কী করে?
কিছু করে না। বিছানার ওপর বসে আছে। তুমি যাও দেখি, একটু কথা বলে দেখ মনটা ভালো করতে পারো কি না। এই ডোরার জন্য আমাদের এত চিন্তা হয়।
ডোরাকে যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেখানে একটা জানালা আছে। মাঝে মাঝে জানালায় টোকা দিয়ে আমি ডোরাকে ডেকে আনি, আজকে সরাসরি ঘরের ভেতরে গেলাম, ডোরা বিছানায় পা তুলে হাঁটুর ওপরে মুখটা রেখে বসে আছে, আমাকে দেখে এমনভাবে তাকাল যেন আমাকে আগে কোনো দিন দেখেনি। আমি বললাম, ডোরা, তোমরা শরীর ভালো আছে?
ডোরা কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা নাড়ল। বলাই কাকুর চায়ের দোকান সুলেমান দখল করে নিয়েছে, সেখানে একটা ইয়াহিয়া খানের ছবি টানিয়ে রেখেছে, সেটা বলা মনে হয় ঠিক হবে না। আমাদের স্কুলের সব গাছ কেটে ন্যাড়া করে ফেলেছে, সেটা বলাও ঠিক হবে না। শুনে ডোরার আরো মন খারাপ হয়ে যাবে। তবে এই খবরগুলোই অন্যভাবে দেয়া যায়। আমি চেষ্টা করলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে চরমপত্রে যেভাবে খবর দেয় সেই কায়দায় বললাম, মিলিটারি স্কুলে ক্যাম্প করেছে শুনেছ তো?
ডোরা মাথা নাড়ল। আমি বললাম, এত ক্যাম্প এত মিলিটারি কিন্তু ভয়ে মিলিটারির অবস্থা কেরোসিন!
ডোরা এই প্রথম কথা বলল, কেন? কেরোসিন কেন?
ভয়ে ওদের ঘুম নাই, খাওয়া নাই। কখন মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে। ভয়ে ওরা কী করেছে জানো?
কী করেছে?
স্কুলের সব গাছ কেটে ফেলেছে। বালুর বস্তা দিয়ে বাংকার বানিয়ে সেইখানে চব্বিশ ঘণ্টা মেশিনগান নিয়ে বসে আছে! ভয়ে সবগুলোর ঘুম হারাম।
ডোরা চোখে-মুখে একটু উৎসাহ দিয়ে বলল, সত্যি?
সত্যি না তো মিথ্যা নাকি? বেকুবেরা ভেবেছে কয়টা গাছ কেটে ফেললে আর বালুর বস্তা ফেললেই মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে বাঁচবে? কোনো দিন না! এরা মুক্তিবাহিনীকে চিনে না।
মুক্তিবাহিনী আসবে?
আসবে না মানে? যেকোনো দিন আসবে। আমি মাসুদ ভাইকে খুব ভালো করে চিনি। মাসুদ ভাই আসবেই আসবে।
মুক্তিবাহিনী আসলে আমি আর তুমি ওদের সাথে চলে যেতে পারব না?
আমি চেষ্টা করেছিলাম মাসুদ ভাই আমাকে নেয় নাই, কিন্তু ডোরাকে সেটা আবার বলে লাভ নাই, তাই বললাম, মনে হয় যেতে পারব। একলা আমাকে নিতে চায় নাই। দুইজন বললে মনে হয় না করতে পারবে না।
ডোরা জ্বলজ্বলে চোখে বলল, দরকার হলে আমি চুল কেটে ছেলেদের মতো হয়ে যাব। শার্ট-প্যান্ট পরে থাকব। কেউ বুঝতে পারবে না আমি মেয়ে।
সেটা খুবই বুদ্ধিমানের মতো একটা কাজ হবে–এ রকম ভান করে আমি জোরে জোরে মাথা নাড়ালাম। ডোরা তখন মুক্তিবাহিনীতে গিয়ে কী কী করবে তার অনেক রকম বর্ণনা দিতে লাগল আর আমি মাথা নাড়তে লাগলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই ডোরার মন ভালো হয়ে গেল
আমি ওঠার আগে বললাম, তুমি কি শুনেছ বলাই কাকুর চায়ের স্টলে কী হয়েছে?
কী হয়েছে?
সুলেমান নামে একটা পাকিস্তানি দালাল স্টলটা দখল করেছে, কিন্তু কী হয়েছে জানো?
