আমি ডোরাকে বললাম, চল ডোরা আমরা যাই।
মতি মনে হলো এই প্রথম ডোরাকে দেখতে পেল। সে রকম ভান করে বলল, এই মাইয়া কার মাইয়া? আগে দেখি নাই?
আমি একবার ভাবলাম তার কথার উত্তর না দিয়ে হেঁটে চলে যাই কিন্তু শেষে উত্তর দিলাম, বললাম, কাজীবাড়ির নাতনি।
ও! বুঝছি! তোমার বাপরেই গুল্লি করছে না?
ডোরা কোনো উত্তর না দিয়ে মতির দিকে তাকিয়ে রইল। মতি একটু থতমত খেয়ে জিব দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, ইশ রে! তোমার বাপ এই গ্রামের বড় ইঞ্জিনিয়ার ছিল, এইভাবে মারা গেল, খুবই দুঃখের কথা। দাফন-কাফন নাকি ঠিক করে হয় নাই?
আমি বললাম, মতি ভাই, এখন যাই।
তারপর ডোরাকে রীতিমতো হাত ধরে টেনে নিয়ে এলাম। আমার খালি মনে হচ্ছিল ডোরা হঠাৎ বিড়ালের মতো লাফ দিয়ে মতির মুখে খামচি মেরে দেবে।
যখন আমরা চলে আসছি, তখন মতি পেছন থেকে বলল, তোদের চ্যাংড়া মাস্টার কই গেল? আজকাল দেখি না। সে মালাউনদের সাথে ইন্ডিয়া ভাইগা গেল নাকি?
আমি কিছু বললাম না। মতি বলল, এখন ভাইগা থাকাই নিরাপদ। দিনকাল ভালো না। একটু থেমে বলল, কাঁকনডুবি মনে হয় আর আগের কাঁকনডুবি থাকব না।
মতি এই কথাটা দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছে সেটা এক সপ্তাহের ভেতরে আমরা টের পেলাম।
৩. নানি ঘ্যান ঘ্যান করছে
তৃতীয় পর্ব
১২.
অনেক দিন থেকে নানি ঘ্যান ঘ্যান করছে যে বাদলা শুরু হওয়ার আগে আমি যেন কিছু লাকড়ি কুড়িয়ে আনি। বাড়ির পেছনে বিশাল জংলা জায়গা, সেখানে হাজার রকম গাছ, লতাপাতা। একদিন সেগুলো ঘাটাঘাটি করলেই অনেক শুকনো কাঠ হয়ে যায়। আমি সেখান থেকে টেনে টেনে অনেকগুলো শুকনো গাছ উঠানে এনেছি, এখন কুড়াল দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করলেই নানি তার বাদলা দিন পার করে ফেলতে পারবে।
আমি মাত্র টুকরো করতে শুরু করেছি তখন মামুন ছুটতে ছুটতে হাজির হলো, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মিলিটারি আসতেছে।
আমি চমকে উঠে বললাম, মিলিটারি?
মামুন মাথা নাড়ল। তার মুখ ফ্যাকাসে, চোখে আতঙ্ক। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন কোনখানে আছে?
বড় সড়কে।
কই যাইব?
জানি না, মনে হয় এই দিকেই আসতেছে।
আমি কুড়ালটা রেখে নানিকে বললাম, নানি, আমি গেলাম।
কই গেলি?
মিলিটারি দেখতে। মিলিটারি আসতেছে।
নানি চোখ কপালে তুলে বলল, মিলিটারি আসতেছে আর তুই তাদের দেখতে যাইতাছস? মিলিটারি কি একটা দেখনের জিনিস? খবরদার।
নানি চিৎকার করতে লাগল আর আমি তার মাঝে মামুনকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। গ্রামের সড়কটা ধরে ছুটতে ছুটতে গ্রামের কিনারায় ধানক্ষেতের কাছে দাঁড়ালাম। বহু দূরে বড় সড়কটা গঞ্জের দিকে গিয়েছে। সেই সড়কে আবছা আবছা একটা মিলিটারির দলকে দেখা গেল। তারা এদিকে আসছে। পেছনে কয়েকটা বাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে, সেখানে মনে হয় আগুন দিয়েছে।
আরো অনেকেই ভিড় করে দাঁড়িয়েছে, শুকনো মুখে দূরে তাকিয়ে আছে। একজন জিজ্ঞেস করল, কোন দিকে যায়?
