যে বেটি লিপিস্টিক দিছে তরে কী সেই বেটিই নেল পালিশ দিছে?”
জেবা মাথা নাড়ল, বলল, “হ।”
“আমাগো কিছু দিব না?”
“হেইডা আমি কী জানি?”
“আরেকদিন আইলে আমাগো কথা কইস।”
জেবা বলল, “কমু। তোগো সবাইরে যেন একটা লিপিস্টিক দেয়। তারপর জেবা হি হি করে হাসতে থাকে।
যেই মহিলা মায়াকে লিপস্টিক আর জেবাকে নেল পালিশ দিয়েছে তার সাথে জালালের দেখা হল দুইদিন পর। প্লাটফর্মের এক মাথায় সেই মহিলা মায়া আর জেবার সাথে কথা বলছে। মায়ার হাতে ঢলঢলে কয়েকটা চুড়ি, জেবার গলায় একটা প্লাস্টিকের মালা। কিছু একটা নিয়ে কথা হচ্ছে এবং সেই কথা শুনে মায়া আর জেবা দুইজনই হি হি করে হাসছে। মহিলাটির বয়স বেশি না, শক্ত-সমর্থ গঠন, পান খেতে খেতে পিচিক করে প্লাটফর্মের পাশের দেয়ালে পানের পিক ফেলে কী একটা বলল তখন মায়া আর জেবা দুইজনই আবার হেসে গড়িয়ে পড়ল।
জালালকে আসতে দেখে তিনজনই হাসি থামিয়ে দেয়। জালাল কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হইছে? হাসির ব্যাপার কী হইছে?”
মহিলাটি মুখ শক্ত করে ফেলল, মায়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল জেবা ঝপ করে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “তোর হেইডা জাননের দরকার কী?”
এরকম একটা সহজ প্রশ্নের এরকম কঠিন একটা উত্তর শুনে জালাল একটু থতমত খেয়ে যায়। সে আস্তে বলল, “জাননের কুনো দরকার নাই, এমনি জিগাইলাম।”
জালাল মহিলাটার দিকে তাকাল, পান খেয়ে দাঁতগুলো কালচে হয়ে আছে, মুখের কষে পানের পিকের চিহ্ন। পান চিবুতে চিবুতে মহিলাটি জালালের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল। জালাল বলল, “মায়া আর জেবারে এতো কিছু দিলেন, আমাগো কিছু দিবেন না?”
মহিলাটি পিচিক করে আরেকবার পানের পিক ফেলে বলল, “তরে কেন দিমু?”
“হ্যাগো কেন দিলেন?”
“হ্যাগো ভালা পাইছি হের লাগি দিছি।”
“আমাগো ভালা পান নাই?”
মহিলা মাথা নাড়ল, বলল, “না।” আর এই কথা শুনে মায়া আর জেবা হি হি করে হেসে উঠল।
জালাল তখন আর সময় নষ্ট করল না। মায়া আর জেবাকে সেই মহিলার সাথে রেখে সে ফিরে যেতে শুরু করল। খানিক দূর যেতেই সে আবার তিনজনের হাসি শুনতে পায়। সে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, তার দিকে তাকিয়েই হাসছে, কী নিয়ে হাসছে কে জানে। অকারণেই জালালের মেজাজটা গরম হয়ে গেল।
.
সন্ধ্যাবেলা দেখা গেল মায়া আর জেবা খুব যত্ন করে নিজেদের নখে নেল পালিশ দিচ্ছে। শুধু তাই না তারা চিরুণী দিয়ে তাদের চুল আঁচড়াল এবং একটা আয়না দিয়ে নিজেদের চেহারা দেখল। জালাল জিজ্ঞেস করল, “আয়না কই পাইলি?”
“জরিনি খালা দিছে।”
কিছু বলে না দিলেও জালাল বুঝতে পারল যে মহিলাটি তাদের লিপস্টিক নেল পালিশ চুড়ি আর মালা দিয়েছে সেই হচ্ছে জরিনি খালা। জালাল জিজ্ঞেস করল, “তোগো জরিনি খালার মতলবটা কী?”
