ডোরা মুখ ঢেকে থরথর করে কাঁপছে, আমি তাকে ধরে রেখেছি। মিলিটারিগুলো একেবারে চোখের আড়াল হয়ে যাবার পরও আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, তারপর ডোেরাকে টেনে দাঁড় করালাম। বললাম, চল।
ডোরা কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, যেতে পারবে?
ডোরা মাথা নাড়ল। তখন আমি তার হাত ধরে ছুটতে লাগলাম। বলাই কাকুর পাশ দিয়ে যখন ছুটে যাচ্ছি তখন একবার চোখের কোনা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, বলাই কাকু নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! কী বিচিত্র সেই দৃষ্টি।
হেই খোদা! তুমি এটা কী করলে? কীভাবে করলে?
.
১৪.
পুরো একদিন বলাই কাকুর লাশটা ধানক্ষেতে পড়ে থাকল। শ্মশানে তার লাশটা পোড়ানোর কেউ সাহস পেল না। কেমন করে পাবে? পাকিস্তানি মিলিটারি এসে আমাদের স্কুলে ক্যাম্প করেছে এক-দুই দিনের জন্য নয়, পাকাপাকিভাবে। তারা যেই মানুষটাকে মেরেছে তার লাশের একটা গতি করবে, কারো সেই সাহস নাই। পরের দিন দেখা গেল রাত্রে শেয়াল লাশের খানিকটা খেয়ে গেছে।
পরের দিন ফালতু মতির বাবা লতিফ চেয়ারম্যান আমাদের স্কুলে গিয়ে মিলিটারির সাথে কথা বলে গ্রামের মানুষদের বলল, লাশটা পুঁতে ফেললে তারা কিছু বলবে না। তখন গ্রামের কিছু মানুষ যারা এত দিন বলাই কাকুর চায়ের স্টলে চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে, রেডিও শুনেছে, তারা এসে লাশের পাশে একটা গর্ত করে লাশটা সেখানে ফেলে মাটিচাপা দিয়ে দিল। এই পৃথিবীতে বলাই কাকুর কোনো চিহ্ন থাকল না। তার চায়ের স্টলটা প্রথম দুই দিন বন্ধ থাকল, পরের দিন দেখা গেল সুলেমান নামের একজন মানুষ, লতিফ চেয়ারম্যানের দূরসম্পর্কে শালা, বলাই কাকুর চায়ের স্টলটা দখল করে নিয়েছে। সেই চায়ের স্টলে জোরে জোরে রেডিও পাকিস্তান বাজতে লাগল, কোথা থেকে ইয়াহিয়া খানের বাঁধাই করা একটা ছবি টানিয়ে দেয়া হলো কিন্তু খরিদ্দার বলতে গেলে কেউ নাই। সুলেমান বলাই কাকুর মতো ভালো চা বানাতে পারে না, সেটা একটা কারণ হতে পারে, ইয়াহিয়া খানের চেহারা খুবই খারাপ, সেই চেহারার মানুষের বাঁধাই করা ছবি দেখতে কারো ভালো লাগে না, সেটা একটা কারণ হতে পারে, রেডিও পাকিস্তানে উর্দু খবর কেউ শুনতে চায় না, সেটাও একটা কারণ হতে পারে। তবে আসল কারণ হচ্ছে, বলাই কাকুর চায়ের স্টলটা আমাদের স্কুলের খুব কাছে। মিলিটারির এত কাছে চা খেতে আসার মতো সাহস কারো নাই।
কাঁকনডুবিতে মিলিটারি আসার পর প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা তারা স্কুল থেকে বের হলো না। কাঁকনডুবি গ্রামের কোনো মানুষও তাদের বাড়ি থেকে বের হলো না। আমি অবশ্যি তার মাঝেও এক ফাঁকে বের হয়ে গেলাম, বলাই কাকুর চায়ের স্টল পর্যন্ত গিয়ে আমি স্টলের সামনে দাঁড়ালাম। বলাই কাকু আর কোনো দিন এই স্টলে আসবে না, সেটা এখনো বিশ্বাস হয় না। স্টলে কোনো খরিদ্দার নাই, সুলেমান একা একা বসে বসে কাঁচের গ্লাসগুলো পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করছে। আমাকে দেখে সুলেমান খুবই খুশি হয়ে গেল, আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে বলল, কী মিয়া চা খাইবা? কুকি বিস্কুট? কুনো কাস্টমার নাই, আস বউনি কইরা যাও।
আমি বললাম, পয়সা নাই।
সুলেমানের মুখটা ধপ করে নিভে গেল। একটু পরে বলল, আস ভেতরে আস। তোমারে এক কাপ ফ্রি চা দিই।
এই লোকের কাছ থেকে আমার চা খাওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই, মনে হলো বলি তোমার চা খাই তো পিশাব খাই কিন্তু সেটা তো বলা যায় না। তাই আমি মাথা নেড়ে বললাম, লাগবে না।
তারপর আমি সড়কটা ধরে সাবধানে স্কুলের দিকে আগাতে লাগলাম। খানিকদূর যাবার পর আমি একধরনের খটখট শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হলো কুড়াল দিয়ে অনেক মানুষ কিছু একটা কাটছে। আমি ভয়ে ভয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলাম, শব্দটা আরো স্পষ্ট হলো। দূর থেকে স্কুলটাকে দেখা যায় কিন্তু এখন সেটাকে খুবই অদ্ভুত দেখাচ্ছে। স্কুলের চারপাশে অনেক গাছ ছিল, সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এই এলাকার সব মানুষকে ধরে এনে মিলিটারি তাদেরকে দিয়ে গাছ কাটাচ্ছে। সব গাছ কেটে ফেলার জন্য আমাদের স্কুলটাকে কেমন যেন ন্যাড়া ন্যাড়া দেখাচ্ছে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম স্কুলের ছাদে বালুর বস্তা দিয়ে ঘেরাও করছে, এর ভেতরে নিশ্চয়ই মিলিটারির পাহারা থাকবে। আমার বেশিক্ষণ থাকার সাহস হলো না, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলাম।
আসার সময় কাজীবাড়িতে একটু ঢুঁ দিয়ে এলাম। সেদিন আমাদের চোখের সামনে যখন বলাই কাকুকে গুলি করে মেরে ফেলল তখন আমি ডোরার জন্য খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল ডোেরারও কিছু একটা হয়ে যায় কি না। কিন্তু ডোরা শেষ পর্যন্ত সামলে নিয়েছে। আমাকে ঢুকতে দেখে বাড়ির বেশ কয়েকজন আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। একজন জিজ্ঞেস করল, মিলিটারির কী খবর?
ঠিক কী কারণ জানি না, সবারই ধারণা আমি এই গ্রামে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার সবকিছু জানি। আমি একটু আগে স্কুলের কাছাকাছি গিয়ে কী দেখে এসেছি, সেইটা অনেক বাড়িয়ে-চাড়িয়ে বললাম। বলাই কাকুর। পরে আর কাউকে মেরেছে কি না জানতে চাইল, আমি বললাম যে এখনো সে রকম কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
আশপাশে ডোরাকে দেখলাম না, তখন আমি ডোরার বড় বোন নোরাকে জিজ্ঞেস করলাম, নোরা বুবু, ডোরা কই?
ঘরের ভেতরে।
