আমি বললাম, বাবা নাই। মরে গেছেন।
মেয়েটা মনে হলো একটু ধাক্কা খেল, তারপর বলল, তোমার মা?
মাও নাই। দুইজনে একসাথে পানিতে ডুবে মরে গেছেন।
এইবারে মেয়েটার মুখে দুঃখের ছাপ পড়ল, বলল, ও।
আমি খুব ছোট ছিলাম বাপ-মা কাউরে দেখি নাই। কিছু মনে নাই।
মেয়েটা বলল, আমার আব্বুকে মিলিটারি মেরে ফেলেছে।
আমি বললাম, জানি। আমরা সবাই জানি।
মেয়েটা হঠাৎ করে কাঁদতে শুরু করল, আমি একেবারে হকচকিয়ে গেলাম, কী করব বুঝতে পারলাম না।
মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করতে থাকে কিন্তু কান্না থামাতে পারে না। অনেকক্ষণ পর কান্না থামিয়ে বলল, এত দিন রাস্তাঘাটে ছিলাম, মানুষের বাড়িতে ছিলাম, বিপদের মাঝে ছিলাম তাই আব্দুর জন্য কাঁদতেও পারি নাই। এইখানে এসে সারা দিন আর রাত খালি কাঁদি।
আমি কী করব কিংবা কী বলব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, তাই চুপচাপ বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। মেয়েটা চোখ মুছতে মুছতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে তার বাবার কথা বলতে থাকে। বাবাকে মেরে ফেলার বিষয়টা একেবারেই মেনে নিতে পারছে না, সেটা আমি বুঝতে পারলাম। আমার মনে হচ্ছিল সান্ত্বনা দিয়ে আমার কিছু বলা দরকার কিন্তু বলার মতো একটা কথাও মাথার মাঝে আনতে পারলাম না। তাই একটা কথাও বলতে পারলাম না, কিন্তু তাতে খুব একটা সমস্যা হলো না, মেয়েটা একাই কথা বলে যেতে লাগল, আমি শুনে যেতে লাগলাম। মনে হয় মেয়েটা কথা বলার জন্য একটা মানুষ খুঁজছিল, আমাকে পেয়ে গেছে। মনে হয় খুব দুঃখের সময় মানুষের কথা বলার জন্য একটা লোকের দরকার হয়।
আমি একটা কথাও না বলে অনেকক্ষণ মেয়েটার কথা শুনেছি বলেই মনে হয় মেয়েটার সাথে আমার খাতির হয়ে গেল। তার নাম ডোরা। ডোরা মানুষের নাম হতে পারে আমি জানতামই না। তার বড় বোনের নাম নোরা। বড় বোন কলেজে পড়ে, সে আমার সাথে পড়ে। তবে ডোরা আমার মতন ফাঁকিবাজ ছাত্র না, সে খুবই ভালো ছাত্রী। ডোরার সাথে প্রায় প্রত্যেক দিনই দেখা হতে লাগল, আর প্রত্যেক দিনই সে কথা বলে যেত আর আমি শুনে যেতাম। প্রথম প্রথম তার বাবাকে মিলিটারিরা কীভাবে মেরেছে সেটা নিয়ে একেবারেই কথা বলতে চাইত না, শেষে আস্তে আস্তে বলেছে। বাবা ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিল, মিলিটারিরা এসে তাকে ডেকে নিয়েছে ইলেকট্রিক সাপ্লাই চালু করার জন্য। চালু করার পর সবাইকে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছে। পুরো একদিন ইলেকট্রিক সাপ্লাই বিল্ডিংয়ের দেয়ালের পাশে বাবার লাশটা পড়ে ছিল, তারপর কয়েকজন মিলে চাটাই দিয়ে পেঁচিয়ে লাশটা তাদের বাসার সামনে রেখে গেছে। এরপর ডোরা আর কিছু বলতে পারে না, তারপর কী হয়েছে সে নাকি মনেও করতে পারে না। লাশের ওপর কয়টা মাছি ভনভন করছিল, এছাড়া নাকি তার আর কিছু মনে নাই। শুনে আমার খুবই অবাক লাগে কিন্তু আমি সেটা নিয়ে ডোরাকে কিছু বলি
একদিন ডোরা বলল, বুঝেছ রঞ্জু। আমাকে একটা কাজ করতে হবে। করতেই হবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী কাজ?
