তিন-চার বছরের কুচকুচে কালো একটা ছেলে দুই নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, তার শরীরে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। এই ভয়ংকর শীতে পুরোপুরি উদোম গায়ে এই বাচ্চাটি উদাসমুখে দাঁড়িয়ে আছে-অবিশ্বাস্য একটি দৃশ্য। ইভা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, এটি কেমন করে সম্ভব? সে এতোগুলো গরম কাপড় পরে ঠকঠক করে কাঁপছে, তার মাঝে এই তিন-চার বছরের বাচ্চা কেমন করে ন্যাংটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে? বাচ্চাটি কার? মা-বাবা কই? তার ঠাণ্ডা লাগে না কেন?
ঠিক এরকম সময় সে দূর থেকে বাচ্চাদের আনন্দধ্বনি শুনতে পেল, “দুই টেকি আপা! দুই টেকি আপা।”
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বাচ্চা তাকে ঘিরে ফেলল। বাচ্চাগুলো নানা ধরনের ময়লা জাব্বাজোব্বা পরে আছে, তবে সবারই খালি পা। ছোট কয়েকজনের নাক থেকে সর্দি ঝুলে আছে। ইভার কাছাকাছি এসে নাকে টান দিয়ে সর্দিটা ভেতরে টেনে নিল, একটু পর আবার সর্দিটা বের হয়ে নাকের সামনে ঝুলতে থাকে, বিষয়টি নিয়ে বাচ্চাগুলোর খুব একটা মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না।
মায়া তার ফোকলা দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলল, “আমরা পেরতম আফারে চিনতি পারি নাই।”
ইভা যেভাবে শীতের জন্যে জাব্বাজোব্বা পরেছে তাকে চেনার কথা না। সে বলল, “কী শীত পড়েছে, দেখেছ?”
বাচ্চাগুলো মাথা নাড়ল, বলল, “জে আপা। অনেক শীত।”
ইভা দুই নম্বর প্লাটফর্মের ন্যাংটা কুচকুচে কালো ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল, “ঐ বাচ্চাটার ঠাণ্ডা লাগে না–এতো শীতে গায়ে কোনো কাপড় নাই, দেখেছ?”
সবাই একসাথে হইহই করে উঠল, বলল, “ঐটা কাউলা।”
“কাউলা? ওর নাম কাউলা?” জেবা মাথা নেড়ে বলল, “হের কুনো নাম নাই।”
“নাম নেই?”
“জে না। এর মা ফাগলি, হেরে কুনো নাম দেয় নাই।”
“মা কোনো নাম দেয়নি?”
“জে না।”
“ওর ঠাণ্ডা লাগে না?”
“জে না, হের ঠাণ্ডা-গরম কিছু নাই। হে কথাও কয় না।”
ইভা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কথাও বলে না?”
“জে না। হেরে কিছু জিগাইলে হে খালি চায়া থাকে।”
“ওর মা কোথায়?”
একজন দূরে সিঁড়ির দিকে দেখাল, “হুই যে ঐখানে থাকে। ফাগলি।”
ইভা জানতে চাইল, “এখন কী আছে?”
বাচ্চাগুলো মাথা নাড়ল, বলল, “জানি না।”
“একটু দেখে আসি।”
ইভা তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে রেল লাইনগুলো পার হয়ে দুই নম্বর প্লটফর্মে গেল। তাকে ঘিরে অন্যান্য বাচ্চারাও সেখানে হাজির হল। কালো বাচ্চাটা এক ধরনের উদাস দৃষ্টিতে তাদের সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইভা একটু কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
বাচ্চাটা কোনো কথা না বলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইভার কথাটা বুঝতে পেরেছে বলে মনে হল না। ইভা আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমার ঠাণ্ডা লাগে না?”
বাচ্চাটি এবারেও কোনো কথা বলল না। মজিদ দাঁত বের করে হি হি করে হাসল, বলল, “এর মা ফাগলি আর হে ফাগল!”
পাগলের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করার সবারই সবসময় একটা অধিকার আছে সেটা প্রমাণ করার জন্যেই মজিদ বাচ্চাটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল এবং সেটা দেখে সবাই আনন্দে হি হি করে হেসে উঠল। ইভা হা হা করে উঠে বলল, “কী হল? কী হল? ওকে ফেলে দিলে কেন?”
