ঠিক যখন হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা ছেড়ে দিচ্ছে তখন হাচড়-পাঁচড় করে মজিদ আর শাহজাহানও ট্রেনের ছাদে ওঠে পড়ল। জালাল অবাক হয়ে বলল, “তোরা কই যাস?”
“তরে একটু আগাইয়া দেই।”
“ফিরতি দেরি হবে কিন্তু, লোকাল টেরেনে ফিরতি হবি।”
শাহজাহান বলল, “সমিস্যা নাই। দরকার হলি কাল ফিরুম।”
কথাটা সত্যি, তারা এই স্টেশনে থাকে তার অর্থ এই নয় যে প্রতি রাতেই তাদের এখানে থাকতে হবে। যখন যেখানে খুশি তারা রাত কাটাতে পারে।
জালাল খুশি হল, একা একা ট্রেনে যাওয়া থেকে কয়েকজন মিলে যাওয়া অনেক নিরাপদ। ট্রেনের ছাদে বসে যারা যাতায়াত করে তার মাঝে অনেক রকম মানুষ থাকে-কয়দিন আগেই একজন আরেকজনের সবকিছু কেড়ে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছিল।
ট্রেনটা ছেড়ে দেবার পর প্রথম একটু হেলতে দুলতে যেতে থাকে তারপর ধীরে ধীরে তার গতি বাড়তে থাকে। শহরের ভেতর দোকানপাট বাড়িঘর ঘিঞ্জি রাস্তা পার হয়ে দেখতে দেখতে ট্রেনটা গ্রামের ভেতর চলে আসে। দুই পাশে ধান ক্ষেত, বাঁশঝাড়, ছোট ছোট নদী–দেখে জালাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বাড়ি থেকে পালিয়ে স্টেশনে থাকতে শুরু করার আগে সেও এরকম একটা গ্রামে থাকত, যতবার এরকম একটা গ্রাম চোখে পড়ে জালালের মন কেমন কেমন করে।
শাহজাহান ট্রেনের ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। মজিদ পকেট থেকে একটা আমড়া বের করে কামড়ে কামড়ে খেতে শুরু করে। জালাল জিজ্ঞেস করল, “মজিদ, তোর বাড়িতে কে কে আছে?”
মজিদের মনে হয় উত্তর দেবার ইচ্ছে নেই, বলল, “জানি না।”
“জানিস না?”
“এই তো। বাপ-মা ভাই বুন–”
”তয় তুই বাড়ি যাস না কেন?”
“আমার বাপ হইছে আজরাইল–মাইরতে মাইরতে শেষ করে দেয়।”
“ও।” জালাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার বেলায় ঘটনাটা ঠিক তার উল্টো। যতদিন বাবা বেঁচে ছিল কোনো ঝামেলাই ছিল না, তাকে কত আদর করত। বাবা মরে যাবার পর চাচাঁদের অত্যাচারে আর বাড়ি থাকতে পারল না।
শাহজাহান ট্রেনের ছাদে শুয়ে শুয়ে আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, “মেঘগুলারে মনে হয় জ্যান্ত। মনে লয় এইগুলা হাটে, লড়াচড়া করে।”
জালাল আর মজিদও আকাশের দিকে তাকাল, আকাশে তুলার মতোন মেঘ, কয়দিন আগেও কী সাংঘাতিক বর্ষা ছিল এখন বর্ষা শেষ হয়েছে, সামনে শীত। বর্ষাকালে তাদের কষ্ট, শীতেও তাদের কষ্ট। মাঝখানের এই সময়টাতে তাদের আরাম। শাহজাহানের দেখাদেখি জালাল আর মজিদও ট্রেনের ছাদে শুয়ে শুয়ে আকাশের মেঘ দেখতে লাগল। শাহজাহান ঠিকই বলেছে, একটা মেঘকে মনে হচ্ছে ঘোড়ার মতোন, সেটা দেখতে দেখতে প্রজাপতির মতোন হয়ে গেল একটু পরে সেই প্রজাপতিটাকে একটা মুরগির রানের মতো দেখাতে থাকে। মনে হচ্ছে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট থেকে এই মুরগির রানটা বের হয়ে এসেছে!
