লতিফা বুবু কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। মনে হয় খবরটা লতিফা বুবু আগেই শুনেছে। আমি বললাম, আমি ভাবছিলাম ঢাকা দখল হবে। এখন তো মনে হয় হবে না।
লতিফা বুবু বলল, দেশের অবস্থা খুব খারাপ। কাজীবাড়ির বড় ছেলেটা অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার ছিল, তারে মেরে ফেলেছে।
আমি মাত্র সেইদিন কাজীবাড়ি থেকে ফুল চুরি করেছি, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি। খবর আসছে।
কাজীবাড়ি আমাদের কাঁকনডুবি গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত পরিবার। এই বাড়ির ছেলেমেয়ে সবাই শিক্ষিত। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই বাড়ির যে বিড়ালটা আছে সেটাও মনে হয় অ আ ক খ পড়তে পারে। সবাই শিক্ষিত হওয়ার কারণে একটা সমস্যা, বাড়িতে কেউ থাকে না। দুই বুড়াবুড়ি বাবা-মা, দূর সম্পর্কের আত্মীয় একজন কাজের মানুষ, ঘরবাড়ি দেখার জন্য দুইজন বয়স্ক মহিলা ছাড়া আর কেউ নাই। সবাই ঢাকা-চিটাগাং-খুলনা থাকে। ছোট ছেলেটা নাকি জার্মানি চলে যাবে। মাঝে মাঝে কোনো ঈদে কাজীবাড়ির ছেলেমেয়েরা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়িতে আসে। সবাই শিক্ষিত বড়লোক, তাদের ছেলেমেয়েরাও টিসটাস–তাই আমাদের সাথে কথাবার্তা বলে না। নিজেরা নিজেরা থাকে আমরা দূর থেকে তাদের দেখি।
কাজীবাড়ির ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটার কথা আমার খুব ভালো মনে আছে, ইটের নিচে চাপা পড়ে থাকা ঘাসের মতো ফর্সা, মাথায় টাক, কালো চশমা, খুবই গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তার দুটি মেয়ে, ছোট মেয়েটা আমাদের বয়সী, বড়জন লতিফা বুবুর বয়সী। কিন্তু তারা খুবই অহংকারী। আমাদের সাথে কোনো দিন কথা হয় নাই। মিলিটারি এখন এই দুইজন অহংকারী মেয়ের বাবাকে মেরে ফেলেছে। তাদের এখন কী হবে? কোথায় থাকবে, কী করবে?
লতিফা বুবুও জানে না কী হবে। লতিফা বুবুর মা কাজীবাড়িতে গিয়েছিল, বুড়িমা নাকি একটু পরে পরে ফিট হচ্ছে। ছেলেকে মেরে ফেলার পর দুই মেয়ে নিয়ে ছেলের বউ কোথায় আছে কেউ জানে না।
লতিফা বুবু দেশের আরও কিছু খবর দিল, তাদের বাড়িতেও একটা রেডিও আছে, সেই রেডিওতে খবর শুনে জেনেছে। যশোর-কুষ্টিয়া বগুড়া-খুলনা এইসব জেলায় পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে বাঙালিদের ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মিলিটারিরা হেরে গিয়েছিল, তারপর পাকিস্তানিরা প্লেন দিয়ে বোমা ফেলেছে তখন বাঙালিরা আর টিকতে পারে নাই। এখন আস্তে আস্তে সারাদেশই মিলিটারি দখল করে ফেলছে।
শুনে আমার খুবই মন খারাপ হলো। একদিনে তিনটা খারাপ খবর, প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে অ্যারেস্ট করার খবর, তারপর কাজী বাড়ির ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে মেরে ফেলার খবর, এখন সারা দেশ মিলিটারি দখল করে ফেলছে সেই খবর।
আমি খুবই মন খারাপ করে বাড়ি এলাম। কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।
প্রত্যেক দিন বাড়ি এসে আমি নানিকে সব খবর দিই। আজকেও দিলাম, কাজীবাড়ির বড় ছেলের খবরটা নানি আগেই পেয়ে গিয়েছিল–এই গ্রামের যেকোনো খবর নানি কীভাবে কীভাবে জানি সবার আগে পেয়ে যায়। তবে বঙ্গবন্ধুর অ্যারেস্টের খবর আর আস্তে আস্তে পাকিস্তানি মিলিটারি সারা দেশ দখল করে ফেলার খবরটা নানি পায় নাই। খবরটা শুনেও নানির খুব একটা দুশ্চিন্তা হলো বলে মনে হলো না। আমি বললাম, নানি, এটা খুবই দুশ্চিন্তার খবর।
নানি বলল, যাদের দুশ্চিন্তা করার দরকার তারা দুশ্চিন্তা করুক। আমাগো এত দুশ্চিন্তার কী আছে?
