সেই ভয়ংকর গল্প শুনে সবাই শিউরে ওঠে। মায়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “আফা। সবুজ ভাইও কী ভূত হইছে?”
জেবা মাথা নাড়ল, বলল, “মনে হয় হইছে।”
“হে কী আয়া আমাগো ডর দেহাইব?”
জেবা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, বলল, “মনে লয় আইতেও পারে। তার হেরোইনের প্যাকেট খুঁজতি আইতে পারে।”
জালাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, সবুজ যদি তার হেরোইনের প্যাকেট খুঁজতেও আসে, আর কোনোদিন সেটা খুঁজে পাবে না।
.
রাত্রিবেলা সবাই সারি সারি শুয়ে পড়ল। শীত থেকে বাঁচার জন্যে তারা বস্তা জোগাড় করেছে, তার ভেতরে খবরের কাগজ বিছিয়ে সেখানে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকে। প্রচণ্ড শীতে ঘুম আসতে দেরি হয়, পাশাপাশি শুয়ে একজনের শরীরের উত্তাপ আরেকজন ভাগাভাগি করে নিয়ে কোনোমতে ঘুমানোর চেষ্টা করে।
গভীর রাতে জালালের ঘুম ভেঙে যায়, জেবা তাকে ডেকে তোলার চেষ্টা করছে। চোখ খুলে বলল, “কী হইছে?”
“কলেজের ছেইলে-মেয়েরা আইছে।”
জালাল তখন ধড়মড় করে উঠে বসল, “কম্বল আনছে?”
“মনে লয়।”
প্রত্যেক বছরই যখন খুব শীত পড়ে তখন কলেজের ছেলেমেয়েরা শীতের। কাপড়, কম্বল এসব নিয়ে আসে, পথে-ঘাটে ঘুমিয়ে থাকা মানুষদের দেয়। কখনোই বেশি থাকে না সবাইকে দেওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। তাই কার আগে কে নিতে পারে সেটা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায়।
জালাল তার বস্তা থেকে বের হবার আগেই কলেজের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে আসে। একজন বলল, “এইখানে কয়টা বাচ্চা আছে।”
আরেকজন বলল, “গুড। এটা চমৎকার একটা ছবি হবে।”
কলেজের ছেলেমেয়েগুলো তাদের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। কম বয়সী সুন্দর একটা মেয়ে একটা কম্বল বের করে তাদের দিকে এগিয়ে দেয়। জেবা কম্বলটা ধরে রাখল তখন একজন একটা ছবি নিল। ফ্লাশের আলোতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়–যে ছবি তুলেছে সে ছবিটা দেখে বলল, “বিউটিফুল!”
জালাল ব্যস্ত হয়ে বলল, “আমারে–আমারে একটা।”
সুন্দর মেয়েটা আরেকটা কম্বল বের করে তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল তখন ক্যামেরা হাতে ছেলেটা তাকে থামাল, বলল, “না না, এখানে আর দিও না। স্টেশনের অলরেডি দুইটা ছবি হয়ে গেছে। এখন ফুটপাথের জন্যে রাখ। ফুটপাথের ছবি তুলতে হবে।”
জালাল বলল, “খোদার কসম লাগে–একটা দেন–”
ছেলেটা মাথা নাড়ল, বলল, “আর দেওয়া যাবে না।”
তারপর ফুটপাথে কম্বল দেওয়ার”বিউটিফুল” আরেকটা ছবি তোলার জন্যে ছেলেমেয়েগুলো হইহই করে চলে যেতে লাগল।
জালাল মনমরা হয়ে দাঁতের নিচ দিয়ে তাদের একটা গালি দেয়। জেবা হি হি করে হাসল, বলল, “জালাইল্যা-তোরেও মাঝে মাঝে এই কম্বল দিমু। বেজার হইস না।”
জালাল তবুও বেজার হয়ে থাকল। ক্যামেরায় তার ছবিটা যদি সুন্দর আসত তা হলে তাকেই নিশ্চয়ই কম্বলটা দিত!
