এবারে ভয় পেয়ে বেশ কয়েকজন সরে যেতে শুরু করল। লতিফ চেয়ারম্যান এবারে তার ছেলে মতির দিকে তাকিয়ে বলল, মইত্যা? তুই এইখানে কী করস? বাড়ি যা।
মতি বলল, আমি থাকি বাপজান।
না, বাড়ি যা।
তোমার সাথে থাকলে আমারে কিছু করব না বাবা।
মিলিটারির মেজাজ-মর্জির কুনো ঠিক নাই।
তা ছাড়া গফুর ভাই আমারে চিনে–
লতিফ চেয়ারম্যান ঠাণ্ডা চোখে তার ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তাহলে থাক।
মিলিটারির দলটাকে এখন বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যদি কোথাও না থামে তাহলে কিছুক্ষণের মাঝে এখানে হাজির হবে। আমার বুকটা কেমন জানি ধক ধক করতে থাকে। লতিফ চেয়ারম্যান আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই পোলাপান, যা, সবাই বাড়ি যা।
অন্যেরাও আমাদের হাত নেড়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। তখন টুপি মাথায় অল্প কয়জন মানুষ ছাড়া অন্য সবাই সরে যেতে শুরু করল। আমরাও সরে এলাম কিন্তু একেবারে চলে গেলাম না। একটু দূরে গিয়ে একটা কাঁঠালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম।
লতিফ চেয়ারম্যান তখন ঢাউস পাকিস্তানের ফ্ল্যাগটা হাতে নিয়ে ডানে-বামে নাড়তে লাগল, তারপর জোরে জোরে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে চিৎকার করতে লাগল। দেখলাম মতিও চিৎকারে যোগ দিয়েছে।
কিছুক্ষণের মাঝেই মিলিটারির দলটা হাজির হলো। খাকি পোশাক, মাথায় হেলমেট, পায়ে কালো বুট। সবার হাতে ভয়ংকর দেখতে অস্ত্র। বুকের মাঝে গুলির বেল্ট। মিলিটারির দলের সাথে দুই-একজন বাঙালি আছে। একজনের মাথায় টুপি, আরেকজন টুপি ছাড়া তবে গালে চাপ দাড়ি।
মিলিটারির দলটা লতিফ চেয়ারম্যানের দলটার কাছে দাঁড়িয়ে গেল। লতিফ চেয়ারম্যান তখন হাত কচলে কাঁচুমাচু করে মাথা নিচু করে কিছু একটা বলল, এত দূর থেকে কী বলল শুনতে পেলাম না। শুনলেও নিশ্চয়ই বুঝতে পারতাম না, নিশ্চয়ই উর্দুতে কিছু একটা বলেছে।
মিলিটারিটা কিছু একটা জিজ্ঞেস করল, দূর থেকে শুধু ইন্দু শব্দটা শুনতে পেলাম, মিলিটারিরা হিন্দুকে ইন্দু বলে। লতিফ চেয়ারম্যান হাত দিয়ে হিন্দুপাড়ার দিকে দেখাল, তখন মতিও কিছু একটা বলার চেষ্টা। করল, আর হঠাৎ করে একটা মিলিটারি জানি কেমন খেপে উঠে খপ করে মতির চুল ধরে কাছে টেনে নিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, তু ইন্দু?
মিলিটারির গলার স্বর মোটা, আমরা এত দূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম। হঠাৎ করে আরেকটা মিলিটারি তার রাইফেলটা মতির গলায় ধরে কী যেন বলল, আমার মনে হলো এক্ষুনি গুলি করে দেবে আর মতির মাথাটা আলগা হয়ে উড়ে যাবে।
মতি দুই হাত নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে, আমরা আবছা আবছা শুনলাম, মতি বলছে, হাম মুসলমান। হাম সাচ্চা মুসলমান। হাম পাকিস্তানি আল্লাহর কসম লাগতা হয়।
মিলিটারিগুলো মতির কথা বিশ্বাস করল না। তারপর যা একটা কাজ করল, সেটা বলার মতো না। টান দিয়ে ফালতু মতির লুঙিটা খুলে তাকে ন্যাংটা করে ফেলল। আমরা বুঝতে পারলাম তার খতনা হয়েছে কি না দেখছে। মতি মুসলমান তার প্রমাণ পাবার পর তার গালে একটা চড় দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, ভাগো হিয়াসে। বুরবাক।
মতি তখন তার লুঙিটা কোনো মতে কোমরে প্যাঁচিয়ে ছুটতে ছুটতে আমাদের সামনে দিয়ে গ্রামের দিকে চলে গেল। আমরা মাথা নিচু করে বসেছিলাম বলে আমাদের দেখতে পেল না।
মিলিটারিগুলো কিছুক্ষণ অন্যদের সাথে কথা বলে আবার হাঁটতে থাকে, কোথায় যাচ্ছে আমরা জানি না। যেদিকে হাঁটছে সেদিকে আমাদের স্কুল, আমাদের স্কুলে নিশ্চয়ই যাচ্ছে না। আমি আর মামুন ফিসফিস করে কথা বলে ঠিক করলাম আমরা মিলিটারিগুলোর পেছন পেছন গিয়ে দেখব ওরা কোথায় যায়, কী করে। যখন খুব সাবধানে উঠে দাঁড়ালাম হঠাৎ কর্কশ গুলির শব্দে পুরো এলাকাটা কেঁপে উঠল, সাথে সাথে মানুষের আর্তনাদ শুনতে পেলাম। মিলিটারিগুলোও বিজাতীয় ভাষায় কী যেন চিৎকার করতে লাগল।
ভয়ে আমাদের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, মামুন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, সর্বনাশ! এখন কী হবে? কী হবে?
আমি বললাম, আয় আমরা পালাই। মিলিটারি গুলি করে কাকে যেন মেরে ফেলেছে।
আমরা খুব সাবধানে গ্রামের পথ ধরে ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। গ্রামের বাড়িগুলোতে কোনো শব্দ নেই, সবাই নিঃশব্দে ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। মনে হয় গরু-ছাগল, কুকুর-বেড়ালও বুঝতে পারছে এখন খুব বিপদ, তাই সেগুলোও কোনো শব্দ করছে না। আমাদেরকে দেখে একটা বাড়ি থেকে কয়েকজন মানুষ বের হয়ে এল, জিজ্ঞেস করল, কী হইছে? কারে গুলি করছে?
আমরা মাথা নাড়লাম, বললাম, জানি না।
মেরে ফেলছে?
মনে হয়। অনেক জোরে চিৎকার শুনলাম। আমার সারা শরীর কাঁপছে, কথা বলতে গিয়ে আমার গলা ভেঙে গেল। মামুনের গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না, সে ফাঁস ফাস করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে।
বুড়ো মতন একজন মানুষ বলল, তোমাদের যাওয়া ঠিক হয় নাই। বাড়ি যাও। আল্লাহ মেহেরবান।
আমি আর মামুন আবার বাড়ির দিকে ছুটতে লাগলাম। শুধু মনে হচ্ছিল আমাদের পেছন দিয়ে মিলিটারি বুঝি ছুটতে ছুটতে আসছে গুলি করার জন্য।
অন্য যেকোনো সময় হলে নানি আমার ওপর খুব রাগ করত, মনে হয় কানে ধরে পিঠে দুইটা চড়-চাপড় দিত কিন্তু আজকে কিছুই করল না। নানি তার শুকনো আঙুল দিয়ে আমাকে ধরে রাখল, আর ফিসফিস করে বলতে লাগল, খোদা তুমি মেহেরবান। খোদা মেহেরবান।
