ঠিক জায়গামতো অ্যামবুশ শব্দটা বলতে পেরে আমার খুবই আনন্দ হলো।
আমার কথা শুনে ডোরাও হি হি করে হাসতে থাকে। তারপর সে আরেকটা বুদ্ধি বের করে। রাস্তা কেটে রেখে তার ওপর একটা পাতলা ঢাকনা দিয়ে মিলিটারির জিপ ফেলে দেওয়ার বুদ্ধি। তারপর আমি পোষা কবুতর দিয়ে কীভাবে মিলিটারি ক্যাম্পের ওপর পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায় তার একটা বুদ্ধি বের করলাম। তখন ডোরা পোষা কুকুরকে কীভাবে ঠিক মিলিটারির মাঝখানে একটা গ্রেনেড ফেলে দেওয়ার ট্রেনিং দেবে, সেইটা নিয়ে একটা বুদ্ধি বের করল। এইভাবে আমরা একটার পর একটা বুদ্ধি বের করে সেটা নিয়ে গল্প করতে থাকলাম, কথা বলতে থাকলাম। এভাবে কতদূর হেঁটে এসেছি তার ঠিক নেই। ঠিক তখন প্রথমে একটা গুলির শব্দ, তারপর একটা ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনলাম। মনে হলো খুব কাছে থেকে। আমরা চমকে উঠে ভয় পেয়ে সাথে সাথে সেখানে মাথা নিচু করে বসে পড়লাম। তারপর যে দৃশ্য দেখতে পেলাম তাতে আমাদের শরীর পাথরের মতো জমে গেল। বড় সড়ক দিয়ে লাইন ধরে খাকি পোশাক পরা মিলিটারি আসছে। আগে যে রকম অল্প কয়জন এসেছিল সে রকম না, দেখে মনে হয় শত শত। সবাই তাদের হাতের অস্ত্র উঁচু করে রেখেছে, দরকার হলেই গুলি করবে সে রকম একটা ভঙ্গি। কয়েকজন সড়কের দুই পাশে উবু হয়ে বসে মেশিনগান তাক করে রাখে, অন্যেরা তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। তখন অন্য আরো দুইজন মেশিনগান নিয়ে উবু হয়ে বসে আর অন্যেরা তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। শুধু যে মিলিটারি তা না। মিলিটারির সাথে অনেক গ্রামের মানুষ। তাদের মাথায় গুলির বাক্স, নানা রকম মালপত্র। মিলিটারিগুলো গ্রামের মানুষগুলোকে ধরে এনেছে তাদের মালপত্র টেনে আনার জন্য। আমরা কী করব বুঝতে পারলাম না, দাঁড়ালেই আমাদের দেখা যাবে, আমাদের দেখলে মিলিটারিগুলো কী করবে কে জানে। যদি গুলি করে দেয়? তাই আমি আর ডোরা একটা ঝোঁপের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম, ভয়ে আমাদের বুক ধক ধক করছে।
ডোরা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল এরা কোথায় যায়?
আমি বললাম, জানি না। সাথে অনেক মালপত্র, যেখানেই যাক, মনে হয় সেখানে অনেক দিন থাকবে।
ডোরা বলল, সর্বনাশ! এইখানে থাকবে না তো?
এইখানে কোথায় থাকবে?
আমরা ঝোপের আড়াল থেকে দেখলাম, মিলিটারিগুলো হেঁটে হেঁটে আসছে, আমাদের খুব কাছ দিয়ে হেঁটে গেল। এত কাছ দিয়ে যে আমরা তাদের চেহারাগুলো পর্যন্ত দেখতে পেলাম। কী ভয়ংকর চেহারা, চোখগুলো কোটরের ভেতর, চোয়ালগুলো উঁচু, পাথরের মতো মুখ। কেউ কথা বলছে না, একজনের পেছনে আরেকজন হেঁটে যাচ্ছে। এদেরকে দেখতে মানুষের মতো লাগলেও আসলে এরা সবাই এক-একটা রাক্ষস। এই সব রাক্ষস কোথাও না কোথাও কোনো মানুষকে মেরেছে। কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার!
গ্রামের যে মানুষগুলোকে ধরে এনেছে তাদের মাঝে একেবারে কমবয়সী থেকে বুড়ো মানুষ পর্যন্ত আছে। সবার মাথায় নানা ধরনের মালপত্র, গুলির বোঝ। কতদূর থেকে তারা আসছে কে জানে, দেখেই বোঝা যায় ক্লান্তিতে তাদের দম বেরিয়ে যাচ্ছে। সবাই ধুকে ধুকে যাচ্ছে, পরিশ্রমে তাদের সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
মিলিটারিগুলো সড়ক ধরে আমাদের স্কুলের দিকে হেঁটে গেল। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম, যখন সবাই চলে যাবে তখন বের হয়ে দৌড়ে গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়ব। এতক্ষণে নিশ্চয়ই গ্রামের সবাই খবর পেয়ে গেছে, বাড়িতে নিশ্চয়ই আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। আজকে নানির কাছ থেকে মনে হয় শুধু বকুনি না, একটু মারধরও খেতে হবে।
ঠিক তখন আমরা একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পেলাম। আমরা দেখলাম দুইটা মিলিটারি বলাই কাকুকে ধরে আনছে। বলাই কাকু এমনভাবে হাঁটছে যে মনে হচ্ছে তার চারপাশে কী হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছে না। পেছনে একটা মিলিটারি তার পিঠে রাইফেলটা ধরে রেখেছে। হেঁটে হেঁটে ধানক্ষেতে নামিয়ে আনল, তারপর ঠেলে ঠেলে ঠিক আমাদের দিকে আনতে লাগল। ভয়ে আর আতঙ্কে আমরা তখন পরিষ্কার করে চিন্তাও করতে পারছি না, ডোরা এখনো বুঝতে পারছে না কিন্তু আমি বুঝতে পারছি বলাই কাকুকে গুলি করার জন্য আনছে।
আমি ডোরাকে ফিসফিস করে বললাম, ডোরা চোখ বন্ধ করো।
কেন?
করো বলছি।
ডোরা চোখ বন্ধ করল, আমিও আর তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না কিন্তু তার পরও কীভাবে জানি তাকিয়ে রইলাম। বলাই কাকুকে একটা আলের ওপর দাঁড়া করাল, তারপর মিলিটারি দুইটা কয়েক পা পিছিয়ে গেল। আমি দেখলাম একটা মিলিটারি কোমরে হাত দিয়ে অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যজন রাইফেল তুলল।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, ভয়ংকর দুইটা গুলির শব্দ হলো। ডোরা নিশ্চয় চিৎকার করেছিল কিন্তু গুলির শব্দের জন্য সেটা আলাদাভাবে শোনা গেল না, আমি জাপটে তার মুখ ধরে ফেললাম, ডোরা তখন থরথর করে কাঁপছে। আমি সাবধানে তাকালাম, যেখানে বলাই কাকু দাঁড়িয়েছিল সেখানে নাই, নিচে পড়ে আছে। মিলিটারি দুইটা তখনো দাঁড়িয়ে আছে। একজন পকেট থেকে সিগারেট বের করে আরেকজনকে একটা দিল, দুজনে সিগারেট ধরাল, তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। একজন কী একটা বলল, অন্যজন তখন হাসতে হাসতে তাকে একটা ধাক্কা দিল, নিশ্চয়ই মজার কিছু একটা বলেছে।