আরেকজন উত্তর দিল, মনে তো হয় এদিকেই আসতেছে।
এদিকে কেন? আমাগো গেরামে কী আছে?
যেখানে আওয়ামী লীগ, যেখানে হিন্দু, যেখানে মুক্তিবাহিনী, সেখানেই মিলিটারি।
আওয়ামী লীগ কি শরীলে লেখা থাকে? ভোটের সময় তো সবাই শেখ সাহেবের নৌকায় ভোট দিল। তাহলে তো পুরা দেশই আওয়ামী লীগ।
আমরা লক্ষ্য করি নাই, কখন জানি ফালতু মতি এসে দাঁড়িয়েছে, সে বলল, বিপদ ডেকে আনলে এই রকমই হয়।
কিসের বিপদ?
আরে এই চ্যাংড়া মাস্টার দুই-চারটা ফুটুসফাটুস করল মনে নাই? চ্যাংড়া মাস্টার এই গেরামে থাকত না?
তারে ধরতে আসতেছে?
কবে কেডা? খবর কী আর যায় নাই?
ঠিক তখন দূরে গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। পরপর বেশ কয়েকটা গুলি হলো। বয়স্ক একজন হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, ইয়া মাবুদ! কারে জানি মারল!
মতি বলল, গেরামটারে রক্ষা করা দরকার।
কেমনে রক্ষা করবা?
দেখি বাপজানরে জিজ্ঞেস করি। তখন আমার মনে পড়ল ফালতু মতির বাবা লতিফুর রহমান মুসলিম লীগ করে। আগে চেয়ারম্যান ছিল, তাই গ্রামের মানুষ তাকে লতিফ চেয়ারম্যান ডাকে। মতির অবশ্যি তার বাবার কাছে যাওয়ার দরকার হলো না, দেখলাম লতিফ চেয়ারম্যান নিজেই আসছে। এই গরমের মাঝে একটা কালো আচকান পরেছে, মাথায় জিন্নাহ ক্যাপ। তার সাথে আরো কয়েকজন মুরব্বি, তারাও সেজেগুজে আছে, মাথায় টুপি, চোখে সুরমা। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো তাদের একজনের হাতে লম্বা বাঁশ, সেই বাঁশের আগায় পাকিস্তানের পতাকা। কয়দিন আগে সারা দেশে যত পাকিস্তানের পতাকা ছিল দেশের মানুষ সব পা দিয়ে মাড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করেছে, লতিফ চেয়ারম্যান যে তার পাকিস্তানের পতাকাটা বাঁচিয়ে রেখেছে কে জানত।
আমরা অবাক হয়ে এই দলটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, তারা ধান ক্ষেতের পাশে আমাদের কাছে দাঁড়াল। আমাদের দিকে এক নজর দেখে লতিফ চেয়ারম্যান গম্ভীর গলায় বলল, পোলাপান এইখানে কী করো? এইটা রং তামাশা দেখার বিষয় না। সবাই বাড়ি যাও। বাড়ি গিয়ে আল্লাহর নাম নাও।
আমরা একটু সরে দাঁড়ালাম কিন্তু চলে গেলাম না।
লতিফ চেয়ারম্যান উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাদের যাদের মাথায় টুপি নাই তারা বাড়ি যান। বাড়ি গিয়ে মেয়ে-ছেলেদের সাবধান করেন। ভুলেও যেন ঘর থেকে বের না হয়।
