দুপুরের পরে যখন গরমটা একেবারে অসহ্য হয়ে ওঠে তখন একদিন নানি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভয় পাওয়া গলায় বলল, ইয়া মাবুদ।
আমিও আকাশের দিকে তাকালাম, এক কোনায় এক চিলতে মেঘ। এটা দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে? আর মেঘ থেকে যদি বৃষ্টি হয় সেটা তো খারাপ না, গরমটা একটু কমবে। আমি নানিকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে নানি?
ঈশান কোণে মেঘ। নিশানা ভালো না। ঝড় আসতাছে। কালবৈশাখী।
শুনে আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল। আমাদের বাড়ির অবস্থা খুবই খারাপ, বড় ঝড় হলে বাড়ি উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করতে লাগলাম যেন মেঘটা কেটে যায়। কিন্তু মেঘটা কেটে গেল না, দেখতে দেখতে সেটা একটা জীবন্ত প্রাণীর মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল, কুচকুচে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল, একটু আগেই যেখানে তীব্র রোদে চারদিক ঝলসে যাচ্ছিল সবকিছু এখন অন্ধকারে ঢেকে যেতে থাকে, মেঘের মাঝে বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে।
নানি উঠানে মরিচ শুকাতে দিয়েছিল, তাড়াতাড়ি সেগুলো তুলে ফেলল। উঠানে দড়ির মাঝে কাপড় শুকাতে দিয়েছিল সেগুলো তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। মোরগ-মুরগিগুলো ভয় পাওয়া গলায় কঁক কঁক করে ডাকতে ডাকতে তাদের খোপের ভেতর ঢুকে যেতে লাগল। আমি বাইরে গরু-ছাগলের ডাক শুনতে পেলাম, মানুষ ছোটাছুটি করছে চিৎকার করে একে অন্যকে ডাকাডাকি করছে।
আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে একটু পরে পরে বিজলি চমকাচ্ছে কিন্তু কোথাও এতটুকু বাতাস নেই। মনে হচ্ছে সবকিছু বুঝি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভয়ংকর কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করে আছে।
প্রথমে একটু দমকা হাওয়ার মতো এল, শুকনো পাতা ধূলিবালি উড়িয়ে নিতে লাগল, তারপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হতে শুরু করল। দেখতে দেখতে বৃষ্টির ফোঁটা বাড়তে থাকে, তার সাথে সাথে প্রচণ্ড বাতাসে সবকিছু উড়িয়ে নেবার মতো অবস্থা হয়ে যায়। নানি চিৎকার করে বলল, র, ঘরের ভেতরে আয়।
আমি ঘরের ভেতরে ঢুকলাম, বাতাস আর বৃষ্টিতে তখন চারপাশ প্রায় লণ্ডভণ্ড হতে শুরু করেছে। গাছগুলো বাতাসের দমকে প্রায় নুয়ে পড়তে শুরু করেছে, গাছের ডালপালা আছড়ে পড়ছে। দেখে মনে হয় গাছগুলো বুঝি জীবন্ত প্রাণী, হাত-পা নেড়ে অনুনয়-বিনয় করে ঝড়ের হাত থেকে মুক্তি চাইছে।
আমাদের ছনের ঘর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল, মনে হলো যেকোনো মুহূর্তে বুঝি বাতাসে উড়ে যাবে। আমরা মানুষের চিৎকার শুনতে পেলাম, অনেকে আজান দিতে শুরু করেছে। ভোলা দরজা দিয়ে পানির ঝাঁপটা এসে আমাদের ভিজিয়ে দিতে লাগল। গাছের ডাল ভেঙে পড়তে লাগল। কাছাকাছি কোনো বাড়ি থেকে টিনের ছাদ উড়ে গেল, আমরা তার বিকট শব্দ শুনতে পেলাম।
ঝড় বাড়তেই লাগল, আমার মনে হতে লাগল আমাদের বাড়িটা বুঝি উড়িয়েই নেবে, কিংবা চারপাশে বড় বড় গাছ, তার কোনো একটা হয়তো আমাদের বাড়ির ওপর ভেঙে পড়বে।
কতক্ষণ ঝড় হচ্ছিল জানি না, মনে হচ্ছিল কখনো বুঝি আর এই ঝড় থামবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝড় কমে এল। এতক্ষণ ক্রমাগত বিজলি চমকে গেছে কিন্তু মেঘের ডাক শুনতে পাইনি। এখন হঠাৎ করে বিকট শব্দে বাজ পড়ার শব্দ শুনতে লাগলাম। নানি চিৎকার করে কিছু একটা বলল, মেঘ বৃষ্টি ঝড়ের শব্দে নানির কথা শুনতে পারলাম না। আমি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম, কী বলতেছ, নানি?
