তারপর নানি হঠাৎ করে থেমে গিয়ে ডোরার মাথায় হাত রেখে বলল, বোনডি, তুমি মন খারাপ কইরো না। কাল রাত্রেই আমি তোমার বাপরে স্বপ্ন দেখছি, কী সুন্দর রাজপুত্রের মতন চেহারা, কী সুন্দর পোশাক, আমারে বলতেছে, চাচি আমার বউ-বাচ্চা আপনাদের গ্রামে আছে। দেইখা রাখবেন। আমি বলছি তুমি কোনো চিন্তা কইরো না বাবা, আমি দেইখা রাখমু। আর আজকেই তুমি আমার সাথে দেখা করতে আসছ।
ডোরা চোখ মুছে বলল, আমি কোনো দিন আল্লুকে স্বপ্ন দেখি না।
তোমার বাপের বেহেস্ত নসিব হইছে এই জন্য দেখো না। তোমার বাপের যদি অশান্তি থাকত তা হইলে প্রত্যেক রাত্রে তোমাদের সাথে কথা বলতে আসত। বুঝছ?
ডোরা মাথা নাড়ল। নানি বলল, হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। আল্লাহর কী ইচ্ছা আমরা জানি না, সেই জন্য মনে দুঃখ রাইখো না।
নানি অনেকক্ষণ ডোরার সাথে কথা বলল, তারপর তাকে উঠানের মাঝখানে একটা জলচৌকিতে বসিয়ে তাকে মুড়ি-গুড় আর গাছের আতাফল খেতে দিল।
ডোরা নানিকে কথা দিল সময় পেলেই সে নানির সাথে কথা বলতে চলে আসবে। নানি তখন ডোরার কাছে আমার সম্পর্কে অনেক রকম নালিশ করে দিল, আমি সময়মতো বাড়িতে আসি না, বাড়িতে থাকি না, লেখাপড়া করি না–এই রকম কথাবার্তা। তখন আমি তাড়াতাড়ি ডোরাকে নিয়ে বের হয়ে চলে এলাম, একবার নানি এটা শুরু করলে সহজে থামবে না। এ
নানি ছাড়াও ডোরাকে একদিন আমি লতিফা বুবুর কাছে নিয়ে গেলাম। লতিফা বুবু খুব আগ্রহ নিয়ে ডোরাকে দেখল, তার চুল হাত দিয়ে পরীক্ষা করল, জামাটা দেখল, পায়ের জুতো দেখল, তারপর দেশের অবস্থা নিয়ে গল্প করল। লতিফা বুবু প্রত্যেক দিন রাত্রে রেডিওতে খবর শোনে, তাই আমাদেরকে অনেক খবর দিল। বলল, আগে বিবিসি শুনতে হতো, আকাশবাণী শুনতে হতো এখন আর ওইগুলো শুনতে হয় না।
কেন?
ওমা! তোরা জানিস না? এখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়েছে। সব খবর পাওয়া যায়।
সত্যি?
হ্যাঁ। সব ভালো ভালো খবর, মুক্তিযোদ্ধাদের খবর। যুদ্ধের খবর।
আমাদের মাসুদ ভাইয়ের খবর কি দিয়েছে?
না, এখনো দেয় নাই। লতিফা বুবু ডোরার দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ দিন তোমার বাবার কথা বলেছে।
ডোরা জিজ্ঞেস করল, কী বলেছে?
লতিফা বুবু ডোরার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ঐ তো, কেমন করে মিলিটারিরা তাকে মেরেছে, এই সব।
ডোরা বলল, ও। তারপর চুপ করে গেল।
ডোরার সাথে একদিন মামুনের দেখা করিয়ে দিলাম। মামুন আমাদের মাঝে সবচেয়ে চালু কিন্তু দেখা গেল ডোরার সামনে এসে সে একেবারে চুপ মেরে গেল। সে সোজাসুজি ডোরার দিকে তাকাতেই পারল না, ডানে-বামে তাকাতে লাগল, পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। তার নাকের মাঝে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমা হতে লাগল। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত বলল, তোমাকে জেঁকে ধরেছিল?
