আমি বললাম, পরে নেব লতিফা বুবু। এখন নিয়া লাভ নাই।
কেন লাভ নাই?
মাসুদ ভাই এখন অনেক ব্যস্ত। থানা লুট করে সব রাইফেল নিয়ে গেছে মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করার জন্য।
আমি ভেবেছিলাম খবরটা শুনে লতিফা বুবু বুঝি চমকে উঠবে, কিন্তু লতিফা বুবু মোটেও চমকাল না, বরং কেমন যেন খুশি হয়ে উঠল, বলল, তোদের স্যার মুক্তিবাহিনী?
মুক্তিবাহিনী কথাটা আগে শুনি নাই। এই প্রথম শুনলাম। মিলিটারির সাথে যারা যুদ্ধ করে তারা মুক্তিবাহিনী? লতিফা বুবু খুশি খুশি গলায় বলল, রেডিওতে খবর দিচ্ছে। বাংলাদেশের সরকার তৈরি হইছে। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট। তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রী। দেশ মুক্ত করার যুদ্ধ সেই জন্যে এই যুদ্ধের নাম মুক্তিযুদ্ধ। যারা যুদ্ধ করে তারা মুক্তিবাহিনী।
তুমি এত কিছু কেমন করে জানো?
আমাদের বাড়িতে রেডিও আছে না। রাত্রিবেলা বিবিসি শুনি। সেইখানে সব খবর দেয়।
তুমি প্রত্যেক দিন খবর শোনো?
হ্যাঁ। তুই শুনবি? শুনলে চলে আসবি। বিবিসির খবর পাকা খবর।
লতিফা বুবুর বাসা থেকে আমি বলাই কাকুর চায়ের স্টলে গেলাম। সেখানে অনেক মানুষজন, সবাই খুব উত্তেজিত। উত্তেজনার কারণ মাসুদ ভাইয়ের থানা লুট। মানুষজন দুই ভাগে ভাগ হয়ে তর্ক করছে। এক ভাগের ধারণা কাজটা সঠিক হয়েছে, অন্য ভাগের ধারণা কাজটা ভুল হয়েছে। যারা মনে করছে কাজটা সঠিক হয়েছে তাদের একজন বলল, মাসুদ পোলাটা হচ্ছে বাঘের বাচ্চা। দেশে যুদ্ধ শুরু হইছে এখন কি বইসা বইসা আঙুল চুষব? থানা লুট কইরা অস্ত্রপাতি লইয়া গেছে। উচিত কাজ করছে।
যারা মনে করে কাজটা সঠিক হয়েছে তারা সবাই মাথা নাড়ল। যারা মনে করে কাজটা বেঠিক হয়েছে তাদের একজন বলল, যুদ্ধ কি গোল্লাছুট খেলা? যুদ্ধ করার জন্য ট্রেনিং লাগে না? এই পোলাপানের ট্রেনিং আছে?
ট্রেনিং নাই তো ট্রেনিং করব। সমিস্যা কী?
থানাওয়ালাদের অস্ত্রপাতির হিসাব রাখতি হয় একজন আইসা সেই অস্ত্রপাতি লুট করে নিতে পারে? থানাওয়ালা এখন কার কাছে কী হিসাব দেবে?
টেবিলে থাবা দিয়ে একজন বলল, দেশের নূতন সরকার হইছে সেই সরকারের কাছে হিসাব দেবে।
ঠিক-বেঠিক এই দুই দলের মাঝামাঝি একজন বলল, কিন্তু এখন এই অস্ত্র দিয়া করবটা কী?
বড় সড়ক দিয়া মিলিটারি আনাগোনা করে তাদের আক্রমণ করব শুনছি।
কামটা কি সহজ?
