আমি সবকিছু বুঝি নাই, শুধু বুঝলাম মাসুদ ভাই আমাকে মুক্তিবাহিনীতে নেবে না। আমার চোখে কেন জানি পানি চলে আসল।
মাসুদ ভাই আমার চোখের পানিটা দেখল কি না, বুঝতে পারলাম না। আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, যাও বাড়ি যাও। অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, তোমার বাবা-মা চিন্তা করবেন।
আমি নিচু গলায় বললাম, আমার বাবা-মা নাই। খালি একজন নানি আছেন।
তাহলে তোমার নানি চিন্তা করবেন। যাও, বাড়ি যাও।
.
আমি যখন বাড়ি ফিরে এসেছি তখন অনেক রাত হয়েছে। নানি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আমাকে দেখে বুকে চেপে ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস নিল, তারপরে বলল, ভাইডি তুই আসছস?
হ্যাঁ, নানি আসছি?
আমার মনে হচ্ছিল—
কী মনে হচ্ছিল?
মনে হচ্ছিল তুই বুঝি মুক্তিবাহিনীর সাথে চলে গেছস।
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, তুমি যে কী বলো নানি। আমি তোমাকে একলা রেখে মুক্তিবাহিনীর সাথে চলে যাব? আর মুক্তিবাহিনী আমারে নেবে?
নানি মাথা নাড়ল, বলল, এখন আর কোনো কিছুর ঠিক নাই। সবকিছু ওল্টাপাল্টা হয়া গেছে।
.
১০.
দুপুরবেলা খেতে বসেছি তখন মামুন এসে আমাকে খবর দিল, কাজীবাড়ির ইঞ্জিনিয়ার ছেলের বউ আর দুই মেয়েকে নিয়ে তার বাবা বুড়ো কাজী দাদা এই মাত্র বাড়ি পৌঁছেছেন।
ব্যাপারটা দেখার জন্য আমি তখন তখনই যেতে চাচ্ছিলাম, নানি তখন আমাকে জোর করে বসিয়ে থালার সব ভাত শেষ করাল। আমি তখন হাত ধুয়ে মামুনকে নিয়ে কাজীবাড়ির দিকে রওনা দিলাম। বাড়ির বাইরে গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি ধরনের মানুষ বসে আছে, পুরুষ মানুষ বলে ভেতরে যেতে পারছে না। আমি আর মামুন সরাসরি ভেতরে ঢুকে গেলাম। উঠানে একটা জলচৌকিতে একজন মহিলা বসে আছেন, নিশ্চয়ই ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের স্ত্রী। গ্রাম সম্পর্কে আমাদের চাচি। তাঁকে ঘিরে গ্রামের অনেক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মা, কাজী দাদি ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছেন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাবা কাজী দাদা কীভাবে তাঁর ছেলের বউ-বাচ্চাদের উদ্ধার করে এনেছেন সেটা সবাইকে বলছেন, সবাই সেটা খুব মন দিয়ে শুনছে।
আমি এদিক-সেদিক তাকিয়ে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের দুই মেয়েকে খুঁজলাম। আগের বার দেখেছিলাম খুবই অহংকারী ছিল, আমাদের সাথে কথাই বলত না। এখন তারা কি আমাদের সাথে কথা বলবে? যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের তো এখানেই থাকতে হবে। যুদ্ধ শেষ হবার পরও তারা কোথায় যাবে? মেয়ে দুটিকে দেখতে পেলাম না, মনে হয় ভেতরে আছে।
একজন মহিলা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ভাই সাহেবরে পাঞ্জাবিরা কেমন করে মারল?
ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের স্ত্রী, যিনি গ্রাম সম্পর্কে আমাদের চাচি শক্ত গলায় বললেন, আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।
বেশ কয়েকজন তখন মাথা নেড়ে বলল, না না, এই সব নিয়ে কেন কথা বলবে? এই সব নিয়ে কথা বলতে কি ভালো লাগে?
তখন আরেকজন জিজ্ঞেস করল, লাশকে কি দাফন-কাফন করা গেছে?
চাচি এবারেও বললেন, আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।
আবার কয়েকজন তখন মাথা নেড়ে বলল, কেন বলবে? এইটা কি বলার মতো কথা?
আমাদের গ্রামের পুরুষ মানুষদের যে রকম বুদ্ধিশুদ্ধি খুব বেশি না, গ্রামের মহিলাদেরও একই অবস্থা। তাদেরও বেশি বুদ্ধিশুদ্ধি নাই। আরেকজন মহিলা জিজ্ঞেস করে বসল, সাহেবকে তো মেরে ফেলেছে, এখন সংসার চলবে কেমন করে?
চাচি এবার বেশ জোরে বললেন, আমি বলেছি এখন আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।
যেসব মহিলা ছিল তারা এবারে গুনগুন করে নিজেরা নিজেরা কথা বলতে লাগল, তারপর একজন-দুইজন করে সরতে লাগল। আমি শুনলাম যাওয়ার সময় একজন কুটনি বুড়ি ধরনের মহিলা আরেকজন কুটনি বুড়ি ধরনের মহিলাকে নিচু গলায় বলছে, এত তেজ ভালো না। মাইয়া লোকের তেজ আল্লাহর গজব টেনে আনে।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মা এতক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছিলেন, এবারে কান্না থামিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বউমা অনেক কষ্ট করে এসেছে, দুই দিন ধরে নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, বউমারে আপনারা বিশ্রাম করতে দেন।
কথার অর্থ খুবই পরিষ্কার, তোমরা সবাই বিদায় হও। কাজেই আমরাও বিদায় হলাম, মামুন তার বাড়িতে চলে গেল। আমি বলাই কাকুর চায়ের স্টলের দিকে রওনা দিলাম। নূতন কী কী খবর আছে, সেটা বলাই কাকুর চায়ের স্টলে সবচেয়ে আগে পাওয়া যায়।
বিকেলে যখন ফিরে আসছি তখন কাজীবাড়ির সামনে আমি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের একটা মেয়েকে দেখতে পেলাম। বাড়ির সামনে যে ফুলের বাগান আছে, একুশে ফেব্রুয়ারির সময় যেখান থেকে আমি ফুল চুরি করার চেষ্টা করছিলাম, সেখানে মেয়েটা হাঁটছে। মাঝে মাঝে নিচু হয়ে ফুলগাছের ভেতর কিছু একটা দেখছে। অপরিচিত মেয়েদের সাথে আমরা কথা বলি না, কেমন করে কথা বলতে হয় সেটাও জানি না। তাই চোখের কোনা দিয়ে মেয়েটাকে দেখতে দেখতে আমি হেঁটে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যেতে যেতে আমি থমকে দাঁড়ালাম, স্পষ্ট দেখতে পেলাম মেয়েটার পায়ের গোড়ালির আধ হাত উপরে একটা সেঁক ধরেছে। নিশ্চয়ই বেশ খানিকক্ষণ আগেই ধরেছে কারণ রক্ত খেয়ে সেঁকটা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। জোঁকের থেকে ধুরন্ধর আর কিছু নাই; যখন কাউকে কামড়ে ধরে সে টের পর্যন্ত পায় না। কোনো রকম ব্যথা না দিয়ে এক পেট রক্ত খেয়ে চলে যায়।
