আমি দাঁড়ালাম, মেয়েটাকে বলা দরকার যে তাকে একটা জোঁকে ধরেছে, কিন্তু লতিফা বুবু জোঁককে যে রকম ভয় পায়, এই মেয়েটাও যদি সে রকম ভয় পায় তাহলে বিপদ আছে। জোঁক ধরেছে বলামাত্রই সে এমন লাফঝাঁপ চিৎকার দিতে থাকবে যে তখন জোকটা টেনে ছোটানোই অসম্ভব হয়ে যাবে। শহরের মেয়ে নিশ্চয়ই জীবনেও জোক দেখে নাই, এখন যদি জানে তার শরীরে একটা জোক নিশ্চিন্তে রক্ত খেয়ে যাচ্ছে তাহলে কেলেংকারি হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু একটা করা দরকার তাই আমি থেমে গিয়ে মেয়েটাকে ডাকলাম, এই যে। শোনো।
মেয়েটা ঘুরে আমার দিকে তাকাল, বলল, আমাকে বলছ?
হ্যাঁ।
অহংকারী মেয়েরা যেভাবে ভুরু কুঁচকায়, মেয়েটা সেভাবে ভুরু কুঁচকিয়ে বলল, কী হয়েছে?
আমাদের গ্রাম দেশে গাছপালায় অনেক জোঁক থাকে।
মেয়েটা একটা ফুলগাছের কাছে ছিল সেখান থেকে ছিটকে সরে এল, মুখের মাঝে জোঁকের প্রতি ভয় আর ঘৃণার ভাবটা ফুটে উঠল, সে কারণে অহংকারের ভাবটা কমে গেল। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে জোঁককে ভয় পায়, এখন যদি বলি তাকে জোঁকে ধরেছে তাহলে কেলেংকারি ঘটতে পারে। একটু কায়দা করে বলতে হবে।
আমি বললাম, জোঁককে ভয়ের কিছু নাই। একটু লবণ না হলে তামাকের পানি দিলেই জোঁক শেষ। বারোটা বেজে যায়।
মেয়েটা কিছু বলল না। আমি বললাম, তুমি কি জোঁককে ভয় পাও?
না। জোঁককে ভয় পাওয়ার কী আছে?
তাহলে ভালো।
মেয়েটা সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে ভালো মানে কী?
আমি বললাম, আমি জোঁককে একটুও ভয় পাই না। কাউকে জোঁকে ধরলে আমি টেনে ছুটিয়ে দিই।
মেয়েটা একটু অন্যভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছে, মনে হয় টের পেয়েছে আমি কী বলতে যাচ্ছি। নিজের পায়ের দিকে তাকাল কিন্তু জোঁকটা পায়ের পেছনে ধরেছে তাই দেখতে পেল না।
আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমি বললাম, তুমি যেভাবে দাঁড়িয়ে আছ ঠিক সেভাবে দাঁড়িয়ে থাকো! এক সেকেন্ড।
মেয়েটা একটা চিৎকার করল, কেন? কী হয়েছে?
কিছু হয় নাই। বলে আমি লাফ দিয়ে তার পেছনে গেলাম, এক হাতে শক্ত করে পায়ের গোড়ালিটা ধরে অন্য হাত দিয়ে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে জোঁকটাকে টেনে ছোটানোর চেষ্টা করলাম। প্রথমবার পিছলে ছুটে গেল, দ্বিতীয়বারে সেটা ছুটে এল। মেয়েটা তখন চিলের মতো চিৎকার করছে, মনে হচ্ছে তাকে বুঝি কেউ খুন করে ফেলেছে। আমি জোঁকটাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেললাম, অনেকখানি রক্ত খেয়েছে জায়গাটা রক্তে লাল হয়ে গেল। মেয়েটার চিৎকার শুনে প্রথমে বাড়ির কুকুর, তারপর বড় বোন, তারপর অন্যরা ছুটে এল। এদের মাঝে বাড়ির কুকুরটা সবচেয়ে বুদ্ধিমান সে এসেই বুঝে ফেলল কী হয়েছে, থেতলে পিষে যাওয়া জোকটা শুঁকে মুখ তুলে অন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করল, ভয়ের কিছু নাই। কিন্তু অন্যরা চিৎকার করতে লাগল, কী হয়েছে? কী হয়েছে?
