.
মিলিটারিগুলো দুপুরবেলা আবার সড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে ফিরে গেল। তারা কেন এসেছিল আর কেন ফিরে গেল, আমরা কিছু বুঝতে পারলাম না। মিলিটারিগুলো চলে গেছে সেটা নিশ্চিত হবার পর সবাই বাড়ি থেকে বের হয়েছে। ততক্ষণে সারা গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেছে মাস্টারবাড়ির সাদাসিধে কামলা বগাকে মিলিটারি গুলি করে মেরে ফেলেছে। সাদাসিধে মানুষ, সড়কের ধারে গরুটা বেঁধে রাখতে গিয়েছিল, মিলিটারি দেখে ভয়ে দৌড় দিয়েছে, মিলিটারি সাথে সাথে গুলি করে তাকে মেরে ফেলেছে।
আমরা সবাই বগাকে দেখতে গেলাম, সড়কের পাশে উবু হয়ে পড়ে আছে ময়লা গেঞ্জিটা রক্তে ভিজে কালচে লাল হয়ে আছে। চোখগুলো খোলা, মনে হয় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি কী ভয়ংকর! মনে হয় যেন এক্ষুনি মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকাবে। বগাকে আমরা কতবার গ্রামের সড়ক দিয়ে গরু আনতে-নিতে দেখেছি, কখনো তাকে দেখে আমরা ভয় পাই নাই। কিন্তু এই সড়কের পাশে তাকে মরে পড়ে থাকতে দেখে কেমন জানি ভয় লাগতে লাগল। গ্রামের মানুষ যখন ধরাধরি করে বগার শরীরটা তুলে আনছে তখন আমি বাড়ি চলে এলাম।
রাতে আমি ভালো করে খেতে পারলাম না। সারা রাত ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে চমকে উঠতে লাগলাম।
.
দুই দিন পর বলাই কাকুর স্টলে মতির সাথে দেখা হলো। মতি খুব তৃপ্তি করে চা খেতে খেতে অন্যদের সাথে কথা বলছে, মিলিটারির কী খান্দানি চেহারা। গায়ের রং একেবারে আপেলের মতো।
একজন বলল, আপেল তো দেখি নাই কুনো দিন।
মতি বলল, আপেল হইল গোলাপি রঙের। মিলিটারির যে খালি রংটা গোলাপি সেটা সত্যি না, লম্বায় আপনার-আমার থেকে কমপক্ষে দেড় গুণ। ভারী ভারী অস্ত্রপাতি এমনভাবে ধরে যেন পাটশলা ধরে রাখছে। গায়ে মইষের মতন জোর। মিলিটারির গুনগান করার সময় মতির চেহারা থেকে যেন আলো বের হতে থাকে।
একজন জিজ্ঞেস করল, মিলিটারি দেখে তোমার ভয় করে নাই!
মতি হাসার ভঙ্গি করে বলল, আরে ভয় করবে কেন? এক দেশের মিলিটারি, তারাও মুসলমান আমরাও মুসলমান। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ভাই ভাইরে ভয় পায় নাকি?
আমি অবাক হয়ে মতির দিকে তাকালাম, সেদিন মিলিটারি যে তাকে ন্যাংটা করে দেখেছে তারপর চড় মেরে বিদায় করেছে সেই কথাটা মনে হয় কাউকে বলে নাই। এখন আমি যদি সবাইকে বলে দিই?
একজন জিজ্ঞেস করল, সেই দিন মিলিটারি আসল কী জন্য। আবার গেল কী জন্য? মাঝখান থেকে আমাগো বগার জীবনটা শেষ।
মতি বলল, মিলিটারি কী জন্য আসছে এখনো বুঝেন নাই?
না।
দেশটা যে বাংলাদেশ হয় নাই, এখনো পাকিস্তান আছে সেইটা বুঝছেন?
চায়ের স্টলের মানুষেরা এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। মতি উত্তরের জন্য অপেক্ষাও করল না, বলল, দেশটা যে পাকিস্তান আছে সেইটা সবাইরে বোঝনোর দরকার আছে। সেই জন্য মিলিটারি সারা দেশের চিপায় চিপায় একবার ঘুরান দিয়া আসতেছে।
কিন্তু বগারে মারল কেন? বগা কী দোষ করছে?
বগা দৌড় দিল কেন? দৌড় না দিলে কি গুল্লি করে?
আবার কি আসব মিলিটারি?
আসবে তো বটেই। দেশটারে একটা শৃঙ্খলার মাঝে আনতে হবে। শেখ সাহেব দেশটার কী সর্বনাশ করছে মনে আছে। মতির কথা শুনে কেউ কোনো কথা বলল না।
তোমার লগে কি মিলিটারির কথা হইছে?
বাপজানের সাথে বেশি কথা হইছে। আমার সাথে একটা-দুইটা কথা। ক্যায়সা হায় আছি হায় এই রকম ভদ্রতার কথা।
তোমার বাপজানরে কী বলছে মিলিটারি?
বলছে কোনো ভয় নাই। পুরা দেশ এখন তাগো দখলে। হিন্দুস্থানিদের মতলব হাসিল হয় নাই। বলছে মুক্তিবাহিনীর দেখা পাইলে খবর দিতে। অবশ্যি মুক্তিবাহিনী বলে নাই। বলছে ‘মিসকিরেন্ট’, মিসকিরেন্ট মানে দুষ্কৃতিকারী।
ও।
আমি ধৈর্য ধরে ফালতু মতির কথা শুনলাম। চা শেষ করে চায়ের দাম দিয়ে মতি যখন বের হলো তখন আমিও তার পেছন পেছন বের হলাম। একটু সামনে গিয়ে তাকে ডাকলাম, মতি ভাই।
মতি পেছনে ঘুরে আমাকে দেখে বলল, কে র?
হ্যাঁ।
খবর কী তোর? কাজীবাড়ির মাইয়ার কী খবর?
ভালো। আমি মতির কাছে গিয়ে বললাম, মতি ভাই তোমারে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
কী কথা?
মিলিটারি যে তোমারে ন্যাংটা কইরা–
আমি কথা শেষ করার আগেই মতি খপ করে আমার চুল ধরে ফেলল, বলল, হারামজাদা, তুই যদি মুখ খুলস, আমি তোরে জবাই করে ফেলমু।
আমি অবাক হয়ে মতির দিকে তাকালাম। এত দিন এই মানুষটা ছিল পুরোপুরি অপদার্থ ফালতু একজন মানুয়। হঠাৎ করে মানুষটা অন্য রকম হয়ে গেছে, চোখ দেখলেই ভয় করে।
মতি আমার চুল ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, আমারে তুই চিনস না? আগের দিন আর নাই? এখন নূতন দিন আসতাছে। ক্ষমতা এখন আমাগো হাতে? বুঝছস?
আমি চুলের যন্ত্রণা সহ্য করে বললাম, বুঝছি।
তোর মুখ থেকে যদি একটা কথা বের হয় আমি তোর বাড়িতে আগুন দিমু, মনে থাকবে?
থাকবে।
মতি আমার চুল ছেড়ে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, যা হারামজাদা। মনে থাকে যেন।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, মতি হেঁটে চলে গেল। রাগে-অপমানে আমার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছিল।
.
পরের দিন খবর পেলাম মিলিটারি আমাদের স্কুলে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে কিছু একটা দেখে চলে গেছে। যাওয়ার আগে আমাদের শহীদ মিনারটা ভেঙেচুরে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। বাঁশ দিয়ে তৈরি আমাদের এই শহীদ মিনারের ওপর মিলিটারির এত রাগ কেন?