কী হয়েছে?
এই স্টলে একজনও চা খেতে যায় না। কুত্তা-বিলাই পর্যন্ত যায়।
সত্যি?
সত্যি না তো মিথ্যা নাকি? আমি গিয়েছিলাম আমার হাত-পা ধরে তেল-মালিশ, আমি যেন চা খাই। পয়সা লাগবে না, ফ্রি।
তুমি খেয়েছ?
মাথা খারাপ? আমি ওই দালালের দোকানে চা খাব? কী বলেছি, জানো?
ডোরা চোখ বড় বড় করে বলল, কী বলেছ?
আমি বলেছি আমি আপনার দোকানের চা খাই তো পিশাব খাই!
সত্যি?
সত্যি না তো মিথ্যা নাকি! আসলে সত্যি না, কিন্তু এই কথাটা যে বলতে চেয়েছিলাম, সেটা তো একশ বার সত্যি। আর গল্প করার সময় একটু সত্যি-মিথ্যা মিলিয়ে গল্প করতে হয়। তাছাড়া ডোরার বড় বোন আমাকে পাঠিয়েছে ডোরার মন ভালো করার জন্য, আমাকে তো একটু চেষ্টা করতে হবে। আমার কথা শুনে ডোরা হি হি করে এত জোরে হাসতে শুরু করল যে পাশের ঘর থেকে তার আম্মু পর্যন্ত চলে আসলেন ঘটনাটা কী দেখতে।
.
স্কুলে মিলিটারি ক্যাম্পটা ঠিকভাবে বসিয়ে দুই দিন পর মিলিটারির একটা দল বের হলো গ্রামটা ঘুরে দেখতে। মিলিটারি রাস্তাঘাট চিনে না তাই তাদের রাস্তাঘাট দেখিয়ে নেওয়ার জন্য সাথে থাকল লতিফ চেয়ারম্যান। খবর পেয়ে আমরা দলটার পিছু নিলাম, বেশ পেছনে পেছনে তাদের সাথে হেঁটে হেঁটে দেখতে থাকি মিলিটারি কী করে। খুবই ভয় লাগছিল কিন্তু কী আশ্চর্য ব্যাপার, ভয় পাবার পরও দেখার কৌতূহল হয়।
মিলিটারি যুদ্ধ করে তাই আমার ধারণা ছিল তারা বুঝি গ্রামটা চক্কর দিয়ে দেখবে কীভাবে যুদ্ধ করা যায়। কিন্তু আমি খুবই অবাক হলাম যখন দেখলাম মিলিটারিগুলো মানুষের গোয়ালঘরের মাঝে থেমে গরুগুলো টিপেটুপে দেখতে লাগল। আমাদের দশ গ্রামে যখন ষাঁড়ের লড়াই হয় তখন মনু চাচার ষাঁড়টাকে কেউ হারাতে পারে না। পর পর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, গতবার পেয়েছে চার ব্যান্ডের রেডিও, এর আগেরবার দেয়ালঘড়ি। মিলিটারির দলটা মনু চাচার বাড়ির সামনে বেঁধে রাখা ষাঁড়টাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। সারাক্ষণই তাদের মুখে একটা রাগ রাগ ভাব ছিল কিন্তু মনু চাচার বিশাল ষাঁড়টাকে দেখে তাদের মুখে প্রথমবার হাসি ফুটে উঠল। লতিফ চেয়ারম্যানকে কিছু একটা বলল, লতিফ চেয়ারম্যান হাত কচলে কিছু একটা উত্তর দিল, তখন মিলিটারিগুলো তাকে একটা ধমক দিল।
ধমক খেয়ে লতিফ চেয়ারম্যান মনু চাচাকে বাড়ির ভেতর থেকে ডেকে পাঠাল। মনু চাচা ভয়ে ভয়ে বের হয়ে মিলিটারিগুলোকে একটা সালাম দিল, মিলিটারিগুলো সালামের কোনো উত্তর না দিয়ে হড়বড় করে মনু চাচাকে কী একটা জানি বলল। মনু চাচা কিছুই বুঝতে পারল না, তখন লতিফ চেয়ারম্যান মনু চাচাকে কথাটা বুঝিয়ে দিল। স্কুলে মিলিটারির ক্যাম্পে তাদের খাওয়ার জন্য একটা গরু দরকার এই গরুটা তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। তাই মনু চাচাকে বলেছে গরুটা স্কুলে পৌঁছে। দিতে।
