মাসুদ ভাই বলল, এই পাকিস্তানিরা মানুষ না। এরা জানোয়ার। পুরা দেশটাকে তছনছ করে দিয়েছে।
আমি আরও কিছুক্ষণ হাঁটলাম, তারপর যে কথাটা বলার জন্য মাসুদ ভাইয়ের সাথে সাথে এতক্ষণ হাঁটছি সেটা বলার চেষ্টা করলাম। কেশে গলা পরিষ্কার করে বললাম, মাসুদ ভাই, আপনারে একটা কথা বলি?
কী কথা।
আমারে আপনাদের সাথে নিবেন?
মাসুদ ভাই চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল, আমি ভাবলাম মাসুদ ভাই বুঝি শব্দ করে হেসে উঠবে, ছোট বাচ্চাদের অর্থহীন কথা শুনে বড়রা যেভাবে হাসে ঠিক সেভাবে। কিন্তু মাসুদ ভাই হাসল না। বলল, কেন?
আমি মুক্তিবাহিনী হতে চাই।
এই দেশে সবাই মুক্তিবাহিনী। তুমিও মুক্তিবাহিনী।
আমি আপনাদের মতো মুক্তিবাহিনী হতে চাই।
আমাদের মতো?
হ্যাঁ। আমারে আপনাদের সাথে নেন। খোদার কসম আমি আপনাদের কোনো সমস্যা করব না। আপনাদের সাহায্য করব। মনে নাই স্কুলে যখন হাজার হাজার মানুষ আসছিল, আমরা সাহায্য করছিলাম? আপনাদের সাথে সাথে থাকব। যখন যুদ্ধ করবেন আমি পেছন থেকে আপনাদের জন্য গুলি এনে দেব। যদি চান রাইফেলটা দিয়ে আমিও গুলি করতে পারি।
আমি আসলে গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। কোনো কথা বলতে হলে উল্টাপাল্টা করে ফেলি। কিন্তু এইবার আমি একটুও উল্টাপাল্টা করলাম না, খুবই গুছিয়ে বললাম, অনেকক্ষণ ধরে বললাম। মাসুদ ভাই পুরো সময়টা আমার কথা শুনল, তারপরে কনুইয়ের কাছে আমার হাতটা ধরল। হাত ধরে সবাইকে বলল, এই! তোমরা একটু থামো, দুই মিনিট বিশ্রাম নাও। আমি রঞ্জুর সাথে একটু কথা বলি।
আমরা একটা ধানক্ষেত পার হয়ে জঙ্গলের কাছে এসেছি। সবাই ধানক্ষেতের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে গেল। মাসুদ ভাই আমার সামনে বসল। বসে, আমার মাথায় হাত রাখল। বলল, রঞ্জু, যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস। কত খারাপ সেইটা আমি আগে বুঝিনি, এখন বুঝেছি। গত সপ্তাহেই আমার বয়স ছিল বাইশ। এখন আমার বয়স কত জান? এখন আমার বয়স একশ বাইশ। এক সপ্তাহে আমার বয়স কেন একশ বছর বেড়েছে জানো?
আমি কিছু বললাম না। মাসুদ ভাই বলল, তার কারণ এই সপ্তাহে আমি প্রথম যুদ্ধ করেছি। কিছু তো জানতাম না। ভাবছিলাম যুদ্ধ করা খুব সোজা। রাইফেলে কেমন করে গুলি ভরতে হয়, কেমন করে ট্রিগার টানতে হয় গুলি করতে হয় ভাবছিলাম এইগুলো জানলেই যুদ্ধ করা যায়। আমি পুরা আহাম্মক ছিলাম। বড় রাস্তায় আমি ছেলেপিলেদের নিয়ে রাইফেল হাতে শুয়ে থাকলাম। মিলিটারির একটা জিপ আসছিল, কাছাকাছি আসতেই সবাই মিলে গুলি শুরু করলাম। আমরা ভাবলাম এইটাই যুদ্ধ। আমাদের খুবই কপাল ভালো রাস্তার ঐখানে একটা ব্রিজ ছিল, ড্রাইভারের শরীরে গুলি লেগেছে, ড্রাইভার কন্ট্রোল করতে না পেরে সবাইকে নিয়ে ব্রিজ থেকে নিচে খালের মাঝে পড়ে গেছে। আমরা ভাবলাম যুদ্ধে জিতে গেছি। জয় বাংলা জয় বাংলা চিৎকার করতে করতে যাচ্ছি। তখন–।
মাসুদ ভাই থামল, আমি জিজ্ঞেস করলাম, তখন?
