স্টল থেকে বের হয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, তোমাকে বলেছিলাম না বলাই কাকুর চা পৃথিবীর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ। দেখেছ এখন?
ডোরা বলল, সর্বশ্রেষ্ঠ না কচু। এক গাদা চিনি আর দুধ। এটা চা হলো? এটা তো পায়েস!
ডোরার কথা শুনে আমি রীতিমতো আঘাত পেলাম কিন্তু বুঝতে পারলাম না পায়েসের মতো চা হলে কেন সেটা সর্বশ্রেষ্ঠ হতে পারবে না।
স্কুলে গিয়ে সে আমাদের শহীদ মিনারটা দেখেও হি হি করে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল, বলল, এইটা শহীদ মিনার! এইটা তো বাঁশের খাম্বা।
শুনে আমার একটু অপমান হলো কিন্তু কী বলব বুঝতে পারলাম না। তবে স্কুলটা তার পছন্দ হলো, বড় দালান, সামনে বিশাল মাঠ, পাশে পুকুর, পেছনে বড় বড় গাছ। আমি তাকে আমাদের ক্লাস রুমে নিয়ে গেলাম, এখন স্কুলে ক্লাস হচ্ছে না কিন্তু শুনছি কয় দিনের মাঝে ক্লাস শুরু হবে, তখন ডোরাকে মনে হয় এই স্কুলে আমাদের ক্লাসেই ভর্তি হতে হবে।
কালী গাংটাও তার খুব পছন্দ হলো, এখন পানি কম। আমি তাকে বললাম বর্ষা শুরু হলেই নদীটা ফুলে-ফেঁপে বিশাল নদী হয়ে যাবে।
কালী গাংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ডোরা জিজ্ঞেস করল, তুমি সাঁতার জানো?
জানব না কেন? আমি সাঁতরে এই গাং পার হই।
ডোরা চোখ বড় বড় করে বলল, সত্যি?
সত্যি। খোদার কসম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সাঁতার জান?
ডোরা মাথা নাড়ল, বলল, না।
আমি বললাম, কোনো সমস্যা নাই, আমি তোমাকে সাঁতার শিখিয়ে দেব।
ডোরা মনে হয় সেটা শুনে বেশ খুশিই হলো।
বড় সড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে আমরা গ্রামের একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত গিয়ে তাকে বিশাল ধানক্ষেত দেখালাম। দূরের জঙ্গলটা দেখিয়ে বললাম, ঐ যে দূরের জঙ্গলটা দেখছ, এটার কোনো শেষ নাই।
শেষ নাই মানে?
শেষ নাই মানে এই জঙ্গলটার অন্য পাশে কী আছে কেউ জানে না।
সত্যি?
হ্যাঁ। মাসুদ ভাইয়ের দল যুদ্ধ শেষ করে হেঁটে হেঁটে এই জঙ্গলে ঢুকে গিয়েছিল।
সত্যি?
সত্যি।
ডোরা কিছুক্ষণ রহস্যময় জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই জঙ্গলে কী কী আছে?
অনেক ভেতরে নাকি একটা পুরনো রাজবাড়ি আছে, এখন সেখানে কেউ যেতে পারে না। ভেঙেচুরে গেছে।
ডোরা আবার চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল, সত্যি?
সত্যি।
এই জঙ্গলে কি বাঘ আছে?
আমি কখনো বাঘ বের হতে শুনি নাই কিন্তু অনেক বাঘডাশ বের হয়েছে। বাঘ আর বাঘডাশে পার্থক্য কী? তাই বললাম, নিশ্চয়ই আছে। আগে অনেক বেশি ছিল এখন কমে গেছে। বন্যার সময় নদীতে বাঘ ভেসে আসত, সব গরু-ছাগল খেয়ে ফেলত।
এখন আসে না?
