স্টেশনের প্লাটফর্মে একটা কুকুরকে জড়িয়ে ঘুমায় কথাটা বলতে জালালের লজ্জা করল। তার কী হল কে জানে, হঠাৎ করে বলে ফেলল, “আমি একজনের বাড়িতে থাকি মা।”
“কার বাড়ি?”
একটা মিথ্যা কথা বললে আরো অনেক মিথ্যা কথা বলতে হয়। তাই সে মিথ্যা বলতে শুরু করল, “স্কুলের মাস্টারনি। আমারে নিজের ছেলের মতো দেখে।”
“সত্যি?” আনন্দে মায়ের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।”তোরে আদর করে?”
“অনেক আদর করে।”
“মাস্টারনির জামাই কী করে?”
“ঢাকা শহরে চাকরি করে।”
“বাড়ি থাকে না?”
“না। ছুটি হইলে আহে।”
“খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট হয় না তো?”
“কী বল মা। কুনু কষ্ট নাই। কুনোদিন মাছের ছালুন, কুনোদিন মুরগির গোস্ত–খাওয়ার কুনো কষ্ট হয় না।”
মা জালালের মুখে হাত বুলিয়ে বলল, “এতো খাওয়া-দাওয়া হলে স্বাস্থ্যটা আরো ভালা হয় না কেন?”
“কয়দিন আগে জ্বর হইছিল, হেই জন্যে মনে হয় শুকনা লাগে।”
মা বোকাসোকা মানুষ। কোনো সন্দেহ না করে জালালের কথা বিশ্বাস করে ফেলল। জালাল তখন পলিথিনের ব্যাগ থেকে মায়ের শাড়িটা বের করে দিল, বলল, “মা এইটা আনছি তোমার লাগি।”
মা অবাক হয়ে বলল, “আমার লাগি?”
“হ মা।”
“টেহা কই পাইলি?”
জালাল ইতস্তত করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখন মা নিজেই বলল, “মাস্টারনি কিন্যা দিছে?”
জালাল জোরে জোরে মাথা নাড়ল, বলল, “হ।”
মা শাড়িটা খুলে দেখল, নীল জমিনের উপর কমলা রঙের ফুল ফুল শাড়িটা দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল, “মাস্টারনির মনটা খুব ভালা?”
“হ।”
“তুই মাস্টারনিরে কী ডাকস?”
“খালা।”
“তোরে ছেলের মতো আদর করে–তুই মা ডাকস না কেন?”
“শরম করে।”
“শরমের কী আছে? মা ডাকবি।”
“ঠিক আছে।”
“মাস্টারনির আর ছেলেমেয়ে নাই?”
“আছে, আরো দুইটা মেয়ে আছে।”
“কী নাম?”
একটুও দেরি না করে জালাল বলল, “বড়জনের নাম জেবা, ছোটজন মায়া।”
মা মাথা নাড়ল, বলল, “তাগো সাথে রাগারাগি মারামারি করস না তো?”
জালাল একটু হাসল, বলল, “মাঝেমধ্যে একটু করি। আবার মিলমিশ হয়া যায়।”
“তরে স্কুলে পাঠায় না?”
“পাঠাইবার চায়। সবসময় স্কুলে যাবার কথা বলে।“
”তুই যাইবার চাস না?”
জালাল মাথা নাড়ল, “না।”
“কেন?”
“লেখাপড়া ভালা লাগে না।”
মা তখন লেখাপড়ার গুরুত্ব নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলল, “তারপর বলল, “স্কুলে যাবি। অবশ্যি স্কুলে যাবি।”
জালাল বলল, “ঠিক আছে মা। যামু।”
মা তখন জালালের শার্ট-প্যান্টটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল, “এই জামা-কাপড় তোর খালায় দিছে?”
“হ।“
“তয় একজোড়া জুতা দিল না কেন?”
“দিছে তো। আমার পরবার মন চায় না।”
“জুতা পাও দেওয়া অভ্যাস করা দরকার। ভদ্রলোকেরা সবসময় জুতা পরে।”
জালাল মাথা নাড়ল। মা বলল, “বড়লোক আর ছোটলোকের মাঝে পার্থক্য হইল জুতার মাঝে। বুঝছস?”
