আমি আর মামুন দৌড়ে গিয়ে মাসুদ ভাইয়ের হাত ধরে ফেললাম, চিৎকার করে বললাম, মাসুদ ভাই।
মাসুদ ভাই কোনো কথা না বলে একটু হাসার চেষ্টা করল, হাসিটা কেমন যেন অন্য রকম মনে হলো, এই হাসিতে কোনো আনন্দ নাই। মাসুদ ভাই এই কয় দিনে অনেক শুকিয়ে গেছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখগুলো কেমন যেন গর্তে ঢুকে গেছে কিন্তু সেই গর্তের ভেতর থেকে কেমন যেন ধিকধিক করে জ্বলছে। মাসুদ ভাইয়ের কাপড়-জামা নোংরা, চুলগুলো উশকু-খুশকো।
আমি বললাম, মাসুদ ভাই আপনি কেমন আছেন?
মাসুদ ভাই হাঁটতে হাঁটতে বলল, ভালো।
আপনি মুক্তিবাহিনী?
মাসুদ ভাই বলল, আমরা সবাই মুক্তিবাহিনী।
আমি অন্যদের দিকে তাকালাম, বেশির ভাগকেই চিনি না। আমাদের গ্রামের দুই-তিনজন আছে। আবু বকর চাচা তার মাঝে একজন। আবু বকর চাচা শান্তশিষ্ট মানুষ, শহরে তার একটা মনোহারী দোকান আছে। সেই আবু বকর চাচা হাতে একটা রাইফেল নিয়ে হাঁটছেন–দেখতে কী অবাক লাগছে!
আমি মাসুদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কই যান এখন?
মাসুদ ভাই বলল, এই তো এই দিকে। উত্তরটা শুনে বুঝতে পারলাম মাসুদ ভাই কোথায় যাচ্ছে, বলতে চাচ্ছে না।
আমি তাই আর জানতে চাইলাম না, জিজ্ঞেস করলাম, মাসুদ ভাই, আপনারা মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করেছেন।
হ্যাঁ।
কীভাবে যুদ্ধ করেছেন মাসুদ ভাই।
মাসুদ ভাই অন্যমনস্কভাবে বলল, এই তো, তার মানে এইটাও বলতে চাইছে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মাসুদ ভাই, আপনার দলে দুইজন নাকি মারা গেছে? সত্যি?
মাসুদ ভাই কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। আমি একটু অবাক হয়ে মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাসুদ ভাই কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেছে। আগে একজন হাসিখুশি মানুষ ছিল, কত কথা বলত। এখন গম্ভীর, কথা বলতেই চায় না।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা বলাই কাকুর চায়ের স্টলের সামনে চলে এসেছি তখন স্টলের ভেতর থেকে অনেকে বের হয়ে এল। আশপাশের থেকেও মানুষেরা ভিড় করে এল। এমনকি বেড়ার ফাঁক দিয়েও অনেক মহিলা উঁকি দিয়ে তাকিয়ে রইল।
বলাই কাকু বললেন, মাসুদ ভাই। আসেন। একটু চা খান, কী হচ্ছে বলে যান।
মাসুদ ভাই বলল, না বলাই দা। সময় নাই। আমাদের যেতে হবে।
কোথায় যাবেন?
আমার সাথে যেভাবে বলেছিল, ঠিক সেভাবে মাসুদ ভাই বলল, এই তো এদিকে।
একটু বসে যান। এক কাপ চা খেতে আর কতক্ষণ লাগবে।
মাসুদ ভাই বলল, সময়টা ভালো না বলাই দা। সময়টা খুব খারাপ। আমাদের চা খাওয়ালে আপনার বিপদ হতে পারে।
বলাই দা অবাক হয়ে বললেন, কিসের বিপদ?
সব জায়গায় মিলিটারি আসবে। মিলিটারির কাছে খবর দেওয়ার লোক সব জায়গাতে আছে। এখন ঘাপটি মেরে আছে, এরা বের হবে।
এটা আপনি কী বলেন?
