ইভা হাসি হাসি মুখ করে বলল, “কী খবর তোমাদের?”
সাথে সাথে সবার মুখ শক্ত হয়ে যায়, মায়া সবার আগে বলল, “সবুজ ভাইরে মাইরা ফালাইছে।”
অন্যেরাও তখন সবুজকে মেরে ফেলার ঘটনাটা নিজের মতো করে বলতে থাকে। সবাই কথা বলছে, একজন থেকে আরেকজন বেশি উত্তেজিত। ইভা কাউকেই বাধা দিল না। সে স্থানীয় পত্রিকায় ঘটনাটার কথা পড়েছে আর সাথে সাথে এই বাচ্চাগুলোর কথা মনে পড়েছে। ছোট বাচ্চাদের সাধারণত এরকম ভয়ানক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় না–মাঝখানে বড়রা থাকে। তারা ছোটদের আড়াল করে রাখে। কিন্তু এই বাচ্চাদেরকে আড়াল করে রাখার কেউ নেই। ইভা অবশ্যি বেশ অবাক হয়ে আবিষ্কার করল বাচ্চাগুলো নিজেরাই বেশ সামলে উঠেছে। পথে-ঘাটে থাকতে হয় বলে এই বাচ্চাগুলোরা মনে হয় অনেক তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়।
সবুজের গল্প শেষ হতে অনেকক্ষণ সময় লাগল-কারণ সবারই কিছু না কিছু বলার ছিল আর যতক্ষণ পর্যন্ত না”দুই টেকি আপা” পুরোটুকু শুনে মাথা না নাড়ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বলেই গেছে। ইভা যে তাদের সবার কথা বুঝেছে তা নয়, বাচ্চাগুলো প্রাণপণে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেছে তার কারণে কথাগুলো আরো দুর্বোধ্য হয়ে গেছে, সরাসরি নিজের মতো করে কথা বললে মনে হয় বোঝা সহজ হত। ইভা অবশ্যি বর্ণনার খুঁটিনাটি থেকে বাচ্চাগুলোর মুখের ভাবভঙ্গি চকচকে চোখ কথা বলার আগ্রহ এগুলোতেই বেশি নজর দিচ্ছিল। তবে যখন সে লাশকাটা ঘরের সামনে কাগজের মতো ফর্সা মানুষটার সাথে জালালের কথাবার্তা এবং কুক্কু নামের তেজস্বী কুক্কুরের বিশাল বীরত্বের কাহিনী শুনতে পেল তখন হঠাৎ করে সে গল্পের বিষয়বস্তুতে আগ্রহী হয়ে উঠল। ইভা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “মানুষ দুজন এসে তোমাদের কী জিজ্ঞেস করেছে?”
মজিদ বলল, “জিগাইছে আমাগো কাছে সবুজ ভাই হেরোইনের প্যাকেট দিছে কী না!”
জেবা মাথা নেড়ে বলল, “না-না-হেরোইন কয় নাই। কইছে পেলাস্টিকের ব্যাগে সাদা পাউডার।”
অন্যেরা মাথা নেড়ে জেবাকে সমর্থন করল, বলল, “সাদা পাউডার, সাদা পাউডার।”
“তোমরা হেরোইন চিননা?”
“দেখি নাইক্কা। কিন্তুক হেরোইনখোর চিনি। হেরা খুবই ডরের। দেখতে এইরকম–” বলে জেবা হেরোইনখোরের চেহারা কেমন হয় সেটা দেখাল, জিব বের হয়ে এসেছে, চোখ ঢুলুঢুলু, দুই হাত বুকের কাছে ঝুলে আছে। জেবার অভিনয় নিশ্চয়ই নিখুঁত হয়েছে কারণ সবাই আনন্দে হি হি করে হাসল এবং সবাই তখন হেরোইনখোর সেজে অভিনয় করতে লাগল। একজন আরেকজনকে দেখে তখন হেসে গড়াগড়ি খেতে থেকে। শুধুমাত্র এই বাচ্চাগুলোর পক্ষেই মনে হয় এতো অল্পে এতো আনন্দ পাওয়া সম্ভব।
ইভা তখন জালালের সাথে কাগজের মতো ফর্সা মানুষের ঘটনাটা আরো একবার শুনল এবং তাদের মাঝে জালাল কে ইভা জানতে চাইল। জালাল তখন সেখানে ছিল না তাই সাথে সাথে কয়েকজন জালালকে খুঁজে আনতে চলে গেল।
জালাল তার ভেজাল মিনারেল ওয়াটার বিক্রি করছিল, যখন খবর পেল দুই টেকি আপা তাকে দেখতে চাইছে তখন তখনই সে হাজির হয়ে যায়। ইভা জিজ্ঞেস করল, “তুমি জালাল?”
