ইভা হাসি হাসি মুখে জালালের দিকে তাকাল, “সত্যি?”
জালাল কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল, তারপর মাথা তুলে বলল, “আফনারে কুনোদিন আমি ভেজাল পানি দিমু না আপা।”
“ঠিক আছে। থ্যাংকু। কাউকেই দিলে আরো ভালো!”
ঠিক তখন দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল এবং সাথে সাথে বাচ্চাদের মাঝে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা প্রাটফর্মের নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে ট্রেনটা থামা মাত্র সেটাতে ওঠার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
দেখতে দেখতে বিশাল ট্রেনটা প্লাটফর্ম কাপিয়ে স্টেশনে ঢুকে গেল, ট্রেনটার গতি কমতে শুরু করেছে বাচ্চাগুলো নিজেদের জায়গা ভাগাভাগি করে দাঁড়িয়ে আছে। ইভা হঠাৎ করে লক্ষ করল মায়ার সাথে একটা ছেলের কী একটা নিয়ে ঝগড়া লেগে গেছে এবং কিছু বোঝার আগে ছেলেটা ধাক্কা দিয়ে মায়াকে চলন্ত ট্রেনের নিচে ফেলে দিল। ঘটনাটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটেছে যে মায়া চিৎকার করার পর্যন্ত সময় পেল না, দুই হাতে মুখ ঢেকে সে বসে পড়ে। তার চোখ খোলার সাহস হয় না। মানুষজনের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে সে দেখল জালাল লাফ দিয়ে প্লাটফর্মে শুয়ে মায়াকে ধরে ফেলেছে। এবং চিৎকার করে কিছু একটা বলছে, ট্রেনের শব্দের জন্যে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। জালাল ভয়ানক বিপজ্জনক ভঙ্গিতে শুয়ে আছে, তার ঠিক মাথার উপর দিয়ে ট্রেনের পাদানিগুলো প্রায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, একটুখানি উনিশ-বিশ হলেই জালালের মাথা গুঁড়ো হয়ে যাবে।
ইভা ছুটে গেল এবং নিচের দৃশ্যটা দেখে তার রক্ত জমে গেল। রেল লাইনের উপর দিয়ে ট্রেনের ধাতব চাকাগুলো বিকট শব্দ করতে করতে যাচ্ছে এবং তার এক ইঞ্চিরও কাছে মায়া ঝুলে আছে, জালাল তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। একটু নড়লেই মুহূর্তের মাঝে বাচ্চা মেয়েটি ট্রেনের চাকার নিচে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। ট্রেনটি থামছে, কেন আরো তাড়াতাড়ি থামছে না ভেবে সে অস্থির হয়ে যায়। যতক্ষণ পুরোপুরি না থামছে জালাল কি মায়াকে ধরে রাখতে পারবে? শেষ পর্যন্ত ট্রেনটি থামল এবং ইভার কাছে মনে হল তার মাঝে বুঝি অনন্তকাল পার হয়ে গেছে।
ইভার পাশাপাশি আরো অনেকে উবু হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল, ট্রেনটা থামার পর সবাই মিলে মায়াকে টেনে উপরে তুলে আনে। জালাল এদিক-সেদিক তাকিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া তার ভুয়া পানির বোতলগুলো উদ্ধার করে হাতে নিয়ে যে ছেলেটি ধাক্কা দিয়ে মায়াকে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়েছে তাকে খুঁজতে থাকে। বেশি খুঁজতে হল না ছেলেটি কাছাকাছি অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কোনোকিছু নিয়ে গোলমাল হলে একজন আরেকজনকে ধাক্কা দেওয়া এমন কোনো বিচিত্র বিষয় না, কিন্তু মায়া যে ধাক্কা খেয়ে একেবারে ট্রেনের নিচে পড়ে যাবে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
জালাল এবারে সেই ছেলেটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং মুহূর্তের মাঝে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। ছেলেটাকে নিচে ফেলে জালাল তার বুকের উপর বসে হাত মুঠি করে তার মুখের মাঝে মারে। চিৎকার করে তার চুলগুলো ধরে হিংস্র ভঙ্গিতে ছেলেটার মাথা মাটিতে ঠুকতে থাকে। একজন যে আরেকজনকে এরকম নির্দয়ের মতো মারতে পারে ইভা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না। ইভা ছুটে গিয়ে কোনোমতে জালালকে টেনে সরিয়ে আনে। জালাল রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে, “এই হারামজাদা সবসময় এইরকম করে, আরেকদিন এইরকম করে ধাক্কা দিছিল–”
ইভা জালালের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ব্যস! অনেক হয়েছে। ছেড়ে দাও। তুমি এইমাত্র এই মেয়েটার জীবন বাঁচিয়েছ। তুমি না থাকলে এই মেয়েটা মরে যেত। আমরা সারাজীবনেও কারো জীবন বাঁচাতে পারি না-তুমি এতোটুকুন ছেলে হয়ে আরেকজনের জীবন বাঁচিয়েছ। তোমার রাগ করা মানায় না–”
জালালের রাগ একটু কমে আসে। মায়া কাছে দাঁড়িয়ে ছিল-সে এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ইভা তাকে ডেকে এনে জড়িয়ে ধরে বলল, “কাঁদে না বোকা মেয়ে। খুব বাচা বেঁচে গিয়েছ। তোমার মতো লাকি মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি।”
আশেপাশে যাত্রীরা নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকে কিন্তু বাচ্চাগুলোর সেগুলো নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখা গেল না–তারা আবার নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। মায়াকে কিছুক্ষণের মাঝেই দয়ালু টাইপের প্যাসেঞ্জারদের পিছনে পিছনে ভাত খাওয়ার টাকার জন্যে ছুটতে দেখা গেল। জালাল তার ভুয়া মিনারেল ওয়াটার বিক্রি করতে শুরু করে দিল। দেখে বোঝাই যায় না কয়েক মুহূর্ত আগে এখানে এতো বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। ইভা অবাক হয়ে ভাবে না জানি প্রতিদিন কতবার এরা মৃত্যুর এতো কাছাকাছি থেকে ফিরে আসে।
.
ট্রেন ঢাকা পৌঁছাল সন্ধের একটু পর। ইভার বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আটটা হয়ে যায়। বাসায় গিয়ে দেখে তার ভাই এবং ভাবী তাদের বাচ্চা দুটোকে নিয়ে এসেছে। ইভাকে দেখে সবাই খুব খুশি হয়ে উঠল। ভাবী বলল, “ভালোই হল তোমার সাথে দেখা হল। আমি খবর পাই তুমি প্রতি সপ্তাহে আস কিন্তু দেখা হয় না!”
ইভা বলল, “কেমন করে দেখা হবে, সবাই এতো ব্যস্ত!”
ভাবী মাথা নাড়ল, “তোমার এনার্জি আছে। আমি হলে কিছুতেই পারতাম না। প্রতি সপ্তাহে এরকম ট্রেন জার্নি। বাবারে বাবা!”