জেবা অবশ্যি বেশিদিন কম্বলটা রাখতে পারল না। দুই সপ্তাহের মাঝে সেটা চুরি হয়ে গেল।
.
০৮.
মায়াকে দেখে জালাল অবাক হয়ে বলল, “তোর ঠোঁটে কী হইছে?”
মায়ার ঠোঁট এবং তার আশেপাশের বেশ খানিকটা অংশ কটকটে লাল, সে তার কটকটে লাল ঠোঁট ফাঁক করে ফোকলা দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলল, “লিপিস্টিক দিছি।”
বড়লোকের মেয়ে কিংবা বউয়েরা ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, তার সাথে নিশ্চয়ই তাদের মুখে তারা আরো অনেক কিছু দেয়, যে কারণে তাদের দেখতে পরীর মতো সুন্দর দেখায়। মায়ার বেলায় সেটা ঘটেনি, তাকে দেখতে খানিকটা ভয়ংকর দেখাচ্ছে। মায়া জীবনে কখনো ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়নি, কেমন করে দিতে হয় সেটা জানে না। তা ছাড়া এটা দেওয়ার জন্যে মনে হয় আয়নার দরকার হয়, কোথায় লিপস্টিক লাগানো হচ্ছে সেটা জানা থাকলে ভালো। মায়ার কোনো আয়না নেই, সে আন্দাজে দিয়েছে তাই শুধু ঠোঁট না–ঠোঁটের আশেপাশে বিশাল জায়গা জুড়ে লিপস্টিক থ্যাবড়া হয়ে লেগে আছে।
জালাল জিজ্ঞেস করল, “লিপস্টিক কই পাইছস?”
“একটা বেটি দিছে।”
একজন মহিলা মায়ার মতো ছোট একটা মেয়েকে এতো জিনিস থাকতে লিপস্টিক কেন দিয়েছে জালাল বুঝতে পারল না, সেটা নিয়ে সে মাথাও ঘামাল না। মায়ার অবশ্যি অনেক উৎসাহ তাই সে তার প্যান্টে গুঁজে রাখা লিপস্টিকটা বের করে জালালকে দেখাল। ঢাকনা খুলে নিচে ঘোরাতেই টকটকে লাল লিপস্টিকটা লম্বা হয়ে বের হয়ে আসে, আবার অন্যদিকে ঘোরাতেই সেটা ভেতরে ঢুকে যায়। মায়া কয়েকবার লিপস্টিকটা বের করে আবার ভিতরে ঢুকিয়ে দেখাল। জালাল দেখল, এটা সত্যি সত্যি লিপস্টিক। কোনো একজন মহিলা সত্যি সত্যি মায়াকে একটা লিপস্টিক দিয়েছে।
ঠোঁটে লিপস্টিক লাগানোর কারণেই কি না কে জানে মায়ার আজকের আয় রোজগার অন্যদিন থেকে বেশি হল।
মায়ার লিপস্টিক দেখে জালাল যেরকম অবাক হয়েছিল, কয়দিন পর ঠিক সেরকম অবাক হল জেবার নেলপালিশ দেখে। একদিন রাতে ঘুমানোর আগে আগে জালাল অবাক হয়ে দেখল জেবা গভীর মনোযোগ দিয়ে তার নখে নেলপালিশ লাগাচ্ছে। জালাল জিজ্ঞেস করল, “নউখে কী লাগাস?”
জেবা মুখ গম্ভীর করে বলল”নেইল ফালিশ।”
“কই পাইলি?”
“আমারে দিছে।”
“কে দিছে?”
“একজন বেটি।”
জালাল বলল, “একজন বেটি তরে নেইল ফালিশ কেন দেয়?”
“দিলে তর সমিস্যা আছে?” জেবা মুখ শক্ত করে বলল, “দুই টেহি আফা আমাগো সবাইরে দুই টেহা কইরা দেয় না?”
কথাটা সত্যি, কোনো কিছুই তারা সহজে পায় না। আবার দুই টেকি আপার মতো মানুষও আছে যারা কিছু না চাইতেই দেয়। জালাল জিজ্ঞেস করল, “মায়ারে
