ফিরে আসার সময় মায়া বলল, “ভাই।”
জালাল উত্তর দিল, “কী?”
“তোমার এতো টেহা, আমাগো বিরানি খাওয়াবা?”
মুখ খিঁচিয়ে ধমক দিতে গিয়ে জালাল থেমে গেল। কয়দিন আগে মায়া সবুজের কাছে বিরিয়ানি খেতে চেয়েছিল, সেই সবুজ এখন দশ হাত মাটির নিচে। জালাল মনে মনে হিসাব করে দেখল যে তার কাছে যত টাকা আছে ইচ্ছে করলে সে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট কিনতে পারে, তিনজনে মিলে সেটা খেতেও পারে। তারপরেও তার মনটা একটু খুঁতখুঁত করতে থাকে–এতোগুলো টাকা বিরিয়ানির প্যাকেট কিনে নষ্ট করবে?
জেবা বলল, “বড় বাজারের মোড়ে বিরানির দোকান আছে। এই এত্তোগুলা কইরা দেয়।”
জেবা বিরিয়ানির যে পরিমাণটা দেখাল সেটা সত্যি হবার সম্ভাবনা কম। তারপরেও জালাল শেষ পর্যন্ত রাজি হল। তখন তিনজন মিলে হেঁটে হেঁটে বড় বাজারে বিরিয়ানির দোকানটিতে হাজির হল। বাইরে বিশাল একটা ডেকচিতে বিরিয়ানি রান্না করা আছে। কেউ ইচ্ছা করলে প্যাকেটে করে কিনতে পারে কিংবা ভেতরে বসে খেতে পারে। তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিবে না জেনেও তিনজন একবার ভিতরে ঢুকতে চেষ্টা করল। ডেকচির সামনে বসে থাকা কালো মোটা মানুষটা খেঁকিয়ে উঠল, “কই যাস?”
জেবা মুখ শক্ত করে বলল, “বিরানি খামু।”
মানুষটা মুখ শক্ত করে বলল, “ইহ! বিরানি খামু! যা ভাগ।”
জালাল বলল, “টেহা দিয়া বিরানি খামু, আপনাগো সমিস্যা কী?”
জালালের কথায় মানুষটা মনে হয় খুব মজা পেল, বলল, “বেশি টাকা হইছে? ভাগ এইখান থেকে।”
তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিবে সেটা অবশ্যি তারাও আশা করেনি তাই আর তর্ক-বিতর্কের মাঝে গেল না। জালাল তার মুঠি থেকে একটা নোট বের করে কালো মোটা মানুষটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এক প্যাকেট বিরানি।”
মানুষটা নোটটা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখল তারপর একটা প্যাকেট নিয়ে সেটাতে বিরিয়ানি ভরে দেয়। জেবা বলল, “কম দিছেন। আরো দেন।”
মানুষটা চোখ পাকিয়ে জেবার দিকে তাকাল তারপর সত্যি সত্যি প্যাকেটটাতে আরেকটু বিরিয়ানি ঠেসে দিল। মায়া বলল, “গোশতু বেশি কইরা দেন।”
মানুষটা মায়ার দিকে ঘুরে তাকাল, মায়ার সাইজ দেখে তার মুখে একটা আজব ধরনের হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু সত্যি সত্যি ডেকচির ভেতরে তাকিয়ে আরেক টুকরা গোশত এনে বিরিয়ানির প্যাকেটে ঢুকিয়ে দিল। মানুষটি তারপর প্যাকেটটা বন্ধ করে জালালের দিকে এগিয়ে দেয়।
