.
১৩.
কাঁকনডুবিতে মিলিটারি আসার ঠিক এক সপ্তাহ পর আমি আর ডোরা গ্রামের শেষে যে ধানক্ষেত আছে, সেখানে বেড়াতে গেছি। ডোরা আসার আগে আমি জানতাম না যে ধানক্ষেত বেড়ানোর জায়গা আর ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটা একটা মজার খেলা। শহরে থাকত বলে গ্রামের খুব সাধারণ জিনিসগুলোই ডোরা দেখেনি। যে জিনিসগুলো আমাদের কাছে যন্ত্রণার মতো ডোরার কাছে সেটাই খুবই উত্তেজনার একটা বিষয়। সময়ে-অসময়ে ডোরা আমাকে নিয়ে কাঁকনডুবি গ্রামের আজব আজব জায়গায় চলে যেত– আমার ধারণা ছিল তার মা, বড় বোন কিংবা অন্যেরা খুবই বিরক্ত হবে, গ্রামের মানুষের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
কিন্তু আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম, যখন দেখলাম তার মা কিংবা বোন বিরক্ত তো হচ্ছেই না, বরং কেমন যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। ডোরার বড় বোন নোরা কারণটা আমাকে একদিন বলেছে, বাবাকে মিলিটারি মেরে ফেলার পর ডোরা নাকি পুরোপুরি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। সে খেত না, ঘুমাত না, চোখ বড় বড় করে বসে থাকত, বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলত। এই কাঁকনডুবিতে এসে ডোরা প্রথম একটু স্বাভাবিক হয়েছে। বড় বোন আর তার মা দুজনেই আমাকে বলেছে ডোরাকে একটু দেখে রাখতে। তাই আমি তাকে দেখে রাখছি। প্রচণ্ড দুপুরের রোদে আমি ডোরাকে নিয়ে ধানক্ষেতের ভেতরে আলের ওপর দিয়ে হাঁটছি। ডোরা তার পায়ের স্যান্ডেলগুলো খুলে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে লাগল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হলো? জুতা খুলছ কেন?
খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস করি।
কেন?
যখন মুক্তিবাহিনী হব তখন খালি পায়ে হাঁটতে হবে না?
ডোরার বেশির ভাগ কথাবার্তা হয় মুক্তিবাহিনী নিয়ে, যখন সে মুক্তিবাহিনী হবে তখন কী করবে তার কথাবার্তায় সে সময়ের নানা রকম বর্ণনা থাকে। এই যে দুপুরের রোদে বের হয়ে এসেছে মনে হয় এইটাও তার মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং।
আমি খানিকক্ষণ তার খালি পায়ে হাঁটা দেখলাম, অভ্যাস নাই বলে তার রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে। তার পরও সে হেঁটে যাচ্ছে। আমি বললাম, তোমার কি ব্যথা লাগছে?
একটু একটু। সমস্যা নাই। তুমি যদি পারো আমি কেন পারব না? তোমার সাথে আমার কী পার্থক্য?
আমি দাঁত বের করে হেসে ফেললাম, আমি জন্মে কোনো দিন জুতা পরি নাই আর তুমি জন্মে কোনো দিন খালি পায়ে হাঁট নাই! এইটা হচ্ছে পার্থক্য।
ডোরা আমার কথার উত্তর না দিয়ে আলের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। আষাঢ় মাস শুরু হয়ে গেছে কিন্তু আকাশে এতটুকু মেঘ নাই। ডোরা জিজ্ঞেস করল, আকাশে কী দেখ?
মেঘ আছে কি না দেখি। নাই, কোনো মেঘ নাই। আষাঢ় মাস শুরু হয়ে গেছে এখনো কোনো মেঘ নাই।
ডোরা বিষয়টা বুঝতে পেরেছে সেই রকম ভঙ্গি করে মাথা নাড়ল। বলল, যখন বর্ষাকাল শুরু হবে তখন পাকিস্তানি মিলিটারিদের বারোটা বেজে যাবে। তাই না?
