ইভা হাসল, “আমার সময় কেটে যায়। ট্রেন জার্নির কারণে বইপড়া হচ্ছে। অনেকদিন থেকে পড়ব পড়ব বলে যে বইগুলো জমা করে রেখেছিলাম এই ধাক্কায় সব পড়া হয়ে যাচ্ছে!”
ভাবীর বাচ্চা দুইজন এই সময় ছুটে এলো, বড়টি ছেলে বয়স তেরো–মাত্র টিনএজার হয়েছে কিন্তু চেহারায় ভাবভঙ্গিতে এখনো তার ছাপ পড়েনি। ছোটজন মেয়ে, বয়স আট। ছেলেটি বলল, “ফুপ্পি তুমি আমার বার্থডে-তে আসনি।”
ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে তাই তার বাংলা উচ্চারণে একটা ইংরেজি ইংরেজি ভাব। ইভা মুখে অপরাধীর ভাব করে বলল, “আই অ্যাম সরি! তোমরা সব প্ল্যান করে উইক ডে’তে জন্ম নিচ্ছ আমি কেমন করে আসব? এর পরের বার থেকে উইক এন্ডে জন্ম নিবে। আমি উইক এন্ডে ঢাকা থাকি!”
ছেলেটি হাসল, ইংরেজি বলল, “যা মজা হয়েছিল! একটা নতুন গেম বের হয়েছে, নেট ব্যবহার করে খেলা যায় আমরা সেটা দিয়ে খেলেছি।”
মেয়েটি আদুরে গলায় বলল, “আমাকে নেয়নি।”
“তোকে কেমন করে নিব? তুই কি খেলতে পারিস?”
ইভা জিজ্ঞেস করল, “অনেক গিফট পেয়েছ?”
ছেলেটি মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ ফুপ্পি। অনেক। একটা এমপি থ্রি প্লেয়ার দিয়েছে। আমার ফ্রেন্ডরা–যা কিউট!”
ইভা বলল, “আমার কাছ থেকে তোমার একটা গিফট পাওনা থাকল। বল কী চাও।”
ছেলেটি হাসি হাসি মুখে বলল, “থ্যাংকস ফুপ্পি। তোমার যেটা ইচ্ছা দিও।”
“বই?”
ছেলেটার খুব পছন্দ হল না কিন্তু সেটা প্রকাশ করল না, বলল, “হ্যাঁ। অফকোর্স বই দিতে পার।” ইংরেজিতে যোগ করল, “বই আমার খুব পছন্দ।”
মেয়েটা বলল, “আমার বই ভালো লাগে না।” ইভা বলল, “তুমি আরেকটু বড় হও তখন তোমারো বই ভালো লাগবে।”
ছেলেটা হঠাৎ ইভার একটু কাছে এগিয়ে এসে ইংরেজিতে বলল, “ফুপ্পি, তুমি আমার একটা উপকার করতে পারবে?”
“কী উপকার?”
“তুমি আম্মুকে একটা জিনিস বোঝাতে পারবে?”
“কী জিনিস?”
“আমাদের পুরো ক্লাশ একটা ট্রিপে যাচ্ছে, কিন্তু আম্মু আমাকে যেতে দিতে চায় না।”
“কেন?”
“আম্মু বলে আমি না কী নিজে নিজে ম্যানেজ করতে পারব না। সিক হয়ে যাব। হ্যাঁনো তেননা। সবাই যাচ্ছে–কী মজা হবে আর আমি যেতে পারব না!”
ইভা বলল, “ঠিক আছে ভাবীকে বলব।”
ঠিক তখন ভাবী এক কাপ চা খেতে খেতে এদিকে আসছিল। ইভা বলল, “ভাবী, তুমি না কি সাদকে তার ক্লাশের বন্ধুদের সাথে ট্রিপে যেতে দিচ্ছ না?”
“কেমন করে দিব? এখনো তুলে না দিলে খেতে পারে না। ট্রিপে গিয়ে নিজে নিজে কেমন করে ম্যানেজ করবে?”