তখন প্রথমে জিপ থেকে কয়টা মিলিটারি বের হয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি করতে শুরু করল। মেশিনগান কী জানো?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, জানি না।
রাইফেলে ট্রিগার টানলে একটা গুলি বের হয়। মেশিনগানে ট্রিগার টানলে বৃষ্টির মতো গুলি বের হতে থাকে। আমি ভেবেছিলাম গুলি করে আমাদের সবাইকে ফেলে দিয়েছে। আমরা সবাই তাড়াতাড়ি মাটিতে শুয়ে পড়েছি–আর মাথার ওপর দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি যাচ্ছে। অনেক কষ্টে পিছিয়ে আসছি, দেখলাম আমাদের সাথে আলতাফ নাই। আলতাফ মাঠের মাঝখানে পড়ে কাতরাচ্ছে।
মাসুদ ভাইয়ের গলা ভেঙে এল, শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছল। আশপাশে বসে সবাই মাসুদ ভাইয়ের কথা শুনছিল, সবাই তখন মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। মাসুদ ভাই একটু পরে বলল, আমরা ভাবছিলাম আলতাফকে ঐখানে রেখেই আমাদের চলে যেতে হবে। তখন জসীম বলল সে গিয়ে আলতাফকে টেনে নিয়ে আসবে। আমরা যেন খালি তার ওপর দিয়ে গুলি করতে থাকি। আমরা তা-ই করতে থাকলাম, জসীম গিয়ে আলতাফকে ধরে টেনে আনতে থাকে। যখন একেবারে আমাদের কাছে চলে এসেছে তখন–তখন–
মাসুদ ভাই আবার থেমে গেল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তখন জসীম গুলি খেল। আমরা তখন একজনের জায়গায় দুজনের লাশ টেনে নিয়া এসেছি। একটা ধানক্ষেতের পাশে জানাজা পড়িয়ে কবর দিয়েছি। মিলিটারি তখন সড়কের পাশে দুই গ্রামে আগুন দিয়েছে যারে পেয়েছে তারে মেরেছে। বুঝেছ রঞ্জু?
আমি গল্পটা শুনলাম কিন্তু কী বুঝতে হবে সেটা বুঝিনি, তাই মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাসুদ ভাই বলল, আমার কথা শুনে যুদ্ধ করতে গিয়ে দুইজন মারা গেছে। আমি নিজের হাতে তাদের কবর দিয়েছি। বুঝেছ?
আমি মাথা নাড়লাম। মাসুদ ভাই বলল, আমি কি কোনো দিন এই জন্য নিজেরে ক্ষমা করতে পারব? পারব না। আমার জন্য দুইজন মারা গেছে। দুইজন।
ক্ষেতের পাশে পা দুলিয়ে যারা বসেছিল তাদের একজন বলল, কী বলেন মাসুদ ভাই আপনার জন্য কেন মারা যাবে? সবাই গেছে নিজের মতো। হায়াত শেষ হয়েছে আল্লাহ নিয়ে গেছে।
মাসুদ ভাই তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই কথাটা বলছ, আমি জানি। যাই হোক রঞ্জু তুমি বাচ্চা মানুষ তোমাকে কেন আমি এই সব বলছি, জানি না। তোমাকে খালি বোঝাতে চাচ্ছিলাম যে যুদ্ধটা খুবই ভয়ংকর একটা জিনিস! তোমার উপরে চাপায়ে দিলে তোমার সেটা করতে হয় কিন্তু কোনো দিন নিজের থেকে সেটা শুরু করতে হয় না। বুঝেছ?