আমি ভুল বলি নাই। সাবধান থাকা ভালো।
বলাই কাকু বলল, ঠিক আছে আপনি চা না খেতে চান খাবেন না। কিন্তু একটু বসেন, একটু কথা বলি।
মাসুদ ভাই মাথা নাড়ল, বলল, এখন না। এখন কথা বলার সময় না।
যুদ্ধটা কেমন হলো একটু শুনি। কয়টা পাঞ্জাবিরে মারছেন?
মাসুদ ভাইয়ের মুখটা কেমন জানি শক্ত হয়ে গেল। বলল, না বলাই দা। মানুষ মারার গল্প করতে চাই না। এই গল্প ভালো না।
মাসুদ ভাইয়ের গলার স্বরে কিছু একটা ছিল যার জন্য কেউ আর কোনো কথা বলল না। মাসুদ ভাই তার রাইফেলটা ঘাড়ে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। তার পিছু পিছু অন্য সবাই। সবাই লাইন ধরে সড়কটা ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, কী অদ্ভুত লাগছে দেখতে। আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, তারপর দৌড়ে মাসুদ ভাইয়ের কাছে গেলাম, বললাম, মাসুদ ভাই, আমি আপনার সাথে একটু হাঁটি।
মাসুদ ভাই মাথা নেড়ে নিষেধ করতে গিয়ে থেমে জিজ্ঞেস করল, কেন?
এমনি।
মাসুদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল, তারপর বলল, ঠিক আছে একটু হাঁটো।
আমি কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মাসুদ ভাইয়ের পাশাপাশি হাঁটলাম, তারপর বললাম, মাসুদ ভাই, আপনি লতিফা বুবুকে একটা বই পড়তে দিয়েছিলেন মনে আছে?
মাসুদ ভাই বলল, হ্যাঁ। মনে আছে। কী হয়েছে সেই বইয়ের?
লতিফা বুবুর বই পড়া শেষ হয়েছে। আমাকে বলেছে আপনাকে ফেরত দিতে।
মাসুদ ভাই হেসে ফেলল, এই প্রথমবার সেই আগের মতো হাসল, হেসে বলল, তোমার লতিফা বুবুকে বলো বইটা রেখে দিতে। এই বই আমি আর নিতে পারব না।
ঠিক আছে। বলে আমি আরও কিছুক্ষণ পাশাপাশি হাঁটলাম, তারপর বললাম, মাসুদ ভাই, আমাদের ক্লাসে নীলিমা নামে একটা মেয়ে ছিল মনে আছে?
হ্যাঁ। মনে আছে, কী হয়েছে তার?
পুরো ফ্যামিলি ইন্ডিয়া চলে গেছে।
মাসুদ ভাই কোনো কথা না বলে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। একটু পরে বলল, ঠিকই করেছে। এখন ভালোয় ভালোয় বর্ডার পার হতে পারলে হয়।
আমি বললাম, কাজীবাড়ি চিনেন মাসুদ ভাই?
না, চিনি না। কী হয়েছে কাজীবাড়ির?
কাজীবাড়ির বড় ছেলে বড় ইঞ্জিনিয়ার। চিটাগাং থাকত। পাকিস্তান মিলিটারি তারে মেরে ফেলছে।
মাসুদ ভাই বলল, আহা রে!
ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বউ আর দুই মেয়ে কোথায় আছে কেউ জানে না!
মাসুদ ভাই আবার বলল, আহা রে!
ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাবা বুড়া মানুষ কাজী দাদা। তাদের খুঁজতে গিয়েছিল এখন তারও খোঁজ নাই।
আমি ভাবছিলাম মাসুদ ভাই আবার বলবে, আহা রে। কিন্তু মাসুদ ভাই কিছু বলল না, এবারে শুধু একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
আমি বললাম, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মা, কাজী দাদির অবস্থা খুবই খারাপ। শুধু ফিট হয়।
