ইভা কী করবে বুঝতে না পেরে একটা নিশ্বাস ফেলে সরে আসে, চাপা একটা বোটকা গন্ধ, বেশিক্ষণ থাকাও সম্ভব না। জালাল বলল, “কামটা ঠিক হয় নাই।”
“কোন কাজটা ঠিক হয় নাই?”
“আফনের এতো সোন্দর চাদরটা ফাগলিরে দিলেন। ফাগলি এইটারে নষ্ট করব।”
“গায়ে দেবে। গায়ে দিলে তো নষ্ট হয় না। ব্যবহার হয়।”
“কিন্তুক আফনের চাদর–”
“আমার আরো চাদর আছে। এটা পুরানো একটা চাদর এমন কিছু না।”
ইভা তারপর রেল লাইন পার হয়ে আবার তার নিজের পাটফর্মে ফিরে আসে, জালালও তার পিছু পিছু আসে। হাঁটতে হাঁটতে ইভা জিজ্ঞেস করল, “তোমার মিনারেল ওয়াটারের বিজনেস কেমন হচ্ছে?”
জালাল উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করল। একটু পরে মাথা তুলে বলল, “আফা, আফনে কী আমারে ঘিন্না করেন?”
“ঘেন্না? কেন, ঘেন্না করব কেন?”
“এই যে আমি চুরি-চামারি করি। ভুয়া মিনারেল ওয়াটার বেচি।”
ইভা জালালের মুখের দিকে তাকাল, তার কাচুমাচু অপরাধী মুখ দেখে হঠাৎ তার কেমন জানি এক ধরনের মায়া হয়। এই বাচ্চাগুলোর এখন বাবা-মা ভাইবোনের সাথে থাকার কথা, স্কুলে লেখাপড়া করার কথা, রাত্রে বাসার ভেতরে ছাদের নিচে ঘুমানোর কথা। তার বদলে এরা খোলা আকাশের নিচে থাকে, একটুখানি পেট ভরে খাবার জন্যে চুরি-চামারি করে, ঝগড়াঝাটি করে আবার সেই জন্যে নিজেকে অপরাধীও ভাবে!
ইভা জালালের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “না। আমি তোমাকে মোটেও ঘেন্না করি না।” তারপর কী মনে হল কে জানে, এই বাচ্চাটা কথাটার অর্থ ভালো করে বুঝবে না জেনেও বলল, “আমি জানি তুমি যদি ভালো করে বেঁচে থাকার সুযোগ পেতে তা হলে তুমি নিশ্চয়ই চুরি-চামারি করতে না। ভুয়া মিনারেল ওয়াটার বিক্রি করতে না।”
জালাল এই গুরুগম্ভীর কথাটা বুঝতে পেরেছে কি না কে জানে, কিন্তু ইভা দেখল সে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ছে।
ইভা জালালের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা-মা ভাইবোন নেই?”
“খালি মা আছে।”
“মায়ের কাছে যাও না?”
“গেছিলাম–” তারপর যে কথাটা সে আর কাউকে বলে নাই সেটা ইভাকে বলে ফেলল, “আমার মায়েরে জুরে বিয়া দিয়া দিছে।”
“তোমার মাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে?”
“জে।”
ইভা কী বলবে বুঝতে পারল না। চুপ করে জালালের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জালাল বলল, “হেইদিন মায়ের সাথে দেখা কইরা আইলাম।”
“কেমন আছেন তোমার মা?”
“ভালা নাই।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি মায়ের মন ভালা রাখনের লাগি তার লগে মিছা কথা কইয়া আইছি।”
“কী মিছে কথা বলেছ?”
“এই তো–” বলে জালাল একটু লজ্জা পেয়ে গেল।
”শুনি কী মিছে কথাটা বলেছ।”
“আমি মায়েরে কইছি একজন বড়লোক বেটি আমারে নিজের ছাওয়ালের মতো পালে-” কথা শেষ করে জালাল অপ্রস্তুতভাবে হি হি করে হাসল।
“তোমার মা তোমার কথা বিশ্বাস করেছে?”