“কুনো মতলব নাই।”
“আছে।”
“নাই।”
“মতলব না থাকলে তোগো লিপিস্টিক নেইল ফালিশ আয়না চিরুণী দেয় কেন? আমাগো তো দেয় না।”
জেবা মুখ শক্ত করে বলল, “তোগো ভালা পায় না হের লাগি দেয় না।”
জালাল বড় মানুষের মতো বলল, “হেইডাই চিন্তার বিষয়। আমরা হগগলে এক লগে থাকি কিন্তু তোর জরিনি খালা খালি তোগো দুইজনরে ভালা পায়, আর কাউরে ভালা পায় না।”
জেবা কোনো উত্তর না দিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল। এতোদিন তারা সবাইকে রুক্ষ উশকুখুশকো লাল চুলে দেখে এসেছে–হঠাৎ করে পরিপাটি চুল দেখে জেবা আর মায়াকে কেমন জানি অচেনা অচেনা লাগে।
জালাল বলল, “তোরা কিন্তু সাবধান।”
জেবা মুখ ভেংচে বলল, “কীসের লাগি সাবধান?”
“তোর জরিনি খালা কিন্তু ছেলেধরা হতি পারে।”
মায়া ভয়ে ভয়ে বলল, “ছেলেধরা হলি সমস্যা কী? আমরা তো মেয়ে।”
জালাল হি হি করে হাসল, বলল, “ছেলেধরা খালি ছেলেদের ধরে না, মেয়ে ছাওয়ালরেও ধরে।”
মায়া এইবার ভয়ে ভয়ে জেবার দিকে তাকাল, বলল, “আফা, জরিনি খালা কি ছেলেধরা?”
জেবা বলল, “ধুর! জরিনি খালা ছেলেধরা হবি ক্যান?”
“জরিনি খালা যে হুই সময় বলল আমাগো-” মায়ার কথা শেষ হবার আগে জেবা মায়ার মুখ চেপে বলল, “চোপ! কিছু বলবি না।”
জালাল বলল, “কী বলিছে? তোগো জরিনি খালা কী বলিছে?”
জেবা মুখ শক্ত করে বলল, “কিছু বলে নাই। তোগো সেটা শুনারও দরকার নাই।”
.
এর পরের কয়েকদিন মায়া আর জেবা একটু আলাদা আলাদা থাকল, অন্যদের সাথে বেশি কথা বলল না। এমনকি বৃহস্পতিবার যখন দুই টেকি আপা সবাইকে দুই টাকা করে দিল তখন তারা সেটা নিয়েই আলাদা হয়ে গেল। ট্রেন এলে প্যাসেঞ্জারদের সাথে বেশি দৌড়াদৌড়িও করল না। মাঝে মাঝে তাদের জরিনি খালার সাথে গুজগুজ ফুসফুস করতেও দেখা গেল। জালাল স্পষ্ট বুঝতে পারল মায়া আর জেবা জরিনি খালার সাথে কোনো একটা কিছু করতে যাচ্ছে–কী করতে যাচ্ছে সে এখনো বুঝতে পারছে না, কিন্তু কিছু একটা যে করবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই।
জালালের সন্দেহে কোনো ভুল নাই। দুইদিন পরে যখন জয়ন্তিকা ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে আর জালাল ট্রেনের পাশে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে তখন সে হঠাৎ করে দেখল জরিনি খালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। জালাল চমকে উঠল আর অবাক হয়ে দেখল ট্রেনের ভিতর জরিনির পিছনে মায়া গুটিশুটি মেরে বসে আছে-তার পাশে আরেকজন, চেহারা দেখতে না পারলেও জালালের বুঝতে বাকি থাকল না সেটা হচ্ছে জেবা। জরিনি খালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাটফর্মের দিকে তাকিয়ে রইল আর ঝিক ঝিক শব্দ করে ট্রেনটা জালালের সামনে দিয়ে চলে যেতে লাগল।