জালাল মাথা নেড়ে জানাল সে বুঝেছে।
.
বিকালবেলা জালাল তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলো। জালাল তার বোনের জন্যে কেনা লাল ফ্রকটাও তার মাকে দিয়ে দিল। আসাদ্দর আলীর অনেকগুলো ছেলেমেয়ে–কোনো একজনের গায়ে লেগে যাবে। মা তার খালার জন্যে দুইটা পেঁপে দিয়ে দিল–জালাল নিতে চাচ্ছিল না কিন্তু মা জোর করল, জালাল তখন না করল না।
জালাল যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে তাকায়, ডোবার পাশে নারকেল গাছটার নিচে মা দাঁড়িয়ে আছে, অনেক দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে টপ টপ করে মায়ের চোখ থেকে পানি পড়ছে।
জালাল একটু নিশ্বাস ফেলল, তার মা কয়দিন বাঁচবে কে জানে–কিন্তু যে কয়দিনই বাঁচুক মনের মাঝে একটা শান্তি থাকবে, তার ছেলেটা খুব ভালো আছে। কোনো একজন মহিলা নিজের ছেলের মতো আদর করে তাকে বড় করছে। এইটা সত্যি না হলে কী আছে? মা জানবে এটা সত্যি। জালাল ফিরে যাবার সময়ে পেঁপে দুইটা নগদ বারো টাকায় বিক্রি করে ফেলল।
০৭-৯. অসম্ভব শীত
রিকশা থেকে নামতে নামতে ইভা টের পেল অসম্ভব শীত পড়েছে। এই দেশে এতো শীত পড়তে পারে সে কখনো কল্পনাই করতে পারে না। বড় একটা সোয়েটার পরেছে তার উপর একটা ভারি কোট। একটা স্কার্ফ দিয়ে মাথা-মুখ সবকিছু ঢেকে রেখেছে তারপরও সে ঠকঠক করে কাঁপছে। রিকশা দিয়ে আসার সময় হুডটা হাত দিয়ে ধরেছিল, মনে হচ্ছিল বরফের ছুরি দিয়ে হাতটাকে কেউ ফালি ফালি করে কেটে ফেলছে। গত সপ্তাহেও বোঝা যায়নি এরকম ঠাণ্ডা পড়বে, মাঝখানে হঠাৎ একটু বৃষ্টি হল তারপর থেকে এরকম ঠাণ্ডা। আজ সকাল থেকে কুয়াশায় সূর্যটা ঢেকে আছে, বাতাসটা কেমন জানি ভেজা ভেজা, দুপুর হয়ে গেছে এখনো সূর্যটার দেখা নেই। একটুখানি রোদের জন্যে ইভার সারা শরীর আঁকুপাকু করতে থাকে।
স্টেশনে ঢোকার সময় ইভা বাচ্চাগুলোকে খুঁজল, এই শীতে তাদের কী অবস্থা কে জানে। আশেপাশে কেউ নেই, কিন্তু একটু পরেই নিশ্চয়ই সবাই এসে হাজির হবে।
ইভা প্লাটফর্মের এক কোনায় হেঁটে যায়, হিল হিল করে কোথা থেকে জানি ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, সেই বাতাস থেকে রক্ষা পাবার জন্যে তার ইচ্ছে করছিল ওয়েটিং রুমের ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করে, কিন্তু ঘিঞ্জি ঘরের ভেতরে তার ঢোকার ইচ্ছে হল না। তা ছাড়া সেখানেও কোনো ফাঁক দিয়ে যে বাতাস ঢুকবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
ইভা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে দুই হাত ঘষে হাত দুটো একটু গরম করার চেষ্টা করল তারপর মুখের কাছে এনে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলল, মনে হয় নিশ্বাসের সাথে সাথে নাক-মুখ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ইভা প্লাটফর্মের চারিদিকে তাকায়, আজকে মানুষজন বেশ কম। অসম্ভব ঠাণ্ডা পড়েছে বলেই হয়তো কেউ বের হয়নি। ইভা দুই নম্বর প্লাটফর্মের দিকে তাকাল এবং হঠাৎ করে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।