এখন কি সহজ আর কঠিন দেখার সময় আছে? নাই। যুদ্ধ শুরু হইছে এখন যুদ্ধ করতে হবে। বাচনের আর কুনো উপায় নাই।
তর্ক যখন খুব জমে উঠেছে তখন হঠাৎ আমি বহুদূর থেকে ভেসে আসা গুম গুম একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম মেঘের ডাকের মতো আওয়াজ কিন্তু আকাশে কোনো মেঘ নাই। অন্য কেউ তখনো কিছু শুনতে পায় নাই, সবাই তর্ক করে যাচ্ছে। আমি ছুটে বাইরে এলাম, তখন আরো স্পষ্ট শব্দটা শুনতে পেলাম গুমগুম আওয়াজের সাথে সাথে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমাকে ছুটে বের হতে দেখে আরো কয়েকজন চায়ের স্টল থেকে বের হয়ে এল এবং সবাই তখন বহুদূর থেকে ভেসে আসা গুম গুম শব্দ তার সাথে সাথে গুলির শব্দ শুনতে পেল।
একজন বলল, ইয়া মাবুদ। যুদ্ধ শুরু হইছে মনে লয়।
কেউ কোনো কথা বলল না, সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। আমরা বহুদূর থেকে গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসতে শুনতে লাগলাম। মাঝে মাঝে গুম গুম শব্দ হয় তারপর টানা গুলির শব্দ হতে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য শব্দ কমে আসে তারপর আবার গুলির শব্দ হতে থাকে।
একটু পর আমরা দেখলাম বহুদূর থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে কালো ধোঁয়া আকাশে উঠছে। কোথায় আগুন লেগেছে কে জানে।
ঠিক কোথায় কী হয়েছে কেউ জানে না, তাই সারা দিন ধরে হাজারো রকমের গুজব ভেসে আসতে থাকল। সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গুজবটা এ রকম, বড় সড়কটা দিয়ে মিলিটারিরা আনাগোনা করে। মাসুদ ভাইয়েরা থানা লুট করে রাইফেল নিয়ে সেই সড়কের দুই পাশে অপেক্ষা করছিল। মিলিটারির কয়েকটা গাড়ি যখন সেই সড়ক ধরে যাচ্ছে তখন মাসুদ ভাইয়ের দল তাদের আক্রমণ করেছে। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছে দুই পক্ষের কতজন মারা গেছে কেউ জানে না। কেউ কেউ বলছে শত শত মিলিটারি মারা গেছে, মাসুদ ভাই তার দল নিয়ে সরে গেছে। কেউ কেউ বলছে মিলিটারির পাল্টা আক্রমণে মাসুদ ভাইয়ের দলের সবাই মরে গেছে। মিলিটারি তখন সড়কের দুই ধারে সব গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে।
আমার পেটের ভেতরে কেমন যেন পাক দিতে লাগল। আমি বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম, হেই খোদা। তোমার কসম লাগে, তুমি মাসুদ ভাইরে বাঁচায়ে রাখো। মাসুদ ভাইয়ের দলের সবাইরে বাঁচায়ে রাখো। হেই খোদা—
.
০৯.
দুই-তিন দিন পরে আমরা খবর পেলাম মাসুদ ভাই বেঁচে আছে, তবে তার দলের দুইজন ছেলে মারা গেছে। ছেলে দুইজন আমাদের গ্রামের না, তাই আমরা তাদের চিনতে পারলাম না। একজনের নাম আলতাফ, আরেকজন জসীম। একজন কলেজে পড়ে, আরেকজন মানুষের বাড়ি কামলা খাটে। কলেজের ছাত্র আলতাফ গুলি খেয়েছিল তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে জসীম গুলি খেয়েছে। খবরগুলো সবই লোকজনের মুখে শোনা সত্য-মিথ্যা জানি না।
সপ্তাহ খানেক পরে আমাদের সাথে প্রথমবার মাসুদ ভাইয়ের দেখা হলো। এই দেখাটা হলো একেবারে অন্য রকম। বিকালবেলা আমি আর মামুন কালী গাংয়ের তীর ধরে হাঁটছি তখন হঠাৎ দেখলাম দূর থেকে অনেকগুলো মানুষ লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে আসছে। তাদের সবার হাতে বন্দুক, মানুষগুলোর কোনো পোশাক নেই, বেশির ভাগই লুঙি গেঞ্জি পরে আছে। বেশির ভাগ খালি পা, একজন-দুইজন মাথায় গামছা বেঁধে রেখেছে। আমরা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলাম আর তখন দেখলাম এই দলটার মাঝে মাসুদ ভাইও আছে। মাসুদ ভাইয়ের হাতেও একটা রাইফেল।