আমি বললাম, কিছু না। জোঁক ধরেছিল। ছুটিয়ে দিয়েছি।
সবাই এমনভাবে চিৎকার করতে লাগল যে মনে হতে লাগল মেয়েটাকে জোঁক না, একটা আস্ত বাঘ ধরে ফেলেছিল।
মেয়েটা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে ঘেন্নায় প্রায় বমি করে দিচ্ছিল, তাকে দেখে মনে হলো পারলে সে তার পুরো পাটা কেটে ফেলে দেবে। জোঁক ধরলে সেই জায়গায় রক্ত সহজে বন্ধ হয় না, তাই মেয়েটার পা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বের হতে লাগল।
মেয়েটার মা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ডাক্তার। একজন ডাক্তার পাওয়া যাবে?
কথা শুনে আমার হাসি পেল, কিন্তু আমি হাসলাম না, বললাম ডাক্তার লাগবে না। ভালো করে ধুয়ে একটু তেনা পুড়িয়ে লাগিয়ে দেন।
মেয়েটা বলল, তেনা পুড়িয়ে? তেনা পুড়িয়ে কেন?
বড় মেয়েটা বলল, ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য।
ছোট মেয়েটা বলল, না, আমি তেনা পোড়া লাগাব না।
আমি বললাম, তাহলে কিছুই করতে হবে না, একটু পরে এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
মেয়েটা বলল, তুমি কেমন করে জানো? তুমি কি ডাক্তার নাকি?
আমি দাঁত বের করে হাসলাম, বললাম, না, আমি ডাক্তার না। কিন্তু আমারে অনেকবার অনেক জোঁক ধরেছে, আমি জানি।
দৃশ্যটা কল্পনা করে মেয়েটা মুখ বিকৃত করে কেমন জানি শিউরে উঠল। বাড়ির সবাই মিলে তখন মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে যেতে থাকে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হতে থাকে সাংঘাতিক একটা ঘটনা ঘটেছে। এ রকম ঘটনা এর আগে কখনো ঘটে নাই, ভবিষ্যতেও ঘটবে না। আমি কী করব বুঝতে না পেরে বাড়ি চলে এলাম, নানিকে বলতে হবে, নানি নিশ্চয়ই শুনে হাসতে হাসতে মারা যাবে।
.
পরের দিন আবার আমার মেয়েটার সাথে দেখা হলো। কাজীবাড়ির বাংলাঘরের বারান্দায় একটা চেয়ারে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কেমন যেন দুঃখী দুঃখী চেহারা। দেখে মনে হয় কিছু একটা ভাবছে। আমার মনে হলো মেয়েটার একটু খোঁজ নেওয়া দরকার, সড়কে দাঁড়িয়ে বললাম, তোমার পায়ের কী অবস্থা?
মেয়েটা আমাকে দেখে চিনতে পারল, বলল, এসে দেখে যাও। খুবই ঘেন্নার অবস্থা–কালকে অনেকক্ষণ রক্ত পড়েছে।
আমি বাংলাঘরের বারান্দায় উঠে গিয়ে তার পাটা পরীক্ষা করলাম। কালকে যেখানে সেঁক ধরেছিল, আজকে সেখানে ছোট লাল একটা দাগ–এর মাঝে ঘেন্নার কী আছে বুঝতে পারলাম না। মেয়েটা বলল, তুমি এই গ্রামে থাকো।
আমি মাথা নাড়লাম। মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, তোমার বাবা কী করেন?