ইভা বাচ্চাটাকে তোলার জন্যে এগিয়ে যায় কিন্তু তার আগেই বাচ্চাটা নিজেই উঠে দাঁড়াল। তাকে দেখে মনে হল কিছুই হয়নি এবং চারপাশের লোকজন তার সাথে দেখা হলেই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে সেটাই সে নিয়ম হিসেবে ধরে নিয়েছে।
ইভা মজিদের দিকে তাকিয়ে একটু কঠিন গলায় বলল, “কাজটা ঠিক হয়নি। ছোট একটা বাচ্চাকে শুধু শুধু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে কেন?”
জেবা মজিদকে সাহায্য করার চেষ্টা করল, বলল, “কাউলাকে মারলেও হে দুখ পায় না। আপনি দেখবার চান? দেখামু?”
ইভা হা হা করে উঠল, বলল, “না, না! দেখাতে হবে না।”
শাহজাহান বলল, “হের মা যখন মারে কাউলা কান্দে না।”
“তার মানে না যে তোমরাও ওকে মারবে।”
দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাগুলো মনে হল তার কথা শুনে একটু অবাক, কিন্তু কেউ কিছু বলল না। যে মানুষ দেখা হলেই দুই টাকা দিয়ে দেয় তার কথাগুলো মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুধু জালাল মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”
ইভা জালালের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ওকে দেখে রাখবে?”
দেখে রাখা মানে কী এবং কীভাবে একটা পাগলি মায়ের ছেলেকে দেখে রাখতে হয় জালাল সেটা বুঝতে পারল না। তারপরও সে মাথা নাড়ল, বলল, “রাখমু আপা।–”
“শুধু ওকে না, তোমাদের সবার সবাইকে দেখে রাখতে হবে। বুঝেছ?”
ওরা কে কী বুঝল কে জানে কিন্তু সবাই গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল। ইভা তখন তার ব্যাগ খুলে সবাইকে তাদের পাওনা দুটি টাকা ধরিয়ে দিতে থাকে। পাগলি মায়ের উদোম ছেলেটার দিকেও সে দুই টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দেয়, সাথে সাথে সে খপ করে টাকাটা নিয়ে হাতটা মুঠি করে ফেলল যেন কেউ তার টাকাটা নিয়ে নিতে না পারে।
টাকা পাবার পর একজন একজন করে সবগুলো বাচ্চা এদিক-ওদিক সরে পড়ল শুধু জালাল ইভার কাছাকাছি থেকে গেল। ইভা জালালকে জিজ্ঞেস করল, “এই বাচ্চাটাকে একটা কাপড় দিলে কেমন হয়?”
জালাল মাথা নাড়ল, “লাভ নাই।”
“লাভ নেই?”
“না, হে কিছু বুঝে না।”
“তবু একটু চেষ্টা করে দেখি। কী বল?”
জালাল মাথা নাড়ল। ইভা তখন তার ব্যাগ খুলে সেখান থেকে একটা চাদর বের করে, চাদরটা ভাঁজ করে একটু ছোট করে সে বাচ্চাটার গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিল। ছোট বাচ্চাটা মনে হল বেশ আগ্রহ নিয়ে পুরো ব্যাপারটা লক্ষ করল তারপর শরীর থেকে চাদরটা খুলে নিয়ে সেটাকে ধরে টেনে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ইভা আর জালাল পিছু পিছু গেল, দেখল বাচ্চাটি চাদরটাকে মাটির সাথে ঘষতে ঘষতে টেনে নিয়ে সিঁড়ির নিচের দিকে যাচ্ছে। সেখানে গুটিশুটি মেরে তার মা বসে আছে, শীতে জবুথবু, চোখের দৃষ্টি অপ্রকৃতস্থ। ছোট বাচ্চাটি চাদরটা নিয়ে তার মায়ের গায়ে ফেলে দেয়, তার মা সাথে সাথে চাদরটা তার গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নড়েচড়ে বসে বিড়বিড় করে নিজের মনে কথা বলতে লাগল। তাকে দেখে মনে হল এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে তার তিন-চার বছরের উদোম বাচ্চাটি একটা চাদর এনে তাকে সেটা দিয়ে ঢেকে দেবে। মা’কে চাদর দিয়েই বাচ্চাটি চলে গেল না, গোঙানোর মতো একটা শব্দ করল তারপর মুঠি করে ধরে রাখা দুই টাকার নোটটা তার মায়ের দিকে ছুঁড়ে দিল। মা নোটটা ধরে উল্টেপাল্টে দেখে তার পায়ের নিচে চাপা দিয়ে রেখে আবার কথা বলতে থাকে।
