এখানে লুকিয়ে রাখার জায়গা খুব বেশি নেই। গোডাউনের পুরাননা দেয়ালের ক্ষয়ে যাওয়া ইটের কারণে মাঝে মাঝে কিছু ফাঁক-ফোকর তৈরি হয়েছে, এর ভেতরে ইচ্ছে করলে কিছু একটা লুকিয়ে রাখা যায়। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফাঁক ফোকরগুলো দেখল। কোথাও কিছু নেই–শুধু একটা গর্তে খোঁচা দিতেই সেখান থেকে একটা গোবদা মাকড়শা বের হয়ে তির তির করে ছুটে গেল।
পুরো দেয়ালটা দেখে কিছু না পেয়ে, সে যখন চলে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ করে একটা ইটের দিকে তার চোখ পড়ল, অন্য সবগুলো ইট রং ওঠা বিবর্ণ, শ্যাওলায় ঢাকা তার মাঝে এই ইটটা একটু পরিষ্কার। জালাল কাছে গিয়ে ইটটাকে ভালো করে লক্ষ করে, মনে হয় এটাকে পরে এখানে ঢোকানো হয়েছে। সে ইটটা ধরে একটু টানাটানি করতেই সেটা ছুটে এলো, পেছনে দোমড়ানো-মোচড়ানো একটা পাস্টিকের প্যাকেট। জালাল প্যাকেটটাকে টেনে আনে, এর ভেতরে খানিকটা সাদা পাউডার–ঠিক যেরকম সে ভেবেছিল।
জালাল কিছুক্ষণ প্লাস্টিকের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে এদিক-সেদিক তাকাল, কেউ তাকে এখানে এটা হাতে দেখলে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে, তাই সে প্যাকেটটাকে তাড়াতাড়ি শার্টের নিচে প্যান্টের ভাঁজে খুঁজে ফেলল, তারপর ইটটা আগের জায়গায় বসিয়ে গোডাউনের পিছনের নির্জন জায়গাটা থেকে বের হয়ে আসে।
.
পাটফর্মে তার মজিদের সাথে দেখা হল, সে খুব মনোযোগ দিয়ে এক টুকরো আখ চিবাচ্ছিল, জালালকে দেখে বলল, “খাবি?”
ঠিক কী কারণ জানা নেই, লাশকাটা ঘরের ঘটনার পর থেকে সবাই তাকে একটু অন্য চোখে দেখে।
জালাল অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে এগিয়ে যায়। একটু এগুতেই মায়ার সাথে দেখা হল, মায়া চোখ বড় বড় করে বলল, “একটা স্যার আমারে দশ টেহা দিছে!” সে উত্তেজিত ভঙ্গিতে তাকে নোটটা দেখাল, নোটটা দশ টাকার নয়–পাঁচ টাকার, তারপরেও জালাল মায়াকে এটা শুদ্ধ করে দিতে ভুলে গেল।
জালাল প্লাটফর্মের একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসে। তার শার্টের নিচে প্যান্টের ভঁজে সে যে প্লাস্টিকের প্যাকেটটা খুঁজে রেখেছে সেখানে নিশ্চয়ই কয়েক লক্ষ টাকার হেরোইন-ব্যাপারটা চিন্তা করেই তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তার চারপাশে কতো মানুষ হাঁটাহাঁটি করছে কেউ একবারও নিশ্চয়ই অনুমানও করতে পারবে না যে তার মতো একজন মানুষের কাছে এরকম লক্ষ টাকার মূল্যবান একটা জিনিস থাকতে পারে। এটার জন্যে সবুজকে মরতে হয়েছে–তাই এটা শুধু যে দামি তা নয় এটা মনে হয় একই সাথে খুব ভয়ংকর একটা জিনিস।