জালাল প্যাকেটটা হাতে নেয়, গরম গরম বিরিয়ানি। প্যাকেটটা খুলতেই ভেতর থেকে অপূর্ব একটা ঘ্রাণ বের হয়ে আসে। তাদের তিনজনের জিবেই পানি এসে যায়। কোথায় বসে খাবে সেটা নিয়ে চিন্তা করে তারা সময় নষ্ট করল না তখন তখনই রাস্তার পাশেই বসে পড়ে। প্যাকেটটা মাঝখানে রেখে তারা সেটাকে ঘিরে বসে পড়ল। এরকমভাবে খেতে হলে সবসময় কাড়াকাড়ি করে কে কার আগে কত বেশি খেতে পারে সেটা নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা হয়। আজকে সেরকম কিছু হল না, তারা কাড়াকাড়ি করল না, একটু একটু করে খেল। সিদ্ধ ডিমটা জেবা সমান তিনভাগ করে দিল, সেটা তারা আলাদা করে খেল। গোশতের টুকরোগুলো অনেকক্ষণ ধরে চিবাল, হাড়ের টুকরোগুলো চুষে চুষে খেল। প্যাকেটটার শেষ ভাতটাও তারা ঝেড়েপুছে খেয়ে শেষ করল।
মায়া হাত চাটতে চাটতে বলল, “আমি যহন বড় হমু তখন পেরতেক দিন বিরানি খামু।”
সে বড় হলে কেন তার প্রত্যেকদিন বিরিয়ানি খাওয়ার মতো ক্ষমতা হবে সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করল না। তিনজন উঠে দাঁড়াল, জেবা বিরিয়ানির ডেকচির পাশে বসে থাকা কালো মোটা মানুষটাকে বলল, “পানি খামু।”
জালাল হাত চাটতে চাটতে বলল, “হাত ধুমু।”
মানুষটা কয়েক সেকেন্ড তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ভিতরে যা। হাত ধুয়ে পানি খায়া বিদায় হ।”
তিনজন ভেতরে ঢুকল, বেসিনে রগড়ে রগড়ে সাবান দিয়ে হাত ধুলো, ট্যাপ থেকে পানি খেল তারপর বের হয়ে এলো। আসার সময় জালাল সাবানের টুকরোটা পকেটে করে নিয়ে এলো।
.
বিরিয়ানির দোকান থেকে নিয়ে আসা সাবানটা দিয়ে জালাল পরের দিন স্টেশনের পাশের ডোবাটাতে গোসল করল, তারপর তার নতুন কাপড় পরল। জিনসের প্যান্ট আর শার্ট পরে সে যখন স্টেশনে ফিরে এলো তখন তাকে দেখে চেনা যায় না। স্টেশনের সবাই তাকে ঘিরে খানিকটা বিস্ময় আর অনেকখানি ঈর্ষা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। জালালের একটু লজ্জা লজ্জা করছিল, কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল, “বাড়ি যামু তো হের লাগি কিনছি।”
জেবা সবাইকে জানাল, “জালাইল্যা খালি নিজের কাপড় কিনে নাই–হের মায়ের লাইগাও শাড়ি কিনছে।”
মায়া বলল, “তার বইনের জামাও কিনছে।”
জালাল ভয়ে ভয়ে ছিল জেবা আর মায়া তার বিরিয়ানি খাওয়ানোর কথাটাও সবাইকে বলে দিবে কি না। তা হলে অন্যেরা হইহই করতে থাকবে। জেবা আর মায়ার বুদ্ধি আছে তারা বিরিয়ানি খাওয়া নিয়ে কিছু বলল না।
জেবা বলল, “হের মায়ের শাড়িটা আমি কিনা দিছি।”
মায়া মাথা নাড়ল, “অনেক সোন্দর।”
জালালকে তখন শাড়িটা দেখাতে হল আর সবাই তখন মাথা নেড়ে স্বীকার করল যে শাড়িটা আসলেই খুবই সুন্দর।
.
জয়ন্তিকার প্যাসেঞ্জারদের কাছে যখন সবাই ছোটাছুটি করছে তখন জালাল ট্রেনের ছাদে গিয়ে উঠল। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাগের ভিতর তার মায়ের শাড়ি আর বোনের ফ্রক। এই এক ট্রেনে সে বাড়ি যেতে পারবে না–দুইবার ট্রেন বদলাতে হবে, শেষ অংশ যেতে হবে বাস কিংবা টেম্পুতে। ট্রেনের অংশটুকু ফ্রি, বাস-টেম্পুতে কিছু পয়সা খরচ হবে।