“পারবে ভাবী, পারবে। যখন নিজের উপর পড়বে তখন নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে।”
ভাবী দুশ্চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল, বলল, “জানি না বাপু। টিভি খুললেই দেখি কিছু না কিছু হচ্ছে, এই অ্যাকসিডেন্ট ওই অ্যাকসিডেন্ট ভয় লাগে। কখন যে কী হয় শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।”
“এতো ভয় পেলে হবে না। টিভিতে তো আর ভালো জিনিসগুলো দেখায় না, খালি খারাপগুলো দেখায়–”
“তা ছাড়া লেখাপড়া নিয়েও তো ঝামেলা। ম্যাথ-এর খুব ভালো একটা টিউটর পেয়েছি, ঝুম্পা মিস-খুব রাশ। একদিন অ্যাবসেন্ট থাকলে রাগ করে।”
ইভা কিছু বলল না, এই বিষয়গুলো সে বুঝতে পারে না। একজন একটা স্কুলে পড়লেও কেন আলাদা কোচিং করতে হবে? ভাবী চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “একটা গাড়ি একটা ড্রাইভার চরকির মতো দৌড়াচ্ছে। স্কুলে নিয়ে যাও, স্কুল থেকে আন, কোচিংয়ে নিয়ে যাও সেখান থেকে অন্য কোচিংয়ে নিয়ে যাও, তোমার ভাইয়ের অফিস, গ্রোসারি–অন্য কিছু করার সময় কোথায় বল?”
ইভা এবারেও কিছু বলল না। সংসারের ঝামেলার কথা ভাবীর প্রিয় বিষয়, ভাবী একবার বলতে শুরু করলে সহজে থামতে পারে না। ভাবী বলেই যেতে থাকে, ইভা শুনতে শুনতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। সে একবার সাদ আরেকবার মাহরীনের দিকে তাকাল। কয়েক ঘণ্টা আগেই স্টেশনে এদের থেকেও ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখে এসেছে-তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই, কী অবলীলায় কী বিচিত্র একটা জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে। আর তার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা কী বিচিত্র আরেকটা জীবনের ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে। সাদ আর মাহরীনকে যদি একদিন জালাল আর মায়ার সাথে বসিয়ে দেওয়া হয় তা হলে কী তারা নিজেদের ভেতর কথা বলার কোনো একটা কিছু খুঁজে পাবে?
মনে হয় না। প্রায় একই বয়সের বাচ্চা কিন্তু তাদের জীবনের মাঝে এতোটুকু মিল নেই।
.
০৬.
জালাল ঘুম থেকে উঠে একটা থাম্বায় হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে রইল। গত রাতে সে তার মা’কে স্বপ্নে দেখেছে। মা পাটফর্মের কাছে দাঁড়িয়েছিল, ঝিকঝিক শব্দ করে ট্রেন আসছে তখন জালাল বলল, “মা এতো কাছে খাড়াইও না, দূরে থাকো।” মা বলল, “ক্যান? দূরে খাড়াইতে হবি ক্যান?” জালাল বলল, “অ্যাকসিডেন্ট হতি পারে।” মা তখন দূরে সরে যেতে চাচ্ছিল ঠিক তখন কোথা থেকে কাগজের মতো সাদা কয়েকজন মানুষ এসে মাকে ধরে রাখল। ট্রেনটা যখন খুব কাছাকাছি এসেছে তখন তারা ধাক্কা দিয়ে মা’কে ট্রেনের নিচে ফেলে দিল। চোখের নিচে ট্রেনের চাকার নিচে মা কেটেকুটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেল। জালাল”মা মা চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। তারপর অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি, কী ভয়ংকর একটা স্বপ্ন।
সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর জালালের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। কতোদিন সে তার মাকে দেখেনি–শেষ পর্যন্ত যখন দেখল তখন এরকম খারাপ একটা স্বপ্ন দেখল। পুরো স্বপ্নটা মনে হচ্ছে একেবারে সত্যি।