“জে।” জালাল মাথা নাড়ে।
”তোমার কুক্কু নামের একটা তেজি কুকুর আছে?”
জালাল দাঁত বের করে হাসল, বলল, “জে। কুকুর তেজ খুব বেশি!”
ইভা বলল, “সেটা ঠিক আছে, কিন্তু সবসময় তো তোমাকে বাঁচানোর জন্যে কুক্কু তোমার সাথে থাকবে না, তাই খুব সাবধান।”
জালাল বলল, “জে আপা। আমি সাবধান থাকি।”
“ভুলেও কখনো ওরকম মানুষের ধারেকাছে যাবে না।” জালাল মাথা নাড়ল, বলল, “যাই না।”
“তোমাদের বন্ধু সবুজ গিয়েছিল বলে তার কী অবস্থা হয়েছে দেখেছ?”
“জে আপা।”
ইভা বলল, “গুড।” তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার একজন একজন করে এসো, তোমাদের দুই টাকা করে দিই।”
বাচ্চাগুলোর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। প্রথম প্রথম ঘাড় বাঁকা করে বুকের কাছে হাত এনে কাতর ভঙ্গিতে সবাই তার কাছে ভিক্ষা চাইত। এখন তার সাথে সবার পরিচয় হয়েছে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে এখন আর কেউ তার কাছে কিছু চায় না। আগে সম্পর্ক ছিল বড়লোক মহিলা আর গরিব ছেলেমেয়ের সম্পর্ক। এখন সম্পর্কটা অনেকটা পরিচিত বন্ধুর মতো। বন্ধুর কাছে তো আর টাকা চাওয়া যায় না! ইভা দেখেছে এখন তারা কাড়াকাড়ি করে টাকা নেয় না। নেওয়ার সময় তাদের মুখে একটু লাজুক লাজুক ভাব চলে আসে। এমনকি একজনকে যদি ভুল করে সে দিতে ভুলেও যায় সে নিজে কখনো কিছু বলে না, অন্যেরা ইভাকে মনে করিয়ে দেয়।
.
সবাইকে দেওয়া শেষ হবার পর ইভা জালালকে ডাকল, বলল, “জালাল, আমাকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার দাও দেখি।”
জালাল কেমন যেন থতমত খেয়ে যায়। আমতা আমতা করে বলে, “মিনারেল ওয়াটার?”
“হ্যাঁ।”
“আপা আপনারে এনে দিই।”
“কেন? এনে দিতে হবে কেন? তোমার হাতের বোতলগুলো দোষ করল কী?”
জালাল কোনো উত্তর না দিয়ে ছুটে চলে গেল। কয়েক মিনিটের মাঝেই দোকান থেকে সত্যিকারের একটা বোতল এনে ইভার হাতে দিল। ইভা পানির বোতলটা হাতে নিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল, “তোমার হাতেরগুলোর সাথে এটার পার্থক্য কী?”
জালাল কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
জেবা দাঁত বের করে হেসে বলল, “আফা, ওর হাতের গুলান ভুয়া! ভেতরে কলের পানি।”
জালাল চোখ পাকিয়ে জেবার দিকে তাকাল, কিন্তু জেবা সেটাকে পাত্তা দিল, বলল, “হে শহর থাইকা এই ভুয়া পানি আনে।”