ডোরা বলল, হ্যাঁ। আমার পায়ে একটা জোঁক ধরেছিল। রঞ্জু টেনে ছুটিয়েছে! ছিঃ। ঘেন্না।
মামুন বলল, আমাকেও একদিন জোঁক ধরেছিল।
ডোরা বলল, সত্যি? কোথায়?
মামুন লজ্জায় লাল নীল বেগুনি হয়ে বলল, এই তো ওইখানে
যে জায়গায় জোঁক ধরেছিল সেটা সবার সামনে বলার মতো না, মোটামুটি একটা লজ্জাজনক ঘটনা, তাহলে তুই গাধা এখন এই গল্পটা শুরু করলি কেন?
আমি জানি মামুনের কোনো কাজ নাই কিন্তু হঠাৎ করে সে ভান করল তার অনেক কাজ তাই তাড়াতাড়ি চলে গেল।
যে মানুষটার সাথে ডোরার দেখা না হলে কোনো ক্ষতি ছিল না একদিন তার সাথেও দেখা হয়ে গেল, মানুষটা হচ্ছে ফালতু মতি। আমি ডোরাকে নিয়ে লতিফা বুবুর বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি, তখন দেখলাম উল্টো দিক দিয়ে মতি আসছে। আমি ডোরাকে বললাম, ডোরা, দেখছ, সামনে দিয়ে একটা লোক আসতাছে?
হ্যাঁ দেখেছি। কী হয়েছে?
এই মানুষটা হচ্ছে ফালতু মতি।
ফালতু মতি?
হ্যাঁ। দশ গ্রামের মাঝে সবচেয়ে ফালতু মানুষ। তোমার সাথে যদি উল্টাপাল্টা কথা বলে উত্তর দেওয়ার কোনো দরকার নাই।
উল্টাপাল্টা কথা কেন বলবে?
মানুষটা ফালতু সেই জন্য।
ততক্ষণে ফালতু মতি আমাদের কাছে চলে এসেছে, এমন ভান করল যেন ডোরাকে দেখেই নাই, শুধু আমাকে দেখেছে! আমার দিকে তাকিয়ে বলল, রঞ্জু নাকি, কই যাস?
এই তো। আমিও ফালতু মতির কথার উত্তর দিই তার মতো করে।
দেশের কোনো খোঁজখবর রাখস?
কোন খোঁজখবর?
এই তো মালাউনদের খবর?
না, রাখি না।
সদরে কী হইছে জানস?
না, জানি না।
মালাউনের পুরা গুষ্টি এখন মুসলমান হইয়া গেছে। মতি হা হা করে হাসল, তারপর পকেট থেকে সিগারেটের পকেট বের করে সেখান থেকে একটা পুরো সিগারেট মুখে দিল। খুব কায়দা করে সেটা ধরিয়ে বলল, মালাউনদের বড় ব্যবসা গঞ্জে। ইন্ডিয়া ভাগলে তো পুরা ব্যবসা লুট হইয়া যাইব, তাই কোনো ঝামেলায় যায় নাই। গরুর গোশত খাইয়া কলমা পইড়া মুসলমান। মতি আবার হা হা করে দুলে দুলে হাসতে লাগল, আগে লক্ষ্য করি নাই মতির মাড়ির রং কালো, যখন হাসে তখন মাড়ি বের হয়ে তাকে দেখতে খাটাশের মতো লাগে।
মালাউনদের ফিচলা বুদ্ধি দেখছস? নিরঞ্জন সাহার নাম এখন আব্দুল জব্বার! মাথার মাঝে টুপি, থুতনির মাঝে ছাগল দাড়ি। বউদের কপালে সিঁন্দুর নাই, হাতে শাঁখা নাই। গুষ্টির পর গুষ্টি এখন মুসলমান খালি খতনাটা এখনো বাকি আছে। বলে আবার খাটাশের মতো হাসতে থাকে।
