জালালকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে জেবা জিজ্ঞেস করল, “এই, জালাইল্যা, কী হইছে তোর?”
জালাল বলল, “রাত্রে খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখছি।”
জেবার মনে হয় একটু কৌতূহল হল। সে স্বপ্ন, জ্বিন, পরী, ভূত, পীর, ফকির, তাবিজ এইসব খুব পছন্দ করে। জালালের সামনে বসে জিজ্ঞেস করল, “কী স্বপ্নে দেখছস?”
জালাল তখন জেবাকে পুরো স্বপ্নটা বলল। শুনে জেবার মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, “স্বপ্নটা খারাপ। তোর একটা সদকা দেওন দরকার।”
“সদকা?”
“হয়। তয় আরো একটা কথা আছে।”
“কী কথা?”
“স্বপ্নে যদি কেউরে মরতে দেখস তা হলে তার আয়ু বাড়ে। মনে লয় তর মায়ের আয়ু বাড়ছে।” জেবা তখন এর আগে কাকে কাকে স্বপ্নে মরতে দেখেছে এবং তাদের সবাই কেমন হাট্টাকাট্টা জোয়ান হয়ে বেঁচে আছে জালালকে তার একটা লম্বা তালিকা শোনাল।
শুনে জালালের মনটা একটু শান্ত হয়। জেবা অবশ্যি তারপরেও গম্ভীর মুখে বলল, “স্বপ্নের কথা কাউরে কয়া ফেললে হেইডা আর সত্যি হয় না। ঘুম থাইকা উইঠাই বলতি হয়।”
জালাল বলল, “তাইতো বলছি।”
জেবা বলল, “হেইডা বালা কাম করছস। তয়–”
“তয় কী?”
“মনে লয় মাজারে কয়টা টেহা দিয়া আয়।”
জালাল মাথা নাড়ল, বলল, “দিমু। আইজকেই দিমু।”
.
জালাল বিকালবেলা শহরে গিয়ে মাজারের বিশাল বাক্সের ভেতর দশ টাকার একটা নোট ফেলে দিল। সেখানে উরস না কী যেন হচ্ছে তাই সবাইকে খাওয়াচ্ছে, জালাল অন্যদের সাথে কলাপাতা পেতে বসে পড়ল। ভাত, ডাল আর গরুর মাংস–তবে তার পাতে মাংস পড়ল না শুধু ঝোল আর এক টুকরা আলু। এতো মানুষ খাচ্ছে যেখানে সত্যি সত্যি সে গোশতের টুকরা পাবে সেটা অবশ্যি সে আশাও করেনি।
জালাল ভেবেছিল মাজারে দশ টাকার নোটটা দিয়ে আসার পর তার মায়ের বিপদ কেটে যাবে কিন্তু পরের রাতেও সে তার মা’কে স্বপ্নে দেখল। তার মা ধবধবে সাদা চুল আর একটা ময়লা শাড়ি পরে বিলাপ করছে। ভোরবেলা জেবা স্বপ্নের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল, বলল, “এই স্বপ্নের নিশানা ভালা না।”
জালাল বলল, “কী নিশানা?”
“মনে হয় তর মায়ের বিপদ হইছে।”
“বিপদ? কী বিপদ?” জালাল তার মায়ের কী বিপদ হতে পারে, বুঝে পেল না। তার বাবা মারা যাবার পর চাচাঁদের সংসারে মা লাথি-ঝাটা খেয়ে কোনোমতে টিকে আছে। ছোট বোনটা খেতে না পেয়ে শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেল। কী কারণ কে জানে বড় চাচার পুরো রাগটা ছিল জালালের উপর কিছু হলেই জালালকে ধরে গরুর মতো পেটাত। সেই জন্যে জালাল শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে–ভেবেছিল পালানোর আগে বড় চাচার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিবে কিন্তু মায়ের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত আর লাগায়নি। এই মায়ের নতুন করে আর কী বিপদ হতে পারে?
জেবা গম্ভীর হয়ে বলল, “সদকা দে।”
“সদকা?”
“হ। একটা মুরগি।”
একটা মুরগি কিনতে যত টাকা বের হয়ে যাবে তার থেকে কম টাকা খরচ করে সে বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারে। বাড়ি থাইকা পালানোর পর সে আর একবারও বাড়ি যায়নি–একবার গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে আসার সময় হয়েছে। যদি দেখা যায় আসলেই মায়ের বিপদ তা হলে তখন না হয় সদকা দেওয়া যাবে।
জালাল একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “বাড়ি থাইকা ঘুরি আসি।”
জেবার মুখে দুশ্চিন্তার একটা ছাপ পড়ল, “ঘুরি আসবি না কি আর আসবি না?”