বর্ষাকালের সাথে পাকিস্তানি মিলিটারির বারোটা বেজে যাওয়ার কী সম্পর্ক আমি বুঝতে পারলাম না, কিন্তু আমি ডোরার কথা নিয়ে কোনো আপত্তি করলাম না। ডোরাকে খুবই আনন্দিত দেখা গেল। চোখ বড় বড় করে বলল, পাকিস্তান তো মরুভূমি, কোনো পানি নাই। নদী নাই। তাই ওই বদমাইশগুলো সাঁতার জানে না। পানিকে খুব ভয় পায়।
আমি আবার মাথা নাড়লাম। ডোরা বলল, যখন বর্ষাকাল শুরু হবে তখন মুক্তিবাহিনীর খুবই সুবিধা হবে। হবে না?
আমি বললাম, হবে।
মুক্তিবাহিনীর সবাই তো সাঁতার জানে। জানে না?
জানে।
মুক্তিবাহিনী নৌকা করে আসবে, এসে যুদ্ধ করবে। আর মিলিটারিরা বসে বসে মার খাবে। খাবে না?
আমি মাথা নাড়লাম, খাবে।
ডোরা বলল, একটা কাজ করলে কেমন হয়?
কী কাজ?
প্রথমে আমি আর তুমি মুক্তিবাহিনী হব। তারপর–
দাঁড়াও দাঁড়াও। দুইজনে কি একটা বাহিনী হয়? বাহিনী বানাতে অনেক মানুষ লাগে।
ডোরা একটু বিরক্ত হলো, বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে। তাহলে আমরা দুইজন মুক্তিযোদ্ধা হব আর আমাদের বাহিনী হবে দুইজন মুক্তিযোদ্ধার একটা বাহিনী। তোমার সমস্যাটা কী?
না না, কোনো সমস্যা নাই।
ঠিক আছে। আমাদের কাছে রাইফেল থাকবে, স্টেনগান থাকবে, গ্রেনেড থাকবে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের খবর শুনতে শুনতে আমরা অনেক কিছু শিখে গেছি। আগে সবকিছুকে বলতাম বন্দুক এখন বলি রাইফেল, স্টেনগান, মেশিনগান। আগে গ্রেনেডের নামও শুনি নাই এখন আমরা গ্রেনেড কী জানি। মর্টার কী জানি। ব্রাশফায়ার মানে কী জানি। অ্যামবুশ মানে কী জানি।
ডোরা বলল, আমরা কী করব জানো?
কী?
আমরা আমাদের রাইফেল নিয়ে কালী গাংয়ের পাড়ে শুয়ে থাকব। আমাদেরকে দেখে যেন চিনতে না পারে সেই জন্য আমরা আমাদের মাথার ওপরে কয়েকটা গাছের ডাল-পাতা–এই গুলি দিয়ে রাখব। দূর থেকে মনে হবে একটা ঝোঁপ।
আমি বললাম, ঠিক আছে।
তারপর যখন মিলিটারি নৌকা করে আমাদের সামনে দিয়ে যাবে তখন কী করব বুঝেছ?
কী করব?
নৌকার মাঝে একটা গুলি। বেশি না, মাত্র একটা গুলি।
তখন কী হবে?
তখন নৌকার মাঝে ফুটা হয়ে যাবে, নৌকার মাঝে পানি ঢুকবে, নৌকা ডুবে যাবে আর সবগুলো মিলিটারি ডুবে মরবে। ওরা সাঁতার জানে না তো তাই কেউ বাঁচবে না। সব শেষ! একটা বুলেট দিয়ে আমরা একশ মিলিটারি মেরে ফেলব।
ডোরার মুখ আনন্দে ঝলমল করতে থাকে। তাকে দেখে মনে হতে থাকে সে আসলেই বুঝি একশ মিলিটারি মেরে ফেলেছে। একটা নৌকাতে আসলেই একশ মিলিটারি উঠবে কি না আর ছোট একটা ফুটো দিয়ে পানি ঢুকতে থাকলে সেটা কোনো কিছু দিয়ে বন্ধ করা যায় কি না কিংবা সেঁচতে থাকা যায় কি না–এ রকম একটা জিনিস নিয়ে তর্ক করা যায় কিন্তু আমি মোটেও তার চেষ্টা করলাম না। আমিও যোগ দিলাম, বললাম, আমরা চুতরা পাতা আর বানরশলা ডিব্বার ভেতরে ভরে রাখব, এরা যখন রাস্তা দিয়ে যাবে তখন এই ডিব্বা ছুড়ে দেব, এদের শরীরে যখন চুতরা পাতা আর বানরশলা লাগবে, তখন সারা শরীর চুলকাতে থাকবে, তখন আমরা অ্যামবুশ করব!