.
শাহজাহান আর মজিদ দুই স্টেশন পর ট্রেন থেকে নেমে একটা লোকাল ট্রেনের ছাদে রওনা দিয়ে দিল। মজিদ রাত্রে টিএন্ডটি বস্তিতে থাকে, কাজেই সে ফিরে যেতে চাইছিল।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জালাল সন্ধ্যার মাঝে বাড়ি পৌঁছে যেত কিন্তু সে বাড়ি পৌঁছাল পরের দিন সকালে। মাঝখানে ট্রেনটা এক জায়গায় তিন ঘণ্টা আটকে থাকল, একটা মালগাড়ি উল্টে সবকিছু বন্ধ হয়ে ছিল। তিনঘণ্টা দেরি হওয়ার কারণে পুরো সময়টা উলটপালট হয়ে তার সবকিছু দেরি হয়ে গেল। মাঝ রাতে ট্রেন থেকে নেমে তাকে স্টেশনে রাত কাটাতে হল–সেটা এমনিতে তার জন্যে কোনো সমস্যা না কিন্তু মাত্র নতুন শার্ট-প্যান্ট কিনে এনেছে, প্লটফর্মে শুয়ে সেগুলো ময়লা করতে চাচ্ছিল না–তাই একটা বেঞ্চে হেলান দিয়ে আবোঘুম আধোজাগা অবস্থায় রাতটা কাটিয়ে দিল।
জালাল সকালে প্রথম বাসটাতে উঠে বসে–দুই ঘণ্টার মাঝে বাড়ি পৌঁছে যায়। বাস থেকে নেমে ক্ষেতের আল ধরে মাইলখানেক হাঁটার পর সে তার বাড়ি পৌঁছাল, এক বছরের বেশি হল সে তার মাকে দেখে না, মা কেমন আছে কে জানে। ছোট বোনটা কী তাকে চিনবে? যখন সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে তখন বোনটা খুব দুর্বল হয়েছিল। খেতে না পারলে দুর্বল তো হবেই।
বাড়ির কাছাকাছি এসে জালালের একটু ভয় ভয় করে। বাইরে বাংলাঘর, পার হয়ে ঢোকার পর সেখানে উঠান, চারপাশে তাদের চাচাঁদের ঘর। উঠানের মাঝখানে আসার পর তার একজন চাচাতো ভাই প্রথম তাকে দেখতে পেল। গলা উঁচিয়ে বলল, “আরে! এইটা জালাইল্যা না?”
জালাল মাথা নাড়ল। চাচাতো ভাই জালাল থেকে অনেক বড়। কাছে এসে বলল, “তুই কোন দুইন্যা থেকে হাজির হলি?”
জালাল কী বলবে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল তখন বাড়ির ভেতর থেকে তার কয়েকজন চাচি, চাচাতো ভাইবোন বের হয়ে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। জালাল তাদের ভেতর তার মাকে খুঁজল, পেল না। তখন জিজ্ঞেস করল, “মা কই?”
সবাই কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল। বড় চাচি বলল, “তোর বইন যখন মরল–”
জালালের মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে ওঠে। তার বোন মরে গেছে? যার জন্যে একটা লাল টুকটুকে ফ্রক কিনে এনেছে সে মরে গেছে? জালাল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে জালাল কোনো কথা আলাদা করে শুনতে পায় না। একসাথে সবাই কথা বলছে, তার বোনটা কেমন করে মারা গেছে সবাই সেটা বলছে কিন্তু কিছুই জালালের মাথায় ঢুকছে না। একজন মানুষ মরে গেলে সে কীভাবে মারা গেল সেটা জানলেই কী আর না জানলেই কী?