সে এটা নিয়ে এখন কী করবে? কাগজের মতোন ফর্সা মানুষটার কাছে গিয়ে সে যদি বলে, “আপনারা যে জিনিসটা খুঁজছেন সেটা আমার কাছে আছে। সেটা যদি আপনাদেরকে দেই তা হলে আপনি কত টাকা দিবেন?” জিনিসটার দাম যদি কয়েক লক্ষ টাকা হয় তা হলে তারা তো চোখ বন্ধ করে তাকে কয়েক হাজার টাকা দিতে পারে। কতদিন থেকে সে টাকা জমানোর চেষ্টা করছে–একটু একটু করে সে টাকা জমাচ্ছে, এখন ইচ্ছে করলে একসাথে তার হাজার হাজার টাকা হয়ে যাবে।
উত্তেজনায় জালালের হাত অল্প অল্প কাঁপতে থাকে। বেশ খানিকক্ষণ পর অনেক কষ্ট করে সে নিজেকে শান্ত করল, তারপর সে উঠে দাঁড়াল, এক ব্যাগ হেরোইন নিয়ে সে কী করবে শেষ পর্যন্ত চিন্তা করে বের করেছে।
সবুজের সাথে রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে সে যে কালভার্টে গিয়েছিল আজকে সে একা একা সেই কালভার্টের দিকে যেতে থাকে। সেদিন দুজন মিলে কথা বলতে বলতে গিয়েছিল, পথটাকে খুব বেশি দূর মনে হয়নি। আজকে মনে হল জায়গাটা অনেক দূর।
কালভার্টের উপর দাঁড়িয়ে জালাল এদিক-সেদিক তাকাল, আশেপাশে কেউ নেই, কেউ তাকে লক্ষ করছে না। তখন সে তার প্যান্টের ভঁজে গুঁজে রাখা হেরোইনের প্যাকেটটা বের করল, তারপর সেটা খুলে পুরো হেরোইনটুকু কালভার্টের নিচের ময়লা পানিতে ফেলে দিতে থাকে। বাতাসে হেরোইন উড়ে যায় আশেপাশে মাটিতে ঘাসেও কিছু ছড়িয়ে পড়ে। জালালের নিজেরও বিশ্বাস হয় না সে এইরকম মূল্যবান একটা জিনিস নর্দমায় পানির মাঝে ফেলে দিতে পারে।
পুরো হেরোইনটা পানিতে ফেলে দেবার পর সে প্লাস্টিকের ব্যাগটাও পানিতে ছুঁড়ে দিল। যতক্ষণ পর্যন্ত না প্যাকেটটা ভাসতে ভাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল জালাল কালভার্ট থেকে নড়ল না।
.
জালাল যখন প্লাটফর্মে ফিরে এসেছে তখন মজিদ একটা আমড়া খাচ্ছে। জালালকে দেখে বলল, “এক কামড় খাবি?”
জালাল বলল, “দে।” মজিদ আমড়াটা এগিয়ে দেয় জালাল এক কামড় খেয়ে মজিদকে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ একটু হেসে ফেলল। সে একটু আগেই একজন লক্ষপতি ছিল এখন সে আবার হতদরিদ্র ছেলে!
মজিদ জিজ্ঞেস করল, “হাসিস ক্যান?”
জালাল বলল, “এমনিই!”
.
০৫.
ইভা ব্যাগটা পাশে রেখে খবরের কাগজটা খোলে। কোন দিন রাস্তাঘাটে কী রকম ট্রাফিক জ্যাম হবে আগে থেকে অনুমান করা যায় না–তাই যেখানেই যেতে চায় সেখানে একটু আগে না হয় একটু পরে পৌঁছায়। ট্রেন ধরতে হলে একটু পরে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই তাই সে সাধারণত একটু আগেই পৌঁছে যায়। আজকেও সে একটু আগেই পৌঁছে গেছে, স্টেশনটা এখনো মোটামুটি ফাঁকা, প্যাসেঞ্জাররা আসেনি।
খবরের কাগজের হেড লাইনগুলো পড়া শেষ করার আগেই সে বাচ্চাদের কণ্ঠে আনন্দধ্বনি শুনতে পেল। ছোট-বড় নানা বয়সী ছেলে এবং মেয়ে তার দিকে ছুটে আসছে, তাদের ময়লা কাপড়, খালি পা এবং নোংরা শরীর কিন্তু মুখগুলো আনন্দে ঝলমল করছে। ”দুই টেকি আপা দুই টেকি আপা” বলে চিৎকার করতে করতে তারা ইভাকে ঘিরে ফেলল।