“জে, করছে। আমার মা বোকা কিসিমের। যেইটাই কইবেন সেইটাই বিশ্বাস করে।”
ইভা কী বলবে বুঝতে পারল না, তাই মুখে জোর করে একটু হাসি টেনে এনে মাথা নাড়ল, ঠিক তখন একটা টেলিফোন চলে আসায় ইভাকে কোনো কথা বলতে হল না, সে টেলিফোনটা ধরল। অফিসের একজনের সাথে সে খানিকক্ষণ কাজের কথা বলল। যতক্ষণ সে কথা বলল ততক্ষণ জালাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল। কথা শেষ হবার পর লাজুক মুখে বলল, “আফা। আমারে আফনার মোবাইল নম্বরটা দিবেন?”
ইভা অবাক হয়ে বলল, “মোবাইল নাম্বার? আমার?”
“জে।”
“কেন? কী করবে?”
“এমনিই। নিজের কাছে রাখুম। মাঝে মাঝে আফনেরে ফোন দিমু।”
“আমাকে ফোন দেবে? কোত্থেকে?”
“মোবাইলের দোকান থিকে।”
ইভা একটু হাসল তারপর ব্যাগ থেকে নিজের একটা কার্ড বের করে উল্টোপিঠে তার মোবাইল টেলিফোনের নম্বরটা লিখে জালালের দিকে এগিয়ে দিল। জালাল কার্ডটা উল্টোপাল্টে দেখে নাম্বারটা পড়ার চেষ্টা করল।
ইভা জিজ্ঞেস করল, “তুমি লেখাপড়া জান?”
“একটু একটু।”
ইভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে যেখানে কাজ করে সেখানে লেখাপড়ার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করার উপর তাকে মাঝে মাঝেই বক্তৃতা দিতে হয়। এই বাচ্চাটির সামনে সে যদি লেখাপড়ার গুরুত্ব নিয়ে সেরকম একটা বক্তৃতা দেয় তা হলে সেটা কি একটা বিশাল ঠাট্টার মতো শুনাবে না?
এরকম সময় দূর থেকে ট্রেনটার একটা হুইসিল শোনা গেল। সাথে সাথে জালাল চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে সেলুট দেওয়ার ভঙ্গি করে ইভাকে বলল, “আফা। ট্রেন আইছে। আমি যাই।”
ইভা বলল, “যাও।”
সাথে সাথে জালাল দৌড়াতে থাকে। ইভা দেখল ট্রেনটা প্লাটফর্মে ঢোকা মাত্র জালাল কীভাবে লাফিয়ে চলন্ত ট্রেনটাতে উঠে পড়ল।
.
সন্ধ্যেবেলা শীতটা মনে হয় আরো তীব্রভাবে নেমে এলো। স্টেশনের বাচ্চারা তখন শরীর গরম করার জন্যে একটু আগুন জ্বালিয়ে নেয়। সবাই মিলে চারিদিক থেকে কাঠকুটো, কাগজ, গাছের শুকনো ডাল কুড়িয়ে আনে, তারপর সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দেখতে দেখতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে আর সবাই গোল হয়ে বসে আগুন পোহাতে থাকে।
আগুনে হাত-পা গরম করতে করতে মায়া জেবাকে বলল, “আফা, একটা গফ করবা।”
জেবা খুশি হয়ে বলল, “কীসের গফ?”
মায়ার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে পেত্নীর গল্প তাই সে বলল, “পেততুনীর।”
“ডরাইবি না তো?”
“না। ডরামু না। কও।”
তখন জেবা সবাইকে একটা পেত্নীর গল্প বলে। তার গ্রামের বাড়িতে পাশের বাড়ির একটা বউ কীভাবে গলায় দড়ি দিয়ে মরে পেত্নী হয়ে গিয়েছিল সেই গল্প। এরপর থেকে অমাবস্যার রাতে সেই পেত্নী বাশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ যখন সেই বাশঝাড়ের নিচে দিয়ে যেত তখন একটা বাঁশ নিচু হয়ে তার পথ আটকে দিত। মানুষটা যখন ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত তখন পিছন দিকে আরো একটা বাঁশ নেমে এসে তাকে দুই বাঁশের মাঝখানে আটকে ফেলত। ভোরবেলা দেখা যেত মানুষটা মরে পড়ে আছে। ঘাড়টা ভাঙা আর সারা শরীরে কোনো রক্ত নাই, পেত্নী শুষে সব রক্ত খেয়ে নিয়েছে।
