয়ারম্যান তাদেরকে বলল, এটা হিন্দুদের বাড়ি। হিন্দুর মাল এখন গণিমতের মাল। তোমাদের যার যা ইচ্ছা এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাও।
যারা কৌতূহলী হয়ে এসেছিল তারা কেউ নড়ল না। হিন্দু-মুসলমান সবাই একসঙ্গে এত দিন একই গ্রামে আছে; এখন হঠাৎ করে তাদের মালপত্র বাড়িঘর সবকিছুকে গণিমতের মাল বললেই তো সেটা লুটপাট করে নেয়া যায় না।
লতিফ চেয়ারম্যান আবার বলল, কী হলো? নিচ্ছে না কেন? যাও নেও।
এবারেও কেউ নড়ল না, বরং দুই-একজন চলে যেতে শুরু করল। সেটা দেখে মিলিটারিগুলো হঠাৎ করে খেপে গেল। জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করে হঠাৎ করে যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের দিকে রাইফেল তাক করে হুংকার দিল। যারা দাঁড়িয়েছিল তারা হঠাৎ করে ভয় পেয়ে যায়, একজন-দুইজন তখন ভয়ে ভয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। বেশির ভাগ মানুষই অবশ্যি বাড়ির ভেতর থেকে ছোটখাটো জিনিস নিয়েই পালিয়ে গেল। কয়েকজনকে দেখা গেল খুব উৎসাহ নিয়ে লুট করতে শুরু করেছে। তাদের মাঝে একজন হচ্ছে মন্তাজ মিয়া–মন্তাজ মিয়া এই গ্রামের চোর, রাত-বিরেতে শরীরে তেল মেখে মানুষের বাড়িতে চুরি করতে যায়। প্রকাশ্য দিনের বেলায় মিলিটারির সামনে এইভাবে লুট করার সুযোগ আর কবে পাবে।
আমি কাছাকাছি একটা গাছের তলায় বসে বসে পুরো দৃশ্যটুকু দেখলাম। একসময় লতিফ চেয়ারম্যান মিলিটারিদের নিয়ে চলে গেল। আমি তার পরও হিন্দুপাড়ায় বসে রইলাম। তখন একজন-দুইজন করে মানুষগুলো ভয়ে ভয়ে ফিরে আসতে লাগল। তাদের সবার মুখ রক্তশূন্য। কমবয়সীরা নিঃশব্দে কাঁদছে। একজন মহিলা আমাকে দেখে এগিয়ে এল, কাছে এসে বলল, বাবা, তোমার জন্য আজকে আমরা বেঁচে গেলাম। তুমি নিশ্চয়ই আগের জন্মে আমার বাবা ছিলে। আমায় বাঁচাইতে আসছ। ভগবানের কাছে তোমার জন্য প্রার্থনা করি।