“আসমু।”
জেবা জানে তাদের জীবনে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই, জালাল একবার বাড়ি গেলে হয়তো আর কোনোদিন ফিরেই আসবে না। স্টেশনে তারা যারা থাকে ঝগড়াঝাটি আর মারামারি যাই করুক সবাই মিলে তাদের একটা পরিবার। একজন চলে গেলে পরিবারের একজন কমে যায়। জালালের মাথা থেকে বাড়ি যাওয়ার বুদ্ধিটা সরানোর জন্যে বলল, “কোটের সামনে তাবিজ বিক্রি হয়। বাড়ি যাওনের দরকার কী? ভালা দেইখা একটা তাবিজ কিন। গরম তাবিজ আছে, আসল সোলেমানি তাবিজ।”
জালাল মাথা নেড়ে বলল, “মায়ের যদি বিপদ হয় তা হলে আমার তাবিজ পইরা কী লাভ?”
যুক্তিটা ফেলে দেবার মতো না। তাই জেবা আর কোনো কথা বলল না।
.
দুপুরবেলা জালাল আবার জেবার কাছে এল, বলল, “জেবা তুই একটা কাম করতি পারবি?”
“কী কাম?”
জালাল একটু লাজুক মুখে বলল, “মায়ের জন্যি একটা শাড়ি কিনি দিতি পারবি?”
জেবা চোখ কপালে তুলে বলল, “তুন শাড়ি?”
“হয়।”
জেবা তখনো বিশ্বাস করতে পারে না যে জালাল তার মায়ের জন্যে নতুন একটা শাড়ি কিনতে পারে। অবাক হয়ে বলল, “তোর কাছে টেহা আছে?”
অনেকদিন থেকে জালাল টাকা জমিয়ে আসছে, তার ইচ্ছে সে একটা পান সিগারেট না হলে চায়ের দোকান দিবে। বেশ কিছু টাকা জমা হয়েছে। সেখান থেকে সে ইচ্ছে করলেই মায়ের জন্যে শাড়ি কিনতে পারে। জালাল মাথা নেড়ে বলল, “হয়ে যাবি মনে লয়।”
জেবা তখনো আপত্তি করল, “তুন শাড়ির দরকার কী? অনেক ভালা পুরান শাড়ি পাওয়া যায়।”
জালাল মাথা নাড়ল, বলল, “না। লতুন শাড়ি কিনমু।”
কাজেই বিকালবেলা জেবাকে নিয়ে জালাল শাড়ি কিনতে বের হল। জেবার সাথে মায়া চিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে তাই তাকেও সাথে নিতে হল।
বড় বাজারের শাড়ির দোকানের মানুষেরা তাদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল–তারা নতুন শাড়ি কিনতে পারে সেটা তারা বিশ্বাসই করল না। জালাল তার প্যান্টের সেলাই থেকে কিছু টাকা বের করে হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছিল সেই নোটগুলো দেখানোর পরও দোকানদার তাদের বিশ্বাস করল না। জেবা একটা ঝগড়া শুরু করে দিতে যাচ্ছিল জালাল শুধু শুধু সময় নষ্ট করল না। জেবাকে নিয়ে টিএন্ডটি বস্তির কাছে গরিব মানুষদের জামা-কাপড়ের দোকানে হাজির হল। বুড়ো দোকানি তাদেরকে শাড়ি নামিয়ে দেখাল, জেবা শাড়ির কাপড় পরীক্ষা করে দেখল, শরীরের সাথে লাগিয়ে দেখল তারপর নীল জমিনের উপর কমলা রঙের বড় বড় ফুলওয়ালা একটা শাড়ি পছন্দ করে দিল। দোকানের নতুন নতুন কাপড় দেখে জালাল তার ছোট বোনটার জন্যেও একটা ফ্রক কিনল। চলে আসার সময় তার কী মনে হল কে জানে নিজের জন্যেও একটা জিনসের প্যান্ট আর শার্ট কিনে ফেলল! এই বিলাসিতার জন্যে তার পান-সিগারেটের কিংবা চায়ের দোকান হয়তো আরো ছয় মাস পিছিয়ে গেছে, কিন্তু কী আর করা!
