এই তো কয়েক দিনের মাঝেই। বাবা সবকিছু বিক্রি করার চেষ্টা করছে।
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম, যখন জয় বাংলা হবে তখন আবার চলে আসবে না?
জয় বাংলা হবে?
আমি বললাম, একশ বার হবে।
তত দিনে মিলিটারি সবাইরে মেরে শেষ করে দেবে। আমার কাকু শহরে থাকে, তারে মেরে ফেলেছে।
সত্যি?
হ্যাঁ। কাকুর মেয়ে, ষোল-সতেরো বছর বয়স তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
কে ধরে নিয়ে গেছে?
মিলিটারি।
কেন?
নীলিমা কোনো কথা না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকল যেন আমি একটা গাধা!
আমি আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, তখন নীলিমা বলল, ঐ যে তুলসীগাছ দেখছ?
আমি মাথা নাড়লাম। নীলিমা বলল, আমি যদি আর কোনো দিন না আসি তাহলে তুমি ঐ গাছের তলাটা খুঁড়বা।
কেন?
খুঁড়লেই বুঝতে পারবা।
নীলিমা হাত দিয়ে তার চোখ মুছল, বৃষ্টির পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে, সেই বৃষ্টির পানি মুছল নাকি চোখের পানি মুছল, আমি বুঝতে পারলাম না।
.
সপ্তাহ খানেক পরে কোনো একদিন নীলিমা তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেল। খবরটা পেলাম ফালতু মতির কাছে। লতিফা বুবুর বাসার সামনে তার সাথে দেখা হলো, মতি আমাকে থামাল, থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই, তোদের সাথে একটা মালাউনের বেটি পড়ে না?
স্কুলের সাথে বহুদিন কোনো সম্পর্ক নাই, মতির কথাটা বুঝতে আমার একটু সময় লাগল। যখন বুঝতে পারলাম তখন বললাম, নীলিমা?
মতি হাত নেড়ে উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, নীলিমা ধলিমা জানি না। আছে না একজন?
হ্যাঁ। আছে।
খুবই মজার একটা কাণ্ড ঘটেছে এ রকম একটা ভঙ্গি করে মতি বলল, পুরা ফ্যামিলি ইন্ডিয়া ভেগে গেছে।
আমি জানতাম নীলিমারা চলে যাবে, তাই ফালতু মতির কথা শুনে খুব অবাক হলাম না। আমি চুপ করে রইলাম। মতি বলল, সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। এই গেরামে কোনো সমস্যা ছিল? ভেগে গেল কেন?
আমি তখনও কিছু বললাম না। মতি বলল, রাস্তাঘাটে কত বিপদ আপদ, তার মাঝে পুরা ফ্যামিলি নিয়া ভেগে গেল, বিষয়টা কী?
এবারে আমি উত্তর দিলাম, বললাম, হিন্দুদের এখন খুব বিপদ। মিলিটারি আওয়ামী লীগ আর হিন্দু পেলেই মেরে ফেলে।
এইখানে মিলিটারি কই? আছে?
যদি আসে? তখন তো আর পালাতে পারবে না। এই জন্য মনে হয় আগেই চলে গেছে।
ফালতু মতি তার পকেট থেকে একটা বক সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা অর্ধেক সিগারেট বের করে সেটাতে আগুন দিয়ে লম্বা টান দিয়ে বলল, আসল ব্যাপারটা কী জানস?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম জানি না। ফালতু মতি বলল, এই মালাউন হচ্ছে নিমকহারামের মতো। এই দেশে থাকে খায়-দায়-ঘুমায় কিন্তু তার আসল দেশ ইন্ডিয়া। বলে হিন্দুদের একটা কুৎসিত গালি দিল।
আমি কোনো কথা বললাম না। ফালতু মতির সাথে কথা বলার কোনো অর্থ নেই। এই রকম ফালতু মানুষের কথা শুনলেই গা ঘিন ঘিন করে।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে চলে আসছিলাম, মতি আমাকে থামাল, জিজ্ঞেস করল, তোদের চ্যাংড়া মাস্টারের খবর কী?
চ্যাংড়া মাস্টার মানে হচ্ছে মাসুদ ভাই। ফালতু মতি মাসুদ ভাইকে দেখতে পারে না তাই আমি বললাম, ভালো।
চ্যাংড়া মাস্টার নাকি থানা লুট করছে?
ফালতু মতির কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম, বলে কী মতি! থানা লুট?
গেরামের লোকজন নিয়া নাকি থানার সব রাইফেল লুট করে নিছে! হে নাকি মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করব?
আমি এসব কিছুই জানি না, শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, সত্যি?
মতি তার অর্ধেক সিগারেটে যত্ন করে একটা টান দিয়ে বলল, সত্যি-মিথ্যা জানি না। খবর পাইছি। আমি তখন আর দেরি করলাম না, পাকা খবর নেওয়ার জন্য তখন তখনই বলাই কাকুর চায়ের স্টলের দিকে ছুটলাম। শুধু বলাই কাকুই আমাকে পাকা খবর দিতে পারবে। আমি অবশ্যি বেশি দূর যেতে পারলাম না, তার আগেই শুনতে পেলাম কে যেন চিকন গলায় ডাকছে, র, এই রঞ্জু।
তাকিয়ে দেখি লতিফা বুবু। আমি ঘুরে লতিফা বুবুর কাছে গেলাম, লতিফা বুবু বলল, কী ব্যাপার রঞ্জু তোকে আজকাল দেখি না।
দেখবে না কেন, লতিফাবু? এই তো আমি।
গেরামের খবর কী?
ভালো না। আমাদের ক্লাসে পড়ত নীলিমা, মনে আছে?
লতিফা বুবু মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, মনে আছে। শ্যামলা মতন ছোটখাটো মেয়েটা।
পুরা ফ্যামিলি ইন্ডিয়া চলে গেছে।
লতিফা বুবু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আহারে। নিজের দেশ বাড়িঘর ছেড়ে কে যেতে চায়? না জানি এখন কোথায় আছে, কেমন আছে!
আমি কিছু বললাম না, চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। লতিফা বুবু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মানুষের কত কষ্ট। কাজীবাড়ির ছেলেটারে কীভাবে মেরে ফেলল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, বউ-বাচ্চারা এখন কোথায় আছে জানো লতিফাবু?
না। কেউ জানে না। কোনো খোঁজখবর নাই। চাচাজি খোঁজ নিতে গেছেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, চাচাজি এত বুড়া মানুষ কেমন করে খোঁজ নেবেন।
লতিফা বুবু মাথা নাড়ল, বলল জানি না। কিন্তু আর কে যাবে, জোয়ান মানুষ এখন রাস্তাঘাটে বের হয় না। জোয়ান মানুষ দেখলেই মিলিটারি গুল্লি করে দেয়। তাই শুধু বুড়ারা রাস্তাঘাটে বের হয়।
কথাটা মনে হয় সত্যি। জোয়ান মানুষেরা থানা লুট করে সব রাইফেল নিয়ে যায় যুদ্ধ করার জন্য– তাদেরকে মিলিটারিরা তো ভয় পেতেই পারে। আমি মাসুদ ভাইয়ের কথা ভাবছিলাম আর ঠিক তখন লতিফা বুবু বলল, তোদের স্যারের কাছ থেকে আমারে একটা বই এনে দিছিলি, বইটা শেষ হইছে। ফিরত নিয়া যাস।