পাকিস্তানি মিলিটারি যদি আসে তখন কী হবে?
পাকিস্তানি মিলিটারির আর কাম নাই তারা এই গেরামে আসবে। এইখানে এসে তারা কী করবে? কী আছে এই গেরামে?
কথাটা সত্যি। আসলেই এই গ্রামে কিছুই নাই। কয়টা মানুষ, কয়টা গরু-ছাগল আর কী আছে?
নানি আমাকে ভাত বেড়ে দিল। বেগুন ভাজি, মাগুর মাছ আর ডাল। শেষে দুধ-ভাত। আমি খুবই তৃপ্তি করে খেলাম, নানি পাশে বসে বসে আমার খাওয়া দেখল, যেদিন থেকে আমার খিদে বেড়ে গেছে সেদিন থেকে নানি খুবই মনোযোগ দিয়ে আমার খাওয়া লক্ষ্য করে।
খেতে খেতে আমি নানিকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা নানি তুমি একটা কথা বলতে পারবা?
কী কথা?
ধর্মের কথা।
নানি বলল, আমি কি ধর্মের কথা জানি? ধর্মের কথা জানে মুন্সি মাওলানারা। তবু শুনি তোর কথা।
আমি বললাম, মতি বলে বিপদের সময় হিন্দু মানুষদের সাহায্য করলে কোনো সওয়াব হয় না। শুধুমাত্র মুসলমানদের সাহায্য করলে সওয়াব হয়। এই কথা কি সত্যি?
নানি হতাশভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এই মইত্যা হারামজাদা হচ্ছে বেকুবের বেকুব! এইটা একটা কথা হলো? বিপদের কি হিন্দু-মুসলমান আছে? বিপদের সময় একটা কুত্তা-বিলাইকে সাহায্য করলেও আল্লাহপাক খুশি হন। আর হিন্দুরা হচ্ছে মানুষ।
আমি বললাম, আমিও তাই বলি।
নানি বলল, কেমন করে এই রকম কথা বলল মইত্যা হারামজাদা! তারপর নানি মতিকে গালাগাল করতে লাগল। কী অসাধারণ সেই গালাগাল। শুনতেই ভালো লাগে।
.
০৮.
এইবারে খুবই গরম পড়েছে। বৈশাখ মাস গরম পড়তেই পারে কিন্তু এই গরমটা কেমন জানি অন্য রকম। একটু বেলা না হতেই সূর্যটা চড় চড় করে মাথার ওপর উঠে কেমন যেন আগুন ছড়াতে থাকে। আকাশে মেঘের চিহ্ন নাই, সারা গ্রাম কেমন যেন ধিকি ধিকি করে জ্বলতে থাকে। গরু-ছাগলগুলো ছায়ার মাঝে নির্জীবের মতো বসে থাকে। আমাদের ছনের ঘর তার ভেতরেই আগুনের গরম, গ্রামের মাঝে যারা বড়লোক, টিনের ঘরে থাকে, তাদের কী অবস্থা কে জানে।