নানি চিৎকার করে বলল, আর ভয় নাই। মেঘ ডাকতাছে।
মেঘ ডাকলে কী হয়?
ঝড় কমে যায়।
সত্যি সত্যি ঝড় কমে এল, কিন্তু বৃষ্টি থামল না। ঝরঝর করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হতেই লাগল। ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি দেখার জন্য আমি বৃষ্টির মাঝেই বের হয়ে গেলাম।
চারদিকে গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে। মাস্টারবাড়ির টিনের ছাদ উড়ে একটা বড় তেঁতুলগাছে ঝুলে আছে। বাড়ির লোকজন চিৎকার করে দৌড়াদৌড়ি করছে। আমি হেঁটে হেঁটে হিন্দুপাড়ার দিকে এলাম, এখানে কয়েকটা বাড়ি পড়ে গেছে, একজন মহিলা ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে। আমি যখন চলে আসছিলাম তখন নীলিমাকে দেখলাম, ভিজে চুপসে হয়ে সে একটা বাছুরের গলা ধরে টেনে আনছে। আমাকে দেখে সে দাঁড়িয়ে গেল। এমনিতে কখনো আমার সাথে কথা বলে না কিন্তু আজকে কথা বলল, রঞ্জু।
হ্যাঁ।
তুমি এইখানে?
হ্যাঁ। ঝড়ে কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেখতে বের হয়েছি।
আমাদের গোয়ালঘরটা পড়ে গেছে।
সত্যি?
হ্যাঁ। ঐ দেখ– নীলিমা হাত তুলে দেখাল। সত্যি একটা ছনের ঘর উবু হয়ে পড়ে আছে।
গরুগুলি ঠিক আছে?
নীলিমা মাথা নাড়ল, বলল, বাবা সময়মতো গরুর দড়ি কেটে গরু ছেড়ে দিয়েছে।
বড় ঝড় হলে গোয়ালঘরের গরু ছেড়ে দিতে হয়, তা না হলে ঘরে চাপা পড়ে গরু মরে যায়। মুসলমান বাড়িতে গরু মারা গেলে শুধু ক্ষতি হয়। হিন্দুবাড়িতে গরু মারা গেলে শুধু ক্ষতি হয় না, অনেক পাপ হয়।
আমি যখন চলে আসছি তখন নীলিমা বলল, রঞ্জু, আমি একটা কথা বলি, তুমি কাউরে বলবা না।
আমি একটু অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম, কী কথা?
আগে বলো কাউরে বলবা না। ভগবানের কিরা।
ঠিক আছে বলব না। কী কথা?
নীলিমা নিচু গলায় বলল, আমরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি।
ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছ?
হ্যাঁ। এই দেশে হিন্দুরা আর থাকতে পারবে না।
আগে হলে আমি বলতাম কেন থাকতে পারবে না? এখন আর বলি, বলাই কাকু আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে এই দেশে কেন হিন্দুরা থাকতে পারবে না। আমি কিছুক্ষণ নীলিমার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, কেন জানি আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কবে যাবা?
