কিন্তু তার মা? তার মায়ের কী হল? জালাল তখন আবার চারিদিকে সবার মুখের দিকে তাকাল, তারপর জিজ্ঞেস করল, “আর মা? মা কই?”
সবাই হঠাৎ করে চুপ করে যায়। বড় চাচি বলল, “তোর বইনটা যখন মরল তখন তোর মা খালি কান্দে–” এইটুকুন বলে বড় চাচি থেমে যায় মনে হয় কী বলবে বুঝতে পারে না।
মেজো চাচি বলল, “তুইও নাই। তোর মা একলা একলা থাকে। কান্নাকাটি করে।”
বড় চাচি বলল, “মুরুব্বিরা কইল, একলা থাকা ঠিক না–”
মেজো চাচি বলল, “তখন, তখন,-” বাক্যটা শেষ করতে পারল না মেজো চাচি থেমে গেল।
তখন ছোট একটা বাচ্চা আনন্দে হি হি করে হেসে বলল, “তখন বিয়া দিয়া দিছে!”
জালাল কথাটা শুনে বিশ্বাস করতে পারল না, বলল, “বিয়া?”
একবার বিষয়টা বলে দেওয়ার পর কথা বলা সহজ হয়ে গেল। বড় চাচি বলল, “হ। জামাইয়ের অবস্থা বালা। বয়স একটু বেশি। তর মাও তো আর কমবয়সী ছেমরি না–”
মেজো চাচি বলল, “আগের বউয়ের বয়স হইছে, দেখনের একটা মানুষও তো লাগে–”
জালাল শুকনো গলায় বলল, “বিয়া? মায়ের বিয়া দিছ? আমার মায়ের?”
ঠিক কী কারণ কে জানে ছোট একটা বাচ্চা হি হি করে হেসে উঠল আর জালাল তখন দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে সে তখন উঠান থেকে ছুটে বের হয়ে যায়-বাংলাঘরের পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে সে একেবারে সড়কের পাশে গেল, তারপর সেই সড়কের একপাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বোনটা মারা গেছে সেই জন্যে কাঁদছে, না মাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে সেই জন্যে কাঁদছে, সে নিজেও জানে না।
তার পিছু হাঁটতে হাঁটতে এবং দৌড়াতে দৌড়াতে বেশ কিছু বাচ্চা এসে হাজির হয়েছে। তাদের জন্যে জালালের ফিরে আসাটা অনেক বড় ঘটনা। তারা জালালের থেকে একটু দূরে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে লক্ষ করতে থাকে।
বেশ খানিকক্ষণ পর জালাল চোখ মুছে একটু শান্ত হল। তখন মুখ তুলে সে বসে থাকা বাচ্চাগুলোর দিকে তাকাল। তার একজন চাচাত বোন বলল, “কান্দিস না। কাইন্দা কী লাভ?”
“আমার বইনরে কই কবর দিছে?”
“পুষুনি পাড়ে।”
“বাবার কবরের লগে?”
“হ।”
“আর মায়ের বিয়া?”
“কচুখালি।”
জালাল মাথা নাড়ল। কচুখালি কাছাকাছি একটা গ্রাম। কচুখালি গ্রামের মানুষ একটু বোকা ধরনের হয় বলে সবাই জানে।
“বিয়ার সময় মা কী কানছিল?”
চাচাতো বোন মাথা নাড়ল, বলল, “হ। অনেক কানছিল। বিয়া করবার চায় নাই। জোরে বিয়া দিছে।”
“কেন বিয়া দিল? বিয়া দেওনের কী দরকার হইছিল?”
জালালের কথার কেউ উত্তর দিল না।
.
দুপুরবেলা জালাল হেঁটে হেঁটে পাশের কচুখালি গ্রামে হাজির হল। তার মায়ের যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার নাম আসাদ্দর আলী। আসাদ্দর আলী এমন কিছু গণ্যমান্য মানুষ নাকচুখালি গ্রামের মতো ছোট একটা গ্রামেও মানুষজন তাকে ভালো চিনে না। শেষ পর্যন্ত গ্রামের এক কোনায় একটা ডোবার সামনে জালাল আসাদ্দর আলীর বাড়িটা খুঁজে পেল, তার বড় চাচি বলেছিল অবস্থা ভালো কিন্তু দেখে সেটা মনে হল না। বাড়ির সামনে দুইটা হাড়জিরজিরে গরু বেঁধে রাখা আছে। কয়েকটা বাচ্চা কাদামাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে খেলছে।
।জালাল কিছুক্ষণ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক কীভাবে এই বাড়ি থেকে তার মাকে খুঁজে বের করবে বুঝতে পারছিল না। ঠিক তখন ভেতর থেকে একজন বুড়ো মানুষ হুঁকো খেতে খেতে বের হয়ে এলো। জালালকে দেখে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কারে চাও?”
“আমার মায়েরে।”
“তোমার মা কেডা?”
জালাল ঠিক বুঝতে পারল না সে কীভাবে মায়ের পরিচয় দিবে। এ বাড়িতে আসাদ্দর আলীর সাথে বিয়ে হয়েছে বলতে তার কেমন জানি লজ্জা লাগল। এই বুড়ো মানুষটাই আসাদ্দর আলী কী না কে জানে। আমতা আমতা করে বলল, “আমার মা–আমার মা–হের নাম–” জালাল হঠাৎ করে আবিষ্কার করল সে তার মায়ের নাম জানে না। তখন বাধ্য হয়ে তাকে বলতেই হল, “এই বাড়িত বিয়া হইছে–”
তখন হঠাৎ করে মানুষটা জালালের মাকে চিনতে পারল। সে মাথা নাড়তে নাড়তে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল এবং একটু পরেই জালাল দেখল তার মা সবুজ রঙের একটা শাড়ি পরে বের হয়ে এসেছে। শুকনো মুখ, চোখে-মুখে এক ধরনের ক্লান্তির ছাপ। জালালকে দেখে মা কেমন যেন চমকে উঠল, কাছে এসে অবাক হয়ে বলল, “জালাল! তুই?”
জালাল মাথা নাড়ল। তার খুব ইচ্ছা করছিল মা’কে জাপটে ধরে কিন্তু সে পারল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মা কাছে এসে তার হাত ধরে বলল, “বাবা! তুই বাইচা আছস? আমারে যে সবাই কইল তুই মইরা গেছস?”
জালাল মাথা নাড়ল, বলল, “না। মরি নাই।”
মা জালালের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিল তারপর হঠাৎ শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। জালালও তখন তার মা’কে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মা কাঁদতে কাঁদতে তার বোনের কথা বলতে লাগল, কেমন করে না খেতে পেয়ে শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গিয়েছিল তখন বড় বড় চোখে শুধু তাকিয়ে থাকত। মারা গিয়ে সে শান্তি পেয়েছে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে ফিরে সেই কথাটাই বারবার করে বলল।
একটু পর কান্না থামিয়ে মা জালালকে জিজ্ঞেস করল, “তুই কই থাকস? কী করস? তোর চিন্তায় বাবা আমার মনে কুনো শান্তি নাই।”
“তুমি আমার লাগি চিন্তা কইর না। আমি ভাল আছি।”
“কই থাকস?”