আমাকে নিজের হাতে একটা পাকিস্তানি মিলিটারি মারতে হবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী মারতে হবে?
পাকিস্তানি মিলিটারি।
কীভাবে মারবে?
মুক্তিবাহিনী হয়ে।
মুক্তিবাহিনী?
ডোরা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।
আমি নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ডোরার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ডোরা বলল, তুমি এত অবাক হচ্ছ কেন? মেয়েরা মুক্তিবাহিনী হতে পারে না?
আমি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বললাম, পারে নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু—
কিন্তু কী?
কিন্তু তুমি তো অনেক ছোট। ছোটদের মুক্তিবাহিনী নেয় না। আমি যেতে চেয়েছিলাম মাসুদ ভাই নেয় নাই।
ডোরা জিজ্ঞেস করল, মাসুদ ভাই কে?
আমি তখন ডোরাকে মাসুদ ভাইয়ের গল্প করলাম। মাসুদ ভাইয়ের যুদ্ধের গল্পটা করলাম খুবই বাড়িয়ে-চাড়িয়ে। শত শত মিলিটারি মারা গেছে, হেলিকপ্টারে করে সেই মিলিটারিদের লাশ নিতে হয়েছে, এই ভাবে বর্ণনা দিলাম। মাসুদ ভাইয়ের সাহস নিয়ে আজব-আজব অনেকগুলো গল্প বললাম। শুনে ডোরা খুবই উৎসাহিত হলো, বলল, চলো, তুমি আর আমি মাসুদ ভাইকে খোঁজ করি। দুইজন মিলে বললে না করতে পারবে না, আমাদের নিয়ে নেবে।
নেবে না। আমি হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললাম, মাসুদ ভাই খালি বলে যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস, যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস। যুদ্ধ বড়দের জিনিস ছোটদের যুদ্ধে যাওয়া ঠিক না।
ডোরা হাল ছাড়ে না, বলে, আমরা দুইজনে খুঁজে খুঁজে তাদেরকে বের করে হাজির হব, তখন আমাদেরকে আর ফেলে দিতে পারবে না। পারবে?
আমি মাথা চুলকে বললাম, দশ-বিশ বছর যুদ্ধ হবে। তত দিনে আমরা বড় হয়ে যাব। তখন কেউ না করতে পারবে না।
ডোরা এত দিন অপেক্ষা করতে রাজি না। সে এখনই মুক্তিবাহিনীতে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি মারতে চায়। এখনই–তার দেরি করার কোনো ইচ্ছা নাই।
নানি ছাড়া আমি এর আগে কোনো মেয়েকে কাছ থেকে দেখি নাই। নানি যথেষ্ট ভয়ংকর কিন্তু আমার মনে হতে থাকে ডোরা বুঝি নানি থেকেও ভয়ংকর। কিংবা কে জানে হয়তো সব মেয়েরাই এই রকম ভয়ংকর হয়।
.
১১.
আমাদের গ্রামের অনেক মেয়ের সাথেই ডোরার পরিচয় হলো, শহরের একটা মেয়ে যার বাবাকে পাকিস্তানের মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে তার সাথে অনেক মেয়েই বন্ধুত্ব করতে চাইছিল কিন্তু ডোরার সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব হলো আমার সাথে। তার কারণটা কী কে জানে! আমার কাজ হয়ে গেল সকাল বেলা ডোরাকে নিয়ে বের হয়ে গ্রামের সবকিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। প্রথমে তাকে নিয়ে গেলাম বলাই কাকুর চায়ের স্টলে, ডোরাকে আগেই বলে রেখেছিলাম বলাই কাকুর চায়ের স্টলে মানুষজন কম থাকলে আমাদের হাফ কাপ ফ্রি চা বানিয়ে খাওয়ান। আজকে স্টলে অনেক মানুষ ছিল তার পরও বলাই কাকু ডোরার খাতিরে আমাদের দুইজনকে ফ্রি চা খাওয়ালেন, সাথে কুকি বিস্কুট। বলাই কাকু আর অন্যরাও ডোরাকে নানান কিছু জিজ্ঞেস করল, ডোরা হুঁ হাঁ করে উত্তর দিল, তার হয়ে কথাবার্তা যা বলার আমিই বললাম।