আমি কোনো দিন বাঘ আসতে দেখিনি, তার পরেও বললাম, মাঝে মাঝে আসে।
ডোরা শুনে যথেষ্ট চমৎকৃত হলো। সড়ক ধরে হেঁটে ফিরে আসতে আসতে আমি তাকে গাছগাছালি চিনালাম। ধুতরাগাছ মারাত্মক বিষ, এর ফল খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। শুনে সে খুবই অবাক হলো। অনেকক্ষণ সে দেখতে একেবারে নিরীহ ধুতরাগাছ আর ধুতরা ফুলের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তাকে চুতরাগাছি আর বানরশলা গাছ চিনিয়ে দিলাম, শরীরে লাগলে সারা শরীর চুলকাতে থাকে, শুনে সে অবাক হয়ে চুতরাগাছ আর বানরশলার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে ভেদাল পাতা দেখালাম, এমনিতে কিছু নেই কিন্তু একটু কচলে দিলেই বিকট দুর্গন্ধ বের হতে দেখে সে খুবই মজা পেল।
আমি গ্রামের ভেতর এসে তাকে হিন্দুপাড়া নিয়ে গেলাম। আমাদের দেখে থুরথুরে বুড়ি একজন জিজ্ঞেস করল, কেডা?
আমি রঞ্জু।
রঞ্জু কেডা? সাথে কে?
সাথে কাজীবাড়ির নাতনি।
যার বাপরে পাঞ্জাবিরা মারছে?
হ্যাঁ।
বুড়ি হতাশ ভাবে মাথা নেড়ে বলল, হায় ভগবান! এইটা তোমার কী বিচার?
আমি ডোরাকে নিয়ে নীলিমাদের বাড়ির সামনে এলাম, বাড়িতে তালা মারা। গলা নামিয়ে বললাম, এই বাড়িতে নীলিমারা থাকত।
নীলিমা কে?
আমাদের ক্লাসে পড়ত একটা মেয়ে।
এখন কোথায়?
ইন্ডিয়া চলে গেছে।
নীলিমারা ইন্ডিয়া চলে গেছে শুনে ডোরা বেশি অবাক হলো না। সব হিন্দুরাই এখন ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। আমি বাড়ির সামনে তুলসীগাছটা দেখিয়ে বললাম, এইটা হচ্ছে তুলসীগাছ। এইখানে হিন্দুরা পূজা দেয়। একদিন আমায় এই গাছটার নিচে খুঁড়তে হবে।
কেন?
নীলিমা এইখানে একটা জিনিস পুঁতে রেখেছে। আমাকে বলেছে সে যদি না আসে তাহলে এটা খুঁড়ে বের করতে।
নীলিমারা আসবে না?
যুদ্ধ শেষ না হলে কেমন করে আসবে? যুদ্ধ শেষ হতে দশ-বারো বছর লাগবে। মাসুদ ভাই বলেছে।
.
একদিন ডোরাকে আমার বাড়িতে নিতে হলো। ডোরারা বড়লোকের পরিবার, শহরে থাকে, তারা কত কী দেখে অভ্যস্ত, আমার বাড়িতে ভাঙাচোরা ছনের ঘর, পুরনো কাঁথা-বালিশ, ধানের মটকা এসব দেখে কী মনে করবে সেটা চিন্তা করে আমার লজ্জা লাগছিল। আমি ডোরাকে আনতে চাচ্ছিলাম না কিন্তু সে আসবেই–আমার নানিকে দেখবেই–তাই তাকে একদিন বাড়িতে আনতে হলো। নানিকে নিয়েও ভয়, ডোরার সামনে ক্যাট ক্যাট করে কাকে গালাগাল শুরু করে দেবে কে জানে! সেটা নিয়েও আমি একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম কিন্তু দেখা গেল ভয়ের কিছু নাই।
নানি ডোরাকে দেখে খুব খুশি হয়ে উঠল, তার শুকনো কাঠি কাঠি আঙুল দিয়ে ডোরার মাথায় শরীরে হাত বুলিয়ে বলল, বোনডি, তুমি এত বড় হইছ? তোমার বাপরে আমি এই এতটুকুন দেখছি, খালি অসুখ হইত! তারপরে কত বড় ইঞ্জিনিয়ার হইল। আমরা সবাই কত খুশি।
